রাজশাহী

ফারাক্কার প্রভাবে শুকিয়ে গেছে ৪০টির বেশি নদী, হারিয়ে গেছে শতাধিক প্রজাতির মাছ

নিউজ ডেস্ক১৮ মে ২০২৬৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক :
ফারাক্কার প্রভাবে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলে অন্তত ৪০টি নদী শুকিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বেশ কয়েক প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী, গঙ্গার ডলফিন, ঘড়িয়াল এবং পদ্মার ইলিশ এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বিরুপ প্রভাব পড়েছে প্রমত্তা পদ্মাসহ পরিবেশের ওপরেও। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা এখন ধু ধু বালুচরে পরিণত হচ্ছে। বিশাল বিশাল চর যেন মরুভূমিতে রুপ লাভ করেছে।

পাশাপাশি কৃষি নদীকেন্দ্রিক জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বর্তমান সরকার পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এরই মধ্যে একনেকে পাশও হয়েছে এই বিশালকার প্রকল্পটি। পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে মরা পদ্মা যেন প্রাণ ফিরে পাবে বলেও মনে করছেন নদী বিশ্লেষকরা।

সূত্র মতে, রাজশাহী বিভাগের মৃতপ্রায় নদী ও খাল পুনরুদ্ধারে দখলমুক্তকরণ, সংস্কার ও খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিভাগের আটটি জেলার নদী ও খাল খননের কাজও শুরু করেছে সরকার। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পকে সামনে আনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগে ৪০টিরও বেশি নদ-নদী ও খাল বর্তমানে দখল ও দূষণের কারণে অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। দুই যুগ আগেও এসব নদীতে পর্যাপ্ত নাব্যতা ও পানিপ্রবাহ ছিল। কিন্তু ফারাক্কার প্রভাবে শুষ্ক মৌসুমে পানি শূন্যতায় ধীরে ধীরে পদ্মা নির্ভর নদীগুলো ভরাট হয়ে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও নদীকেন্দ্রিক জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

এদিকে, ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে গত শনিবার রাজশাহীর বড়কুঠী পদ্মাপাড়ে গণজমায়েত করে নদী বাঁচাও আন্দোলন কমিটি। এ গণজমায়েতে বক্তারা নতুন গঙ্গা চুক্তিতে বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

এসময় বক্তারা বলেন, পদ্মার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মক সংকটে পড়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ফারাক্কা লংমার্চ ছিল বাংলাদেশের পানি অধিকার আন্দোলনের অন্যতম বড় গণজাগরণ তৈরী করে। সেদিন রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দান থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট পর্যন্ত লাখো মানুষ পদযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন।

তার পরেও গত পাঁচ দশকে ফারাক্কার প্রভাবে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে এসেছে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর তলদেশ পলি ও বালুতে ভরাট হচ্ছে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে বেশ কয়েক প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী। গঙ্গার ডলফিন, ঘড়িয়াল এবং পদ্মার ইলিশ এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। নদীকেন্দ্রিক জীবিকা হারিয়েছেন লাখো মানুষ।

বক্তারা বলেন, ‘২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি গঙ্গায় পানিপ্রবাহ ছিল ৯০ হাজার ৭৩০ কিউসেক। ২০২৪ সালের একই দিনে তা কমে দাঁড়ায় ৭৫ হাজার ৪০৯ কিউসেকে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রবাহ কমেছে ১৫ হাজার ৩২১ কিউসেক।

পরিবেশবিদ ও নদী বাঁচাও আন্দোলন কমিটি রাজশাহীর আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এনামুল হক বলেন, ‘ফারাক্কার প্রভাবে উত্তরাঞ্চলে সেচ সংকট তীব্র হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রায় অধিকাংশ গভীর নলকূপ প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিনের পর দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্ত পানিতে মারাত্মক পরিমাণে আর্সেনিক দূষণও বাড়ছে। অন্যদিকে, দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি উৎপাদন কমছে, হুমকির মুখে পড়ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অনেক আগে থেকেই নদী বাঁচাও আন্দোলন করে যাচ্ছি। তবে মূল বিষয়টি হলো ভারত আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করে গঙ্গাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি একতরফাভাবে সরিয়ে নিচ্ছে। এ কারণে পদ্মা থেকে শুরু করে শাখা উপশাখা নদীগুলো শুষ্ক মৌসুমের আগেই শুকিয়ে যাচ্ছে। আর এর প্রভাব পড়ছে এ অঞ্চলের মানুষের ওপর।

এছাড়াও শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে রাজশাহী অঞ্চলে কয়েক হাজার হেক্টর জমির চাষাবাদ বিঘ্নিত হয়। কৃষি ফসল চাল করতে গিয়ে পানির ওভাবে আবার খরায় পুড়ে প্রতিবছরই লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। অন্যদিকে ছোট ছোট নদী ও খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় আ´মিক বন্যাতেও ডুবে যাচ্ছে ফসল। তবে কৃষিতে এবার স্বপ্ন দেখাচ্ছে পদ্মা ব্যারেজ। পানি সংরক্ষণ করা হলে রাজশাহী অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ এর উপকার পাবে।

এ পরিস্থিতিতে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পকে আশার আলো হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজবাড়ীর পাংশায় প্রস্তাবিত এ ব্যারেজের মাধ্যমে বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করা হবে।

নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘ফারাক্কার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে নদী অববাহিকার জীবন-যাত্রায়। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানি না পেয়ে পদ্মা মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। এতে হারিয়ে গেছে বাংলাদেশের শতাধিক প্রজাতির মাছসহ। জীব-বৈচিত্রের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। জেলেদের জীবনেও নেমে এসেছে সংকট। অনেকেই পেশা পরিবর্তনই করে ফেলছেন। সবমিলিয়ে ফারাক্কা বাংলাদেশের জন্য কাল হয়েছে। এখন এর প্রভাব রোধে পদ্মা ব্যারেজের বিকল্প নাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ হলে রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত নদীর পানির স্তর উঁচু রাখা সম্ভব হবে। সংরক্ষিত পানি বিভিন্ন নদীপথে সরবরাহ করে শুকনো মৌসুমেও পানিপ্রবাহ সচল রাখা যাবে।’
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, “আমরা এখন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। পদ্মা ব্যারেজ হলে সারফেস ওয়াটার ব্যবহার করে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে কৃষক যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি দীর্ঘদিনের পানির সংকটও অনেকটা কমবে।”