রাজশাহী

দৌলতপুর চরে নদী পেরিয়ে চিকিৎসা, জীবনের ঝুঁকিতে ৫০ হাজার মানুষ

নিউজ ডেস্ক১৯ মে ২০২৬৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবদেক:

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বাংলাবাজার চর। পদ্মার বুকজুড়ে বিস্তীর্ণ এই চরে বসবাস প্রায় ৫০ হাজার মানুষের। ছিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর দুটি ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। হাজারো পরিবার বছরের পর বছর ধরে এখানে বসবাস করলেও নেই কোনো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। নেই জরুরি চিকিৎসাসেবা। অসুস্থ হলেই মানুষের একমাত্র ভরসা চারজন গ্রাম্য চিকিৎসক। তাঁরা আবার মানুষের পাশাপাশি গরু-ছাগল ও মহিষেরও চিকিৎিসা করেন। তবে জটিল রোগ বা গর্ভবতি নারীদের নিয়ে ছুটতে হয় প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের দৌলতপুর উপজেলা সদর অথবা ৫০ কিলোমিটার দূরের রাজশাহী শহরে।

 

সেই পথও সহজ নয়-পাড়ি দিতে হয় নদী ও দুর্গম চরাঞ্চল। বর্ষা মৌসুমে নৌকাতে সহজেই চলাচল করা গেলেও শুষ্ক মৌসুমে বিশাল চর পাড়ি দিয়ে পায়ে হেঁটে এবং নৌকায় পারপার করতে হয়। শুষ্ক মৌসুমে পায়ে হেঁটে আর অটোরিকশতে করে যাওয়া যায় দৌলতপুর উপজেলা সদরে। তবে এ যাতায়াতেও দফায় দফায় দিতে হয় টোল। এই চরবাসী যেদিকে যান, সেদিকেই দুই জায়গায় টোল দিতে হয়। যাওয়া-আসা মিলে দিতে হয় চারবার টোল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাধীনতার এত বছর পরও এই চরাঞ্চলের মানুষের জন্য গড়ে ওঠেনি কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক বা স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র। ফলে প্রসূতি মা, শিশু ও বয়স্ক রোগীদের সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। মাঝরাতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে যেন কোনো উপায় থাকে না এই চরবাসীর। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে বেশি বিপদে পড়তে তাঁদের। বর্ষাকালেও পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নদীতে স্রোত বাড়লে রোগী নিয়ে পারাপার করাটাও হয়ে পড়ে জীবন-মৃত্যুর লড়াই। তার পরেও দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া গোগীদের। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে দুর্গম চর বেয়ে যাতায়াতই কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলা বাজার চরের বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, “বাড়িতে অসুস্থ মা আছে। রাতে তিনি অসুস্থ হলে বুক ধড়ফড় করে। কখন নৌকা পাবো, চর পার হবো কিভাবে, কখন হাসপাতালে পৌঁছাবো-এই চিন্তায় থাকি। অনেক সময় পথেই এ চর থেকে যাওয়ার সময় রোগী মারা যায়।”

স্থানীয় কৃষক আব্দুল মালেক জানান, চরাঞ্চলের মানুষ মূলত কৃষিকাজ ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। চিকিৎসার জন্য দূরে যেতে হলে যাতায়াত খরচই অনেকের সাধ্যের বাইরে চলে যায়। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে গ্রাম্য চিকিৎসকদের কাছেই চিকিৎসা নেন। কিন্তু জটিল রোগের ক্ষেত্রে সেটি যথেষ্ট নয়।

চরের দক্ষিণ খাজিরাথাক গ্রামের বিল্লাল হোসেন নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘‘একদিন রাতে মালেক ব্যাপারীর মেয়ে সেলিনা বেগমের প্রসব বেদনা উঠেছিল। মাঝরাতে আমাকে ঘুম থেকে উঠায় নিয়ে আসলো। দুই-তিনজন মিলে কোলে করে নৌকা পর্যন্ত নিয়ে গেলো সেলিনাকে। এর মধ্যে নৌকাতেই বাচ্চা হয়ে গেলো সেলিনার। কিন্তু প্রচুর পরিমাণ রক্ত বের হচ্ছিল তার। তার পর নদী পার হয়ে নামায় দিনু ঘাটে। ওই ঘাট থেকে আবার চৌমাদিয়া চর পার হতে হয় তিন কিলোমিটার। তখন আবার তারা কাঁধে করে ঝুলিয়ে নিয়ে কুনো মতে চর পার হইছিল। তার পর অটোরিকশাতে করে গেছিলো হাসপাতালে। অল্পের জন্য মেয়েটি প্রাণে গেছিল। আমি আরেকটু দেরি করলেই আর বাঁইচত না মুনে হয়।’

গ্রামের আসাদ আলী প্রধান বলেন, ‘আমারে সব থ্যাকি কষ্ট চিকিৎসার। কেউ কুনো অসুখ হলেই গ্রামের ডাক্তার ছাড়া কুনো উপায় থাকে না। না হলে য্যাতি হয় দৌলতপুর বা রাজশাহীতে। য্যাতেও তো অনেক কষ্ট। অনেক খরচ। অনেকের যাওয়া-আসার ট্যাকাই থাকে না, চিকিৎসা করাবি কি করি।’ চরে থাকা চারজন পল্লী চিকিৎসকের একজন মাসুম মোল্লা বলেন, “আমরা চেষ্টা করি সাধারণ চিকিৎসা দিতে। কিন্তু হার্টের রোগী, স্ট্রোক বা প্রসূতি জটিলতা হলে কিছু করার থাকে না। দ্রুত হাসপাতালে নিতে হয়। কিন্তু দুর্গম চরের কারণে সময়মতো নেওয়া সবসময় সম্ভব হয় না অনেককেই। ফলে অনেকেই রাস্তায়ও মারা যায়। আবার যেতে যেতেও কেউ কেউ সন্তান প্রসব করে ফেলেন।”

 

স্থানীয় চিলমারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমরা খুব চেষ্টা চালাইছি একটা অন্তত কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য। কিন্তু এখনো সেটি পাইনি। বছরের পর বছর ধরে এই বিশাল চরের দুই ইউনিয়নের অন্তত ৫০ হাজার মানুষ কোনো স্বাস্থ্যসেবা পাই না। তাঁদের একমাত্র ভরসা ৪-৫ জন গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার। তারা আবার পশুরও চিকিৎসা করে। এদের দ্বারা কি চিকিৎসা পাওয়া যাবে বলেন? তার পরেও মানুষ বাধ্য হয়ে ওদের কাছেই যান। আর যাওয়ার তো কোনো জায়গা নাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘চরের মানুষদের কোথাও যেতেই ধাপে ধাপে দিতে হয় টোল। রাজশাহী বা দৌলতুপর যেখানেই যান না কেন দুই দিকেই দুই জায়গায় টাকা দিতে হয় মানুষ প্রতি। জন প্রতি দৌলতপুর গেলে দিতে হয় ৩৫ টাকা আর রাজশাহী গেলে দিতে হয় ৪০ টাকা। আসতেও তাই। এর পর আছে নৌকা ভাড়া। সাথে কোনো মালামাল থাকলে তারও ভাড়া দিতে হয়। অনে মানুষ এই পার পারের টাকা দেয়ার ভয়েই শহরের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান না।’