স্বাস্থ্য

নবজাতকের জন্ডিস

নিউজ ডেস্ক৪ অক্টোবর ২০২৫৩ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় নবজাতকের রক্তে লোহিত কণিকা বেশি থাকে এবং তা দ্রুত ভেঙেও যায়। ফলে তৈরি হয় প্রচুর বিলিরুবিন। নবজাতকের লিভার অতিরিক্ত বিলিরুবিন পুরোপুরি বের করতে পারে না, দেহে সেটি জমে চোখ ও শরীর হলদে দেখায়। একেই বলা হয় নবজাতকের জন্ডিস।

প্রতি ১০ নবজাতকের মধ্যে সাত নবজাতকেরই জন্ডিস হয়ে থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভূমিষ্ঠ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পর জন্ডিস দেখা দেয়। সাধারণত এর কোনো বাড়তি চিকিৎসা লাগে না, নিজ থেকেই সেরে যায়। কিছু ক্ষেত্রে সেটি হতে পারে প্রাণঘাতী, তাই সতর্কতা জরুরি।

কখন ঝুঁকিপূর্ণ?

► মা-বাবার রক্তের গ্রুপের অসামঞ্জস্যতা থাকলে, বিশেষ করে মায়ের রক্তের গ্রুপ আরএইচ নেগেটিভ আর বাবার গ্রুপ পজিটিভ হলে তাঁদের শিশুর রক্ত আরএইচ পজিটিভ হয়ে থাকে।

► অপরিণত বা কম ওজনের শিশু ভূমিষ্ঠ হলে।

► জন্মের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তীব্র জন্ডিস হলে।

► অসুস্থ নবজাতকের জন্ডিস দেখা দিলে।

এসব ক্ষেত্রে জন্ডিস খুব দ্রুত বাড়ে, বিলিরুবিনের মাত্রা খুব বেশি হয় এবং এটি বিপজ্জনক হতে পারে। শিশু ঘন ঘন ঘুমিয়ে যায়, নিস্তেজ থাকে, শিশুর খাওয়ায় অনীহা দেখা দেয় এবং খিঁচুনিও হতে পারে।

 

বিপজ্জনক লক্ষণ

জন্ডিসের কিছু লক্ষণ বিপজ্জনক; যেমন—

► চোখ, মুখ, বুক হলুদের সঙ্গে যদি হাত-পায়ের তালুও হলুদ হয়ে যায়।

► ১৪ দিনের বেশি সময় ধরে শিশুর চোখ, মুখ ও বুক হলুদ থাকলে।

► জন্ডিসে আক্রান্ত শিশুর মলের রং যদি হলুদ না হয়ে সাদা হয়।

এর যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলেই যত শীঘ্র সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

 

জন্ডিস নির্ণয়

নবজাতকের জন্ডিস কয়েকভাবে শনাক্ত করা যায়; যথা—

রোগীকে পরীক্ষা করে : শিশুকে পরীক্ষা করার সময় যদি ত্বকের হলদেভাব চিকিৎসকের নজরে পড়ে, সে ক্ষেত্রে তিনি শিশুর চোখ, মুখ ও বুকের ওপর হালকা চাপ দিয়ে পরীক্ষা করতে পারেন। হলদেভাব হাত-পায়ের তালুতেও আছে কি না, সেটি দেখেও জন্ডিস সম্পর্কে আন্দাজ করা যায়।

রক্ত পরীক্ষা : শিশুর রক্ত পরীক্ষা করে জানা যায় জন্ডিস হয়েছে কি না ও এর মাত্রা কত।

 

চিকিৎসা

নির্দিষ্ট মাত্রায় ছড়িয়ে গেলে শিশুর মস্তিষ্কের পর্দা ভেদ করে প্রবেশ করতে পারে বিলিরুবিন। সেটি হতে পারে মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতির কারণ। তাই জন্ডিসের ধরন নির্ণয় করে উপযুক্ত চিকিৎসা নিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জন্ডিস চিকিৎসায় শিশুকে রোদে দেওয়া সমর্থন করে না। বেশিক্ষণ সময় প্রখর রোদে রাখলে উল্টো ত্বক রোদে পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তবে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, জানালার কাচের মধ্য দিয়ে আসা রোদে অল্প সময় রাখলে নবজাতকের জন্ডিস কিছুটা কমে। এর পাশাপাশি করণীয়—

মায়ের বুকের দুধ : জন্ডিস সারাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিশুকে ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়ানো। কারণ জন্ডিস হলে শিশুর দেহে ফ্লুইড কমে ডিহাইড্রেশন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

রোদ লাগানো : প্রতিদিন সকালে রোদে বাচ্চাকে ২০ থেকে ৩০ মিনিট রাখতে হবে। বাচ্চার চোখ, মুখ ও লজ্জাস্থান আড়াল করে বাকি শরীর যত বেশি উন্মুক্ত রাখা যায়।

ফটোথেরাপি : স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নীল আলোর নিচে শিশুকে রেখে ফটোথেরাপি দেওয়া হয়। বিলিরুবিন ভেঙে ফেলায় নীল আলো কার্যকর। ফলে জন্ডিস সেরে যায়।

রক্ত পরিবর্তন : জন্ডিস অনেক বেশি হলে নবজাতকের রক্ত পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।

 

যা কখনোই করবেন না

আমাদের দেশে জন্ডিস চিকিৎসায় ঘরোয়া বা কবিরাজি চিকিৎসা প্রচলিত। এগুলো উপকারের চেয়ে ক্ষতি করে বেশি। তাই এসব ভুল পদ্ধতি প্রয়োগ না করে চিকিৎসকের পরামর্শমতো চিকিৎসা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, সঠিক চিকিৎসায় নবজাতকের জন্ডিস নিরাময়যোগ্য। দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

 

লেখক : চেয়ারম্যান

নবজাতক বিভাগ

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়