স্বাস্থ্য

বারবার অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভপাত হলে করণীয়

নিউজ ডেস্ক২ আগস্ট ২০২৫৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

২৪ সপ্তাহের মধ্যে কোনো নারীর পরপর দুই বা তার বেশিবার বাচ্চা নষ্ট হলে তাকে ‘বারবার গর্ভপাত’ বা ‘রিকারেন্ট প্রেগন্যান্সি লস’ বলা হয়। প্রতিটি দম্পতির জন্য এটি কতটা কষ্টের অভিজ্ঞতা তা ভুক্তভোগী ছাড়া কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়।

 

বারবার গর্ভপাতের কারণ

বিভিন্ন কারণে বারবার গর্ভপাত হতে পারে। এর মধ্যে আছে—

জেনেটিক  কারণ : সবচেয়ে বেশি দায়ী জেনেটিক অস্বাভাবিকতা।

মা অথবা বাবা থেকে বাহিত ক্রোমোজমে অ্যাবনরমালিটি থাকার কারণে বাচ্চার ক্রোমোজোমাল অ্যাবনরমালিটি হয় অর্থাৎ একটি অস্বাভাবিক বাচ্চা তৈরি হয়। প্রকৃতিগতভাবেই অস্বাভাবিক বাচ্চা নষ্ট হয়ে যায়। গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসের মধ্যে গর্ভপাতের অর্ধেকের নেপথ্যে থাকে এই জেনেটিক অ্যাবনরমালিটি। বেশির ভাগ নারী পরপর দুইবার গর্ভপাতের পর প্রায় চিকিৎসা ছাড়াই তৃতীয়বার সফল গর্ভধারণ করেন।
রক্ত জমাট বাঁধা : অ্যান্টিফসফোলিপিড সিনড্রোম (এপিএস) থেকে রক্ত জমাট বাঁধা ও স্ট্রোক হতে পারে। এটি একটি অটোইমিউন ডিস-অর্ডার, যা শরীরে অস্বাভাবিক অ্যান্টিবডি তৈরি করে। রক্তের কোষ এবং তাদের আবরণকে আক্রমণ করে এটি, যাকে ফসফোলিপিড বলা হয়। রক্তকণিকা সঠিকভাবে কাজ করার জন্য ফসফোলিপিড প্রয়োজন।

যখন অ্যান্টিবডিগুলো ফসফোলিপিড আক্রমণ করে, তখন কোষগুলো আটকে যায় এবং রক্তনালির মাধ্যমে তাদের গন্তব্যে যেতে পারে না। ফলে রক্ত জমাট বাঁধে। বারবার গর্ভপাত ঘটাতে পারে এই বিরল অটোইমিউন ডিস-অর্ডার। কারণ জমাট রক্ত প্ল্যাসেন্টায় রক্ত প্রবাহকে ব্যাহত করতে পারে। ফলে ভ্রূণ প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও অক্সিজেন থেকে বঞ্চিত হয়।
এতে গর্ভাবস্থা নষ্ট হয়। 

জরায়ুর সমস্যা : জরায়ুর বেশ কয়েকটি সমস্যা থেকে গর্ভপাত হতে পারে, যেমন—

সেপ্টাম বা পর্দা : এটি জরায়ুর বিকৃতির একটি বিরল রোগ, যেখানে সেপ্টাম নামক একটি টিস্যু জরায়ুকে দুটি গহ্বরে বিভক্ত করে।

অ্যাশারম্যান সিনড্রোম : এটি কোনো আঘাত বা পূর্ববর্তী অস্ত্রোপচারের [যেমন এমআর, ডিএনসি, ইনফেকশন ইত্যাদি] কারণে হতে পারে। যাতে জরায়ুর গহ্বরে বাচ্চা বসার জায়গাটি নষ্ট হয়ে যায়।

ফাইব্রয়েড : জরায়ুর টিউমার। ভারী রক্তপাত, ব্যথা এবং অন্যান্য উপসর্গের কারণ হতে পারে ফাইব্রয়েড।

হরমোনজনিত ব্যাধি : হাইপোথাইরয়েডিজম (থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি), অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, পলিসিস্টিক ডিম্বাশয় সিনড্রোম বা চঈঙঝ (ইস্ট্রোজেন ভারসাম্যহীনতা), অতিরিক্ত প্রোল্যাক্টিন স্তর (পিটুইটারি গ্রন্থি দ্বারা নিঃসৃত একটি হরমোন) ইত্যাদি।

অন্যান্য কারণ : বয়সের কারণেও বারবার গর্ভপাতের কারণ হতে পারে। ৩৫ বছরের বেশি বয়সী নারী এবং ৪০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের পরোক্ষ প্রভাবের কারণে ঝুঁকি বাড়ে। ধূমপান (ফার্স্ট হ্যান্ড বা প্যাসিভ), ক্যাফেইন বা অ্যালকোহলের অতিরিক্ত সেবন এবং স্থূলত্বের মতো কিছু জীবনধারার কারণও গর্ভাবস্থার ক্ষতির ঝুঁকির কারণ।

 

রোগ নির্ণয়

বারবার গর্ভপাতের কারণ শনাক্ত করার জন্য যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায়—

ক্যারিওটাইপিং : মাতা-পিতার মধ্যে ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করার জন্য এবং তাদের ক্রোমোজোমের কনফিগারেশন নির্ধারণের জন্য উভয়ের জেনেটিক স্ক্রিনিং করা যেতে পারে।

রক্ত পরীক্ষা : অ্যান্টিফসফোলিপিড অ্যান্টিবডির উপস্থিতি শনাক্ত এবং থাইরয়েড হরমোন ও রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা।

ইমেজিং : জরায়ুর সমস্যা দেখার জন্য  আলট্রাসাউন্ড, ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (গজও), এক্স-রে ইত্যাদির মতো ইমেজিং করা যেতে পারে।

হিস্টেরোস্কোপি : এটি জরায়ুর ভেতরের অংশ পরীক্ষা করার জন্য ব্যবহৃত পদ্ধতি। এর মাধ্যমে একই সঙ্গে জরায়ু ফাইব্রয়েড পলিপ, গঠনগত সমস্যা নির্ণয় ও সমাধান করা যায়।

 

চিকিৎসা

বারবার গর্ভপাতের চিকিৎসা নির্ভর করে কারণের ওপর। অর্থাৎ কী কারণে বারবার গর্ভপাত হচ্ছে সেটি সঠিকভাবে খুঁজে বের করতে হবে।

রক্ত পাতলা করার ওষুধ : এপিএস ধরা পড়লে   সফল গর্ভধারণের জন্য রক্ত পাতলা করার ওষুধ দেওয়া হয়। অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ এবং তত্ত্বাবধানে থেকে নিতে হবে এটি।

প্রোজেস্টেরন হরমোন চিকিৎসা : প্রোজেস্টেরন সাপোর্ট ইনজেকশন, মুখে খাওয়ার মেডিসিন ও ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। এই চিকিৎসা পদ্ধতি এখনো গবেষণাধীন।

আইভিএফ ও প্রি-ইমপ্লান্টেশন জেনেটিক

টেস্টিং : মা-বাবার জেনেটিক অ্যাবনরমালিটি থাকলে তাদের কাউন্সেলিং করা হয়।

সার্জারি : জরায়ুর সমস্যার জন্য আমরা বিভিন্ন সার্জারি যেমন—অ্যাডেসিওলাইসিস ও ফাইব্রয়েড অপসারণ, বাইকর্নুয়াট জরায়ুর জন্য মেট্রোপ্লাস্টি, সেপ্টাম রিসেকশন করে থাকি।

ওষুধ : থাইরয়েড ও ডায়াবেটিস সাধারণত ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। মনে রাখবেন, রক্তে সুগার বেশি থাকার কারণে শুধু গর্ভপাতই নয়, গর্ভাবস্থার জটিলতা তৈরি হতে পারে [যেমন—জন্মগত ত্রুটি, মৃতপ্রসব]।

 

বারবার গর্ভপাতের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা। ক্রোমোজোমাল অস্বাভাবিকতা, অ্যান্টিফসফোলিপিড সিনড্রোম, জরায়ু সমস্যা, হরমোনজনিত ব্যাধি, বয়স এবং জীবনযাত্রাসহ অনেক কারণ রয়েছে বারবার গর্ভপাতের। আপনার ক্ষেত্রে কী কারণে সমস্যা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা নির্ধারণ করবেন চিকিৎসক। তাই দ্রুত একজন গাইনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

 

লেখক : প্রজনন হরমোন ও ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।