নিজস্ব প্রতিবেদক:
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী এলাকায় উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রায় ১৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ)। কিন্তু জনবল আর অর্থ সংকটে এই প্রকল্পটি যেন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১০০ জন গ্রামীণ জনগোষ্ঠির মানুষকেউ। অথচ উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি প্রযুক্তি বিস্তার, দক্ষতা উন্নয়ন ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে একাডেমিটিকে গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। বাস্তবে বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ হলেও সেগুলোর বড় অংশই ব্যবহার হচ্ছে না। পড়ে থেকে নষ্ঠ হচ্ছে ভবন, ভবনের এসি-জানালা-দরজাগুলোও। এরই মধ্যে ভবনের ওয়ালের চুন-রংও উঠতে শুরু করেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালের অক্টোবরে। দীর্ঘ নির্মাণকাজ শেষে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয় ২০২২ সালের শেষের দিকে। কিন্তু কার্যক্রম শুরুর প্রায় তিন বছর পরও প্রতিষ্ঠানটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। অর্থাভাব, জনবল সংকট ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতায় এখনো পুরোপুরি সচল হয়নি একাডেমিটি। অথচ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার উদ্দেশ্যে এ প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে স্থায়ীভাবে কর্মরত রয়েছেন মাত্র চারজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের সহায়তায় অস্থায়ীভাবে নিয়োগ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে আরও নয়জনকে। ফলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রশিক্ষক, গবেষক নিয়োগ না হওয়ায় অধিকাংশ ভবন কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে। তালাবদ্ধ থাকছে অধিকাংশ কক্ষই। ভবন নিয়মিত ব্যবহার না হওয়ায় ধুলোবালিও জমেছে। ওয়ালের চুন এবং রংও উঠতে শুরু করেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, একাডেমির বহুতল প্রশাসনিক ও প্রশিক্ষণ ভবনগুলো আধুনিক নকশায় নির্মিত হলেও সেগুলোর অধিকাংশ কক্ষ খালি পড়ে রয়েছে। কয়েকটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) বাইরের অংশ খুলে নিচে চলাচলের রাস্তায় রাখা হয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য নির্মিত আবাসন ভবনটিও অকার্যকর হয়ে পড়ে থাকছে। ফলে কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো কার্যত জনসেবার বাইরে রয়ে গেছে।
এদিকে একাডেমির প্রধান ফটকের সামনের খোলা জায়গা স্থানীয়রা ধান শুকানোর মাঠে পরিণত করেছে। আশপাশের এলাকা থেকে কৃষকরা ধান জমি থেকে কেটে এনে সেখানে মাড়াই ও শুকানোর কাজ করছেন।
স্থানীয় জুলহাস নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘গেটের সামনে খোলা জায়গা ব্যবহৃত হয় না তেমন। পড়েই থাকে। লোকজন যাতায়াতও করে না তেমন। তাই আমরা ধান মাড়ায় করে শুকাচ্ছি। সংশ্লিষ্টদের মতে, জনবল নিয়োগ ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত অর্থায়ন, দক্ষ প্রশিক্ষক এবং গবেষণা কার্যক্রম। কিন্তু বর্তমানে সীমিত জনবল দিয়ে কেবল ন্যূনতম প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, রংপুর বিভাগে বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমির আদলে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে “রংপুরে পল্লী উন্নয়ন একাডেমি স্থাপন” প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ১৩৯ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। এর পর ২০২৩ সাল থেকে গ্রামীণ জনজীবনকে উন্নত করতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করে এ প্রতিষ্ঠানটি। সর্বশেষ চলতি অর্থ বছরে মাত্র দুই লাখ টাকা বরাদ্দ পায় প্রতিষ্ঠানটি। তাতে ২০ জনকে কম্পিউটার শিক্ষণ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আগের দুই বছরেও সাকূল্যে ৭০ জনের মতো গ্রামীণ যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর বাইরে সরকারি ও বেসরকারী বাইরের প্রতিষ্টানগুলো সেমিনার কক্ষ ভাড়া নিয়ে কয়েকটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্পন্ন করে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ‘অসাধারণ পরিপাটি করে সাজানো হয়েছে এই একাডেমিটি। একটি মসজিদসহ মোট ১০টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে ১০ তলা প্রশাসনিক ভবন রয়েছে একটি। সেটির চারটি এসি খুলে নিচে পায়ে হাঁটার রাস্তায় রাখা হয়েছে। একাডেমীর ভিতরের রাস্তাগুলো দেবদারু আর ফুল গাছে সাজানো হয়েছে। প্রশাসনিক ভবন থেকে প্রশিক্ষণ ভবনে যাওয়ার দুটি পথকে ছায়াযুক্ত করতে ওপরে ছাদ দেওয়া হয়েছে। নিচে টাইলসে মোড়ানে হয়েছে। এ পথদুটি একাডেমির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুন। কিন্তু তিন বছর ধরে এ পথদুটিও তেমন ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে এ পথেই এসি খুলে রাখা হয়েছে। ভিতরে গড়ে তোলা হয়ে চমৎকার একটি আধুনিক মসজিদ। কিন্তু জনবলের অভাবে সেখানে নামাজ পড়তে মুসল্লিও তেমন হয় না। হাতে গোনা ৫-৭ জন মিলে নামাজ আদায় করা হয় এ বিশালাকার মসজিদটিতে।
স্থানীয় মনিরুল ইসলাম নামের এক যুবক বলেন, ‘সরকারি অর্থে বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করে এতো বড় প্রতিষ্ঠানটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারে, তাহলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের সুফল জনগণ পাবে না। দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে একাডেমিটিকে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সূত্র মতে, গত নির্দলীয় সরকারের সময় এ প্রতিষ্ঠানটির জন্য ৫৭ জন জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর ওই নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে যায়। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আবারো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে দুইজন পরিচালক একজন মহাপরিচালক এবং ১০ জন অস্থায়ী কর্মচারী দিয়ে কোনো মতে খুড়িয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক জাহেদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘জনবল আর অর্থ সংকটের কারণেই মূলত আমরা পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করতে পারিনি। একটি এ্যাগ্রো প্রসেসিং ইউনিট আছে, সেটিও চালু করা যায় না। এখানে গরুর ফার্ম গড়ে তুলে যুবকদরে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু এখনো চালু করা যায়নি। আবার বিশাল এ প্রতিষ্ঠানটিতে আট জেলার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠিকে কম্পিউটারসহ কারিগরি নানা প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রুপান্তর করার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু সেটিও হচ্ছে না একই কারণে। ফলে জনবল এবং প্রশিক্ষক না থাকায় ভবনগুলোও পড়ে থাকছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি চিকিৎসা ভবন আছে। সেটিও পড়ে আছে। দুটি হোস্টেলসহ ১০ দলা প্রশাসনিক ভবন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভবন সবগুলোই পড়ে আছে। শুধু মহাপরিচালক স্যার আর পরিচালকদের দুটি ভবন ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে অন্য ভবনগুলো ব্যবহৃত না হওয়ায় অনেক জিনিসই নষ্ট হতে বসেছে। তবে আশা করছি দ্রুতই পুরোদমে আমরা কার্যকম শুরু করতে পারব। জনবল না থাকায় আমরা বাজেট বরাদ্দও কম পাচ্ছি। ফলে প্রশিক্ষণও কম হচ্ছে।’









