তারেক মাহমুদ, নাটোর ঘুরে এসে:
আতঙ্কের অপর নাম ছিলেন নাটোর পৌর যুবদলের নেতা রেদোওয়ান হাসান সাব্বির। নাটোর শহরে তিনি ত্রাসের রাজত্বত কায়েম করেছিলেন। তার বিভিন্ন অপকর্মের আতঙ্কে এলকাবাসি নিরবে জীবন যাপন করতো। সাব্বির এলাকায় এমন কোন অপকর্ম নেই যে, তিনি করেননি। তিনি মাদক ব্যাবসা থেকে শুরু করে ছিনতাই, রাহাজানি, অস্ত্রবাজিসহ বিভিন্ন অপমর্কে সক্রিয়ভাবে লিপ্ত ছিলেন তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের নিয়ে। কিন্তু তার ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়নি। কেউ টু-শব্দ করলেও তার ওপর নেমে আসতো অত্যাচারের মাত্রা।

বেপরোয়া সাব্বির ও তার বাহিনী সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকারের বাড়িতে গিয়েও বোমাবাজি করে আসেন সাঙ্গ-পাঙ্গদের নিয়ে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে স্থানীয় পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। উল্টো তাকে অনেকটা আগলেই রাখত পুলিশ।
এমনটিই বলছিলেন নাটোর পৌর এলাকার সাধারণ মানুষরা। কিন্তু সাব্বিরের চ্যালাদের ভয়ে এখনো আতঙ্কে দিনাপাত করা ওই বাসিন্দারা ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চান না। এ কারণে তাদের তাদের নাম জানতে চাইলে কেউ তা প্রকাশ করেননি।

নাটোরর সন্ত্রাসী সাব্বির ও তার সহযোগীদের টর্চারসেল
স্থানীয় এক বৃদ্ধ সিল্কসিটিনিউজকে বলেন, ‘বাবা শুধু সাব্বিরসহ তিনজন মারা গেছে তার আরো লোকজন যদি আমাদের ওপর সেই হামলা চালায়, তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কে দেবে?
তিনি বলছিলেন, সাব্বির এবং তার চ্যালারা বিভিন্ন উপায়ে বিভিন্ন এলাকার মানুষকে জিম্মি করে টাকা দাবি করতো। তারা মানুষকে মারধোর করতো, রাস্তায় ছিনতাই করতো, মাদক কেনাবেচা করতো, মাদক সেবন করতো, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতো। এমন কোনো কাজ নেই তারা করেনি। ক্ষমতার দাপটে তারা গোটা নাটোরকে তটস্থ করে রেখেছিল। তাদের তিনজনের মৃত্যুতে গোটা নাটোরে এখন স্বস্তির বাতাস বইছে।
আরেক ব্যবসায়ী বলেন, সাব্বিরের ব্যাবসায়ীদের মাঝে সকলেই আতঙ্কে থাকতো। কখন না জানি চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দিলে নিজের টর্চারসেলে নিয়ে নির্যাতন করাতো সাব্বির। তাই কেউ ঝামেলায় না জড়িয়ে চাঁদা দিতে বাধ্য হতো।
স্থানীয় সত্রে জানা যায়, কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পেত না। কারণ স্থানীয় এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুলের ডান হাত নামেই পরিচিত ছিল সাব্বির। এলাকার প্রশাসন তার কাছে অসহায় ছিল। মামলা হলে বেশি দিন টিকতো না তার মামলা। অল্পদিনের মধ্যেই জামিন পেয়ে যেতেন সাব্বির এবং তার লোকজন। তার বিরুদ্ধে ছিল ১২টি মামলা। কিন্তু পুলিশ তাকে কখনোই আটক করেনি। তবে মাস সাতেক আগে পুঠিয়া থানা পুলিশ সাব্বিরতে ফেনসিডিলসহ আটক করেছি।
নাটোরের কানাইখালী বাজারে জনসম্মুক্ষে লোকজনকে ধরে এনে পেটাতো সাব্বির। এটিই ছিল তার টর্চারসেল নামে পরিচিত। সেখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন ধরে এনে চাঁদার দাবিতে অমানুষিক নির্যাতন করা হতো।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সাব্বির বিএনপি-জামায়াতের আমলে যুবদলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। সে সময়ের বিএনপির এমপি রহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর হয়ে তিন কাজ করতেন। দুলুর আমলেও সাব্বির অস্ত্রবাজির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। দুলুর ডান ছিলেন সাব্বির। এরপরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সাব্বির নতুনভাবে যুবলীগে যোগ দেন।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় দেড় বছর আগে কানাইখালি বাজার থেকে র্যাব সদস্যরা সাব্বিরকে আটক করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ওই সময় এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুল র্যাবের গাড়ী থেকে জোর করে সাব্বিরকে নামিয়ে নেন।
অপর সূত্র জানায়, চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি রাতে নাটোর সদর আসনের সাবেক এমপি এবং যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী আহাদ আলী সরকারের বাড়িতে হামলা চালায় সাব্বির ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা। বাসার চারিদিকে মোটরসাইকেল নিয়ে ঘেরাও করে তারা। কিন্তু আহাদ আলীকে বাড়িতে না পেয়ে ওই সময় তার কন্যা কলেজ অধ্যক্ষ মৌসুমী, আরেক মেয়ে মুক্তা ও তার মেয়েজামাই মোজাহার হোসেনকে মারধর করেন সাব্বির বাহিনী। এদের মধ্যে মৌসুমি কে মেরে গুরুতর আহত করেছিলেন ছাব্বির।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আহাদ আলী সরকার সিল্কসিটিনিউজকে বলেন, ‘আমাকে মন্ত্রী করা হচ্ছে, এমন একটি গুজবে সাব্বিরের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন আমার বাড়িতে এসে হামলা চালিয়েছিল। আমার দুই মেয়ে ও জামাইকে মারধর করেছিল। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর বিচার চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে আমি মামলার আইওকে বলেছিলাম, আর মামলা চালাব না।’
এমপি আহাদ আলী সরকার আরো বলেন, এভাবেই সাধারণ মানুষও সাব্বিরের বিরুদ্ধে মামলা করে তার ভয়ে পরে মামলা তুলে নিত। তার অন্যায়ের গতিবিধি থামানোর কেউ না থাকায় এক সময় নাটোর শহরের আতঙ্ক হিসাবেই পরিচিতি লাভ করে রেদোয়ান হাসান সাব্বির।
স/আর









