জাতীয়

দলীয় প্রতীকবিহীন ভোটে আস্থায় ভাটা

নিউজ ডেস্ক১১ মার্চ ২০২৪৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটি নিউজ ডেস্ক

ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো, নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে উপহার দেওয়ার ভাবনা থেকে ৯ বছর পর দলীয় প্রতীক ছাড়াই স্থানীয় সরকারের নির্বাচন করার ঘোষণা দেয় ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার দলীয় প্রতীকবিহীন ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভোটের হার বাড়লেও কোথাও তা ততটা উৎসবমুখর হিসেবে দেখা যায়নি। ভোটের মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় বিজয়ী প্রার্থীরাও ছিলেন নির্ভার। সব মিলিয়ে নির্বাচনী উৎসবে ভোটারদের আগ্রহেও ভাটা লক্ষ করা গেছে।

আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীকবিহীন নির্বাচনী কৌশলে ভোটার উৎপস্থিতি বাড়লেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপিসহ তাদের মিত্ররা বর্তমান সরকারের অধীনে সব ধরনের নির্বাচন বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে তাদের সমর্থক ভোটাররা ছিলেন ভোটবিমুখ। যে কারণে ভোট খুব একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়নি। ভোটের ফলে দেখা গেছে, প্রভাবশালী প্রার্থীদের ধারেকাছেও নেই অন্যান্য প্রার্থী।

দলীয় প্রতীকবিহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সিদ্ধান্তকে ‘ভালো’ আখ্যায়িত করে জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদ (জানিপপ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ আমাদের সময়কে বলেন, দুটি সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য জায়গায় দলীয় প্রতীকবিহীন যে ভোট হলো, সেটি অনেক ভালো হয়েছে। আগামীতেও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন দলীয় প্রতীকবিহীন হওয়া উচিত। এটা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। এতে গণতান্ত্রিক চর্চাটা দেখা যায়। তবে এটা ছিল পাইলটিং একটা সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত করতে বিএনপিরও নির্বাচনে থাকা দরকার। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার দায়িত্বও শাসক দলকে নিতে হচ্ছে, এটাই দুঃখজনক।

যেহেতু অধিকাংশ জায়গায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী ওই একই দলের নেতা, সেহেতু জয়-পরাজয় নিয়ে খুব একটা আগ্রহ নেই সাধারণ ভোটারদের মনে। এ জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা কম হয়েছে বলে মনে করেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ বিষয়ে বলেন, দলীয় প্রতীকবিহীন যে ভোট হলো সেখানে ভোটের হার যা দেখানো হয়েছে, তা সত্যি ধরলেও ভোটার উপস্থিতি অত্যন্ত স্বল্প। এটার মূল কারণ ভোটের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা। মানুষের ধারণা, ভোট দিলেও যে জিতবে, না দিলেও সে-ই জিতবে। তাই কষ্ট করে কেউ ভোট দিতে যায় না। আবার অনেকে আগ্রহ থাকলেও ভয়ে ভোট দিতে যান না। মূলত ভোট নিয়ে মানুষের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ ও আস্থাহীনতা রয়েছে। সেটারই প্রতিফলন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ঘটেছে। তিনি আরও বলেন, দলীয় প্রতীক না থাকলেও প্রার্থী যে দলের, এটা সাধারণ ভোটাররাও জানেন। তাই যখন কোনো প্রভাবশালী প্রার্থী কোথাও থাকেন, সেখানে অন্য প্রার্থীরা দাঁড়ানোর সাহস পান না। যেটা কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে ঘটেছে।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত তথ্যানুযায়ী, ময়মনসিংহ সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে ভোট পড়েছে ৫৬.৩০ শতাংশ। অন্যদিকে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন উপনির্বাচনে মেয়র পদে ভোটের হার ছিল ৩৮.৮২ শতাংশ। ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র মো. ইকরামুল হক টিটু পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বিজয়ী হয়েছেন কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের কন্যা। স্থানীয়দের কাছে বাহারের গুরুত্ব অনেক বেশি। সূত্রমতে, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে অতীতে যখন যেই প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন, তার নেপথ্যে এমপি বাহারের অদৃশ্য হাত ছিল। বাহারের সিদ্ধান্তের বাইরে প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হওয়ার নজির কম। আর এবার যেহেতু তার মেয়েই প্রার্থী, তাই শক্তিশালী কোনো প্রার্থী দাঁড়ানোর সাহস করেননি।

এর আগে, ২০১২ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৭৫ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৬৪ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৫৯ শতাংশ। সেই হিসাবে শনিবারের সিটি নির্বাচনেই সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে।

২০১৯ সালে ময়মনসিংহ সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী কেবল একজন হওয়ায় ভোট করতে হয়নি। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ সদর আসনে ভোটের হার ছিল ৪৪ শতাংশ। এবার ইকরামুল হক টিটু বিজয়ী হবেন এটা অধিকাংশ ভোটার আগেই ধারণা করেছিলেন।

২০১৪ সাল পর্যন্ত স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ছিল না। তবে ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকার এই নির্বাচনগুলোও দলীয়ভাবে করার সিদ্ধান্ত নেয়। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে নানা বিতর্ক ছিল। শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রতীকে ভোট হওয়ায় ভোটপূর্ব-সহিংসতা কিছুটা কম হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় সংসদ সদস্যদের প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। তাতে এমপির প্রার্থী হিসেবে তকমা লেগে যেত। ফলে ওই প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতেই ভয় পেতেন অন্যরা। দলীয় প্রতীকে না হওয়ায় আগামীতে প্রার্থী আরও বাড়তেও পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

গত শনিবার শুধু দুই সিটি করপোরেশনে ভোট ছিল না। পৌরসভা, জেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদে কোথাও সাধারণ নির্বাচন, কোথাও উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সব মিলিয়ে ২৩৩টি পদে রায় দিয়েছেন ভোটাররা। এর কোনোটিতেই আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেয়নি, কাউকে সমর্থনও জানায়নি।

 

 

ট্যাগ: