রাজশাহী

বিএমডিএ’র আছে ১৫ হাজার গভীর নলকূপ: বরেন্দ্রাঞ্চলে নামছে পানির স্তর

নিউজ ডেস্ক১৫ ডিসেম্বর ২০২৫৫ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজশাহী অঞ্চলে অব্যাহতভাবে নামছে পানির স্তর। এরই মধ্যে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ ব্যক্তি মালিকানায় গভীর-অগভীর নলকূপ বসিয়ে পানির ব্যবসা চলছেই। বিশেষ করে ফসল চাষের জন্য হাজার হাজার গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে ব্যাপক হারে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার চলছেই। শুধু বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষই (বিএমডিএ) রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় প্রায় ১৫ হাজার গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে। এতে করে ক্রমেই নামছে পানির স্তর। বরেন্দ্র অঞ্চলের ৪০ শতাংশেরও বেশি ইউনিয়নে পানিশূন্যতা তৈরি হয়েছে। ফলে এসব এলাকায় খাবার ও সেচের পানির মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। অবস্থা এতোটা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে এখন সুষ্ক মৌসুমে রাজশাহীর তানোর ও গোদাগাড়ীর বেশ কিছু এলাকাতে ৩৫০ ফুট নিচেও পানির স্তর পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী। ফলে ৩৫০ ফুটের মধ্যে যেসব সাবমার্সিবল পাম্প বসানো হয়েছিল সেগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে, পানি সংকটের কারণে তানোর গোদাগাড়ীতে একের পর এক খনন করা হচ্ছে বোরহোল (গভীর গর্ত)। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের জন্য লোহার পাইপ দিয়ে ১৬০-২০০ ফিট গভীর গর্ত খোড়ার পরেও অনেক স্থানেই মিলছে না পানির স্তর। ফলে ওইসব স্থানে গর্ত রেখেই নতুন করে আবার পানির স্তর খোঁজা হয়। এতে করে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকে খোলা রাখা পরিত্যক্ত গর্তগুলো। এই ধরনের একটি গর্তে পড়েই গত বুধবার (১০ ডিসেম্বর) তানোরের কোয়েলহাট গ্রামের দুই বছরের শিশু সাজিদ হোসেনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। প্রায় ৩২ ঘন্টা পরে মাটির ৫০ ফিট নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় সাজিদের মৃতদেহ।

অন্যদিকে, সাজিদের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিভাগে স্থাপন করা গভীর নলকূপের তথ্য চেয়েছে বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তর। বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ এ্যাগ্রিকালচার উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) সেচ বিভাগকে চিঠি দিয়ে আগামী ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে তথ্য সরবরাহের জন্য বলা হয়েছে। অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার রেজাউল আলম সরকার স্বাক্ষরিত চিঠিতে গভীর নলকূপের সংখ্যা এবং পাইপের মুখ উন্মুক্ত থাকা পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের সংখ্যার তথ্য দিতে বলা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিএডিসি এবং স্থানীয় উদ্যোগে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। অনেক গভীর নলকূপের পাইপের মুখটি উন্মুক্ত রাখা হয়। এতে করে অনেক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ অবস্থায় দুর্ঘটনারোধে গভীর নলকূপ স্থাপন ও পরিত্যক্ত পাইপের মুখের তথ্য দিতে বলা হয়েছে।
ওয়াটার রিসোর্স প্ল্যানিং অর্গানাইজেশনের (ওয়ারপো) পক্ষ থেকে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডাব্লিউএম) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রাজশাহী অঞ্চলে পানি সংকটাপন্ন এলাকার পরিধি বাড়ছে।

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলাজুড়ে ‘উঁচু বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ পানি পরিস্থিতির হাইড্রোলজিক্যাল অনুসন্ধান ও মডেলিং’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য উঠে আসে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ওই গবেষণা ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত চালানো হয়।

গবেষণাটিতে দেখা গেছে, ২০২১ সালের মধ্যে বরেন্দ্রাঞ্চলের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গড়ে ১৮ মিটারে বৃদ্ধি পায় এবং কিছু এলাকা যেমন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে একটি স্থানে সর্বোচ্চ ৪৬.৮৭ মিটার রেকর্ড করা হয়। রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের মোট ২১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪০.৬৫ শতাংশ অর্থাৎ কমপক্ষে ৮৭টি ইউনিয়নকে ‘অতি উচ্চ’ এবং ‘উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অতি উচ্চ সংকটাপন্ন এলাকার মধ্যে রয়েছে পোরশা উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের সব এবং নাচোল উপজেলার চারটি ইউনিয়নের সব।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) কৃষিজমিতে সেচের জন্য এ অঞ্চলে তাদের কয়েক হাজার গভীর নলকূপ রয়েছে। এছাড়াও ব্যক্তিমালিকানায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে আরও কয়েক হাজার সেমিডিপ বসানো হয়েছে। পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামতে থাকায় ২০১৫ সালে বিএমডিএ সিদ্ধান্ত নেয়, তারা নতুন করে আর কোনো গভীর নলকূপ বসাবে না। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানায় সেমিডিপ বসানোর কাজ থেমে নেই। কেবল গত বছর তানোরেই ৩২টি সেমিডিপ বসানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে উপজেলা সেচ কমিটি থেকে। এতে সেচাকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়ছেই।

বিএমডিএ সূত্র মতে, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় এ দপ্তরটির আওতায় সবমিলিয়ে ১৫ হাজার ৮৪২টি গভীর নলকূপ আছে। এর মধ্যে নদী থেকে পানি উত্তোলন করে ব্যবহারের জন্য প্রায় এক হাজারটি নলকূপ আছে। বাকি প্রায় ১৫ হাজার গভীর নলকূপ থেকেই ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে সেচকাজে ব্যবহার করা হয়। কিছু কিছু এলাকায় খাবার পানি হিসেবে ব্যবহারের জন্যেও গভীর নলকূপের পানি উত্তোলন করা হয়।

উন্নয়নকর্মী শহীদুল আলম বলেন, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি রমরমা ব্যবসা। কেবল মুনাফার জন্য নির্মমভাবে পানির ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে প্রাণ-প্রকৃতিও হুমকির মুখে পড়েছে। একের পর এক গভীর অগভীর নলকূপ বসাতে গিয়ে গভীর গর্ত করে ফেলে রাখা হচ্ছে। সেই গর্তে পড়ে প্রাণহানীও ঘটছে। এসব মেনে নেওয়া যায় না। এমনিতেই দিনের পর দিন পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় মরূকরণের দিকে যাচ্ছে রাজশাহী অঞ্চল। এর মধ্যে গর্তে পড়ে মারা যাচ্ছে মানুষ।

তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাঈমা খান বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলনের জন্য কতগুলো গভীর নলকূপ বসানোর জন্য গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়েছে, সেগুলো আমরা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিব। দ্রুত এগুলো বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আর অপরিকল্পিতভাবে কাউকে গভীর বা সেমিডিপ নলকূপ বসাতে দেওয়া হবে না। যারা এগুলো করবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান ওয়াটার রিসোর্স প্ল্যানিং অর্গানাইজেশনের আওতায় চালানো জরীপে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি জানান, ‘বরেন্দ্রাঞ্চলে পানিসংকটের তীব্রতা বাড়ছে। এ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে ভূউপরিস্থ পানির উৎস ব্যবহার এবং ভূগর্ভস্থ এবং ভূপৃষ্ঠের পানির সম্মিলিত ব্যবহারে উৎসাহিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু সে অনুযায়ী বিএমডিএ সেভাবে কাজ করছে বলে মনে হয় না।

স.আর