ধর্ম

বাঁচতে হবে কামনা ও বিভ্রান্তির ধোঁয়াশা থেকে

নিউজ ডেস্ক৯ জুলাই ২০২৫৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

তরুণ— এই একটি শব্দেই নিহিত থাকে জাতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। তরুণরাই মুসলিম উম্মাহর প্রাণভোমরা, তরুণরাই মিল্লাতে মুসলিমার শ্রেষ্ঠতম শক্তির আধার, মুসলিম উম্মাহর আশা ও আহ্বানের কেন্দ্রবিন্দুও এই তরুণ প্রজন্ম। যে জাতির তরুণরা ঈমানদীপ্ত, আত্মপ্রত্যয়ী ও নৈতিকভাবে দৃঢ়, সে জাতি কখনো পরাভবের গ্লানি বহন করে না।

কিন্তু আজকের বাস্তবতা এক নির্মম প্যারাডক্স— যেখানে মুসলিম তরুণদের দিকে ধেয়ে আসছে দুটি ভয়ঙ্কর ঝড়: একদিক থেকে আসছে কামনা-বাসনার ঝড়, অন্যদিকে বুদ্ধিবিভ্রান্তির ধোঁয়াশা নামক ঝড়।

এই দুই আগুনে একসঙ্গে পুড়ছে মুসলিম যুবকের হৃদয়, বিবেক ও ভবিষ্যৎ।প্রথম ফাঁদ কামনা-বাসনা, যা অন্তরের তলদেশে লুকিয়ে থাকা পশুপ্রবৃত্তিকে উস্কে তোলে। এককালে যা ছিল মদ, গান ও নারীর মোহময়ী উপস্থিতি; আজ তা ডিজিটাল পর্দার পিক্সেল হয়ে মানুষের চোখের পাতা স্পর্শ করে। বিজ্ঞাপনের ছলে, বিনোদনের নামে, ফ্যাশনের মোড়কে যৌনতা ও ভোগের অর্চনা চলছে অবিরত।

তরুণের চোখে যখনি ঝলসে ওঠে বাহ্যিক সৌন্দর্যের খোলস, তখনি তার হৃদয়ে জমতে থাকে আত্মার শূন্যতা। যারা এই কামনা-বাসনার মোহে গা ভাসায়, তারা ধীরে ধীরে আত্মার উচ্চতাকে বিসর্জন দিয়ে পশুতার নিচু গলিতে নেমে যায়। আর তখন তারা হয়ে ওঠে শয়তানের খেলনার মতো, যাদের মুখে থাকে আধুনিকতার বুলি, কিন্তু অন্তরে থাকে লালসার দাসত্ব।

কিন্তু ইসলাম শেখায় উত্তরণ—এই কামনা-বাসনার উত্তাপ সহ্য করে যে আত্মা সংযমের ছায়ায় আশ্রয় নেয়, সেই হয় সফলতার প্রকৃত পথিক।

যারা তাকওয়ার ঢাল তুলে দাঁড়ায়, তাদের অন্তরকে আল্লাহ বিশেষভাবে মজবুত করেন। কোরআনুল কারীমে বলা হয়েছে-

وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ، فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ

‘যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় রাখে এবং নিজ প্রবৃত্তিকে দমন করে, তার আশ্রয়স্থল জান্নাত।’ (সুরা নাজিআত, আয়াত : ৪০-৪১)

দ্বিতীয় ফাঁদ বুদ্ধিবিভ্রান্তি। এটি খুবই ভয়ানক এক ফাঁদ যা তরুণের চিন্তাজগতে এক কুয়াশা বিস্তার করে। প্রশ্নের নামে ছুড়ে দেওয়া হয় কুটিলতা, যুক্তির নামে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় সংশয়।

ইসলাম বনাম আধুনিকতা, ধর্ম বনাম নারীস্বাধীনতা, বিজ্ঞান বনাম ওহী—এইসব দ্বন্দ্বের মোড়কে তরুণের বিশ্বাসকে কাঁপিয়ে তোলা হয়।তাকে বলা হয়, ‘সবকিছুতেই প্রশ্ন করো’, অথচ উত্তর দেয়ার মঞ্চ থেকে আলেম ও জ্ঞানীদের সরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে সে দাঁড়ায় দ্বিধার মোহনায়, যার ফলে ধীরে ধীরে নিশ্চিত পথ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের আলোর পথে দিশা দিয়ে রেখেছেন-

فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ

‘যদি না জানো, তাহলে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো।’
(সুরা নাহল, আয়াত: ৪৩)

শুভবুদ্ধি, বিশুদ্ধ জ্ঞান ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের সাহচর্যই পারে এই ঘোরের ঘুণ ধরানো চিন্তাকে দূর করতে। কাজেই তরুণ্য শক্তিকে প্রশ্ন করার পাশাপাশি সঠিক উৎস থেকে উত্তর খোঁজার বিনয়ও ধারণ করতে হবে। তাহলেই নিশ্চিত পথ হারানোর শঙ্কা থেকে মুক্তি মিলবে। আলোর দিশা পাওয়া সহজতর হবে।

সঠিক উৎস বলতে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা গ্রন্থ থেকে জ্ঞান আহরণের কথা বলা হয়েছে। তবে সব ক্ষেত্রে গ্রন্থের উপর নির্ভরতাও পথ হারানোর কারণ হতে পারে।

এই দুই ফাঁদ থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায়: আত্মিক সংযম ও চিন্তাগত পবিত্রতা। একজন প্রকৃত মুসলিম তরুণের হৃদয়ে চাই এমন আলোর দীপ্তি, যা কামনার আঁধার চিরে দেয়; চাই এমন জ্ঞানের দীপ্তি, যা বিভ্রান্তির ধোঁয়াকে সরিয়ে দেয়।

এই মুক্তির পথে সহায়ক কিছু দিক হলো:

•    আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার অনুশীলন: নিয়মিত সালাত, জিকির, কুরআন তিলাওয়াত, রোজা, হালাল জীবিকা ও সৎ মানুষের সান্নিধ্য।

•    সুস্থ চিন্তা ও সংশয়মুক্ত বুদ্ধির চর্চা : বিশুদ্ধ ইসলামিক বই পাঠ, আলেমদের সংস্পর্শ, দ্বীন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা, সাহসের সাথে প্রশ্ন করে জবাব খোঁজা।

•    দোয়া ও আত্মসমর্পণ : রাসুলুল্লাহ ﷺ দোয়া করতেন:

«يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوْبِ ثَبِّتْ قُلُوْبَنَا عَلَى دِيْنِكَ»

‘হে অন্তরের পরিবর্তনকারী, আমাদের অন্তরকে তোমার দ্বীনের ওপর দৃঢ় রাখো।’

তিনি আরো বলতেন:

«اَللَّهُمَّ أَرِنَا الْحَقَّ حَقًا وَارْزُقْنَا اِتِّبَاعُه، وَأَرِنَا الْبَاطِلَ بَاطِلاً وَارْزُقْنَا اِجْتِنَابَه»

‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে সত্যকে সত্যরূপে দেখাও এবং তা অনুসরণে শক্তি দাও, আর মিথ্যাকে মিথ্যারূপে দেখাও ও তা বর্জনের তাওফিক দাও।’

এই দুনিয়ায় সত্যিকারের সফলতা তখনই অর্জিত হয়, যখন একজন তরুণ এক এক কামনা-বাসনার প্রলোভন আর বিভ্রান্তির ধোঁয়াশা পেরিয়ে নিজের আত্মাকে আল্লাহর দ্বীনের ছায়ায় স্থির রাখতে পারে। যেসব তরুণ এই উত্তাল সময়েও ইমানকে আঁকড়ে ধরে, তারাই জাতির ভবিষ্যৎ রাহবার। তাদের বুকেই জ্বলবে নবুয়তের আলো, তারাই হবে যুগ পরিবর্তনের কাণ্ডারী।

আল্লাহর কাছে আমাদের প্রার্থনা—তিনি যেন মুসলিম যুবসমাজকে এই দুই আগুন থেকে হেফাজত করেন এবং সত্য, সংযম ও ইমানের দীপ্ততায় তাদের জীবনকে আলোকিত করেন। আমীন।