আন্তর্জাতিক

পশ্চিম তীরের হেবরন শহরে ভবন ধ্বংস করছে ইসরায়েল

নিউজ ডেস্ক২৪ অক্টোবর ২০২৬৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

দখলকৃত পশ্চিম তীরের একটি চেকপয়েন্টে দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর গুলিতে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ওই এলাকার একটি আবাসিক এলাকার ভবনগুলো ধ্বংস করা এবং বাসিন্দাদের জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়া শুরু করেছে ইসরায়েল।

শুক্রবার ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মাথায় এ অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েল।

 

 

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর এই প্রথম ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, যিনি নিজেকে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একজন কট্টরপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। আগামী ২৭ অক্টোবর ভোটগ্রহণের মাত্র চার দিন আগে এ হামলার ঘটনা ঘটল।

 

 

হামলার পর ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস-আইডিএফ জানায়, তারা হেবরন শহরটিকে ‘সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ’ করছে এবং নেতানিয়াহু শুক্রবার থেকে পুরো পশ্চিম তীর সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

তবে কয়েক ঘণ্টা পর নেতানিয়াহু তার এই সিদ্ধান্ত থেকে কিছুটা সরে এসে জানান, তিনি হেবরন এবং হালহুল শহরের চারপাশে একটি নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরির কথা বিবেচনা করছেন, যা প্রয়োজনে অন্যান্য এলাকাতেও সম্প্রসারিত হতে পারে।
নেতানিয়াহু আরো বলেন, সামরিক বাহিনী হামলার এলাকা থেকে জোরপূর্বক বাসিন্দাদের সরিয়ে দেবে এবং এলাকাটিকে পুরোপুরি বদলে ফেলবে। ২০২৫ সালের শুরুতে জেনিন, তুলকারেম, নুর শামস এবং আল-ফারআ শরণার্থীশিবিরে একই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল; যার ফলে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত এবং পুরো একটি এলাকা খালি হয়ে গিয়েছিল।

 

 

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এবং ইসরায়েলি সিকিউরিটি এজেন্সি-আইএসএ এক যৌথ ঘোষণায় জানিয়েছে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ হেবরন এলাকায় কয়েক দিনব্যাপী একটি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু করেছে।

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করার পাশাপাশি সন্ত্রাসী অবকাঠামো ও অস্ত্র খুঁজে বের করতে এবং তা ধ্বংস করতে বাহিনীগুলো পুরো এলাকাজুড়ে নিখুঁত, লক্ষ্যভিত্তিক ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তল্লাশি চালানো শুরু করেছে।’

বিবৃতিতে আরো যোগ করা হয়, এই অভিযানটি শুধু সেই এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যেখান থেকে বন্দুকধারীরা কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল।

 

 

আইডিএফ এবং আইএসএ জানিয়েছে, ওই এলাকায় বসবাসকারী বাসিন্দারা তিনটি নির্দিষ্ট এক্সিট পয়েন্ট দিয়ে এলাকা ত্যাগ করতে পারবেন এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নিরাপত্তা তল্লাশির মুখোমুখি হতে হবে। যাদের আচরণ বা পরিচয় সন্দেহজনক মনে হবে, তাদের আরো জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে।

সামরিক বাহিনী এবং আইএসএ আরো যোগ করেছে, এই অভিযানটি সকাল থেকে শুরু হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপগুলোরই একটি ধারাবাহিকতা।

এর মধ্যে রয়েছে—সন্ত্রাসীদের বাসভবনগুলোর মানচিত্র তৈরি, হেবরন ও হালহুল এলাকায় নিরাপত্তা বেষ্টনী আরোপ, রোডব্লক স্থাপন এবং পুরো সেক্টরে বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করা।

 

বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে ওই এলাকার এমন সব স্থাপনা ভেঙে ফেলা হচ্ছে।

ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ‘বিতসেলেম’ হেবরনের আবাসিক এলাকা থেকে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার এই পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইউলি নোভাক বলেন, ‘ইসরায়েল তাদের পরবর্তী অপরাধের কথা আগেভাগেই ঘোষণা করছে। নেতানিয়াহু এবং কাটজ হেবরনের একটি ফিলিস্তিনি আবাসিক এলাকা খালি করার এবং পশ্চিম তীরের উত্তরের শরণার্থীশিবিরগুলোতে যে গণ-বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল, এখানেও তার পুনরাবৃত্তি করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।’

শুক্রবার বিকেলের মধ্যেই ইসরায়েলি বাহিনী হেবরনের ফারশ আল-হাওয়া এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। সিএনএনের প্রাপ্ত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ইসরায়েলি সেনা একটি আবাসন কমপ্লেক্সের বাসিন্দাদের বলছেন, ‘আপনাদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য পাঁচ মিনিট সময় আছে।’

নেতানিয়াহু বলেন, ‘হেবরনের যে পাড়া থেকে সন্ত্রাসীরা এসেছিল, ঠিক এই কাজটিই আমরা সেখানে করব। আমরা বাসিন্দাদের সরিয়ে দেব, বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করব, সেখানে পাওয়া সব অস্ত্র সরিয়ে নেব এবং সব সন্ত্রাসী অবকাঠামো চিহ্নিত করে ধ্বংস করব।’

এই হামলার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে এমন অন্য কারো সন্ধানে বাহিনীটি পুরো এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে। আইডিএফ জানিয়েছে, শুক্রবার সকালেই দুই বন্দুকধারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

ঘটনাস্থলের ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, ফিলিস্তিনি বন্দুকধারী এবং ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে বেশ কয়েক মিনিট ধরে তীব্র গোলাগুলি চলছে। রয়টার্সের একটি ভিডিওতে একজন ইসরায়েলি উদ্ধারকারীকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায় যে, গোলাগুলি অন্তত ২০ মিনিট ধরে চলছে এবং তারা ঘটনাস্থল থেকে আহতদের সরিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

আইডিএফ জানিয়েছে, তারা হামলাকারীদের ব্যবহৃত একটি গাড়ি উদ্ধার করেছে, যা প্রচুর পরিমাণে গোলাবারুদে ভর্তি ছিল।

পরিস্থিতি মূল্যায়নের পর আইডিএফ প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির বলেন, ‘এটি একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা ছিল। যোদ্ধাদের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে আরো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এবং বেসামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।’

তিনি জানান, গাড়িতে থাকা গোলাবারুদগুলো আরো বড় পরিসরে হামলা চালানোর উদ্দেশে রাখা হয়েছিল। জামির আরো বলেন, আইডিএফ সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান বাড়াবে এবং এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করবে। এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা হামাস সন্ত্রাসী এবং যারা তাদের পাঠিয়েছে, তাদের যেখানেই হোক এবং সব সময় তাড়া করব।’ তবে হামাস এই হামলার প্রশংসা করে বিবৃতি দিলেও এর দায় স্বীকার করেনি।

সূত্র : সিএনএন