সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে এক ব্যারিস্টার দেড় বছর আগে ওমরা পালন করতে সৌদি আরবে যাওয়ার পর নিখোঁজ হয়েছেন, যিনি সিরিয়া বা তুরস্কে আছেন বলে সন্দেহ করছে তার পরিবার।
নিখোঁজ এ কে এম তাকিউর রহমান শিফাত বগুড়া শহরের কালিতলার বাসিন্দা ব্যবসায়ী আব্দুল খালেকের ছেলে। ঢাকার কলাবাগানে লেক সার্কাসের একটি বাসায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতেন তিনি।

আইন ব্যবসার পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন বলে তার বাবা খালেক জানিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সম্প্রতি নিখোঁজ যে ছয়জনের কথা জানানো হয়েছে, তার মধ্যে শিফাত একজন।
তার সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে বলে বগুড়ার পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন।
শিফাতের বাবা খালেক বৃহস্পতিবার বলেন, স্ত্রী রিজিতা রাইলা ইকবাল ও ১৮ মাসের মেয়ে রোমাইশা বিনতে তাকিকে নিয়ে গত বছর ৪ এপ্রিল ওমরার কথা বলে সৌদি আরব যায় শিফাত। এরপর ১৩ ও ১৪ এপ্রিল ফোনে কথা হলে জানায় ২২ এপ্রিল দেশে ফিরবে। তবে আর ফেরেনি তারা।
ছেলে ও তার স্ত্রী-সন্তানের খবর না পেয়ে গত বছর ৯ জুন কলাবাগান থানায় একটি জিডি করেন বলে জানান তিনি।
খালেক জানান, সৌদি যাওয়ার তিন মাস পর হঠাৎ অপরিচিত একটি নম্বর থেকে ফোন করে শিফাত।
“শুধু বলে, ভাল আছি। কোথায় আছে তা বলেনি।”
এর কয়েক মাস পরে আবার শ্যালকের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় শিফাত পরিবার নিয়ে তুরস্কে অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন।
এ থেকে খালেকের ধারণা ‘বিপথে’ গিয়ে পরিবার নিয়ে সিরিয়া বা তুরস্কে অবস্থান করছেন তার ছেলে।
কয়েক বছর ধরে গৃহযুদ্ধে থাকা সিরিয়া ও ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নিয়ে জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) খেলাফত ঘোষণার পর বিশ্বের নানা দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকেও কেউ কেউ সেখানে যাওয়ার খবর এসেছে।
চুলে বেনি করা শিফাতের রূপান্তর যুক্তরাজ্যে
বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের সংসারের সন্তান শিফাতের শিক্ষাজীবনের বেশিরভাগ কেটেছে বিদেশে।
আব্দুল খালেক বলেন, কালিতলা এলাকা ছিল মাদকের আড্ডা । ছেলে মাদকে আশক্ত হওয়ার শঙ্কা থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ভারতের শিলিগুড়ির মাউন হারমান মিশনারি স্কুলে ভর্তি করে দেন।
তারপর সেখান থেকে একই এলাকার রগভেলি স্কুলে ‘ও’ লেভেল পাশ করেন শিফাত। এরপর ২০০৬ সালে ঢাকার ‘লন্ডন কলেজ অব লিগাল স্টাডিজ’ এ তাকে ‘এ’ লেভেলে ভর্তি করা হয়।
সেখান থেকে পাশ করার পর আইন নিয়ে পড়তে যুক্তরাজ্যে যান শিফাত। ২০১০ সালে বার এট ল পাশ করার পর দেশে ফেরেন তিনি।
যুক্তরাজ্যে থাকাকালেই শিফাতের মধ্যে ধর্মের প্রতি ঝোঁক তৈরি হয় বলে তার স্বজনরা জানান।
তার বাবা বলেন, ভারত থেকে লেখাপড়া করে আসার পর ঢাকা থাকার সময় শিফাতের চলাচল ছিল ‘স্টাইলিস্ট’ ছেলেদের মতো।
“কখনও কখনও কানে দুল লাগিয়ে গিটার হাতে বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়াত। মাঝে মাঝে চুল বড় করে মেয়েদের মতো মাথায় বেনি করত। এ সব বিষয়ে ধমকিয়ে নামাজ পড়ার কথা বললেও সে নামাজ পড়ত না।”
তবে যুক্তরাজ্যে লেখাপড়ার শেষ দিকে তার আচরণে পরিবর্তন ঘটে জানিয়ে তিনি বলেন, “বার এট ল করার আগে সে দাড়ি রাখে। ২০১১ সালে দেশে ফেরার পর সে নিয়মিত নামাজ- রোজা করত।”
যুক্তরাজ্যে পড়ার সময় প্রবাসী এক সিলেটি ইমামের মেয়ের সঙ্গে শিফাতের প্রেমের সম্পর্ক হয়েছিল বলে জানান খালেক।
ওই ইমামের এক ছেলে একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিফাতের সঙ্গে পড়ত।
বাবার অমতে ওই মেয়েকে বিয়ে না করে দেশে ফিরে পরের বছর চট্টগ্রামের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত এক কর্নেলের মেয়ে রিজিতাকে বিয়ে করেন শিফাত।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে শিফাতের এক নিকট আত্মীয় বলেন, “শিফাত ‘ইয়ো ইয়ো’ স্টাইলের ছেলে হলেও যুক্তরাজ্য থেকে লেখাপড়া শেষ করে এসে সে বলত- ‘অনেক কিছুই তো দেখলাম । অনেক কিছুই করলাম । এখন পরকালের জন্য কিছু করি। তাই নামাজ রোজা করছি’।”
শিফাতের নানা আইয়ুব উদ দ্দৌলা বেনু বলেন, “ছোট বেলা থেকে শিফাত দেশের বাইরে পড়ালেখা করতে গিয়ে বাবা- মার কাছ থেকে দূরে চলে যায়। বাবা-মার প্রতি পারিবারিক যে বন্ধন থাকে তা থেকে সে ছিল বঞ্চিত। জীবনের বেশিটা সময় ছিল একাকি। যখন সে বুঝতে শিখলো তখন তার বাবা-মার মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়।
“সব কিছু মিলেই শিফাতের কিশোর ও শৈশব জীবনে একটা বড় ধরনের ভালবাসার ঘাটতি ছিল।”
শিফাত ওমরা করতে যাওয়ার আগে তার শ্বশুর ও তিনি বারণ করেছিলেন বলে জানান খালেক।
ওমরা নয়, কিছু দিন পরে হজে যেতে বলা হয়েছিল তাকে।
“শিফাত তা না শুনে চলে যায়। সে জানায়, কম খরচে আমাদের সার্কেলের সাথে হজে যাচ্ছি। কোনো সমস্যা নেই।”
ছেলের এই অবস্থার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে এই ব্যবসায়ী বলেন, “মাদকের ছোবল থেকে দূরে রাখতে ছেলেকে বিদেশে পড়িয়ে উচ্চ শিক্ষিত করলেও সেই ছেলে চলে গেল বিপথে।”
সূত্র: বিডি নিউজ









