নিজস্ব প্রতিবদেক :
আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষে রাজশাহীর তানোর উপজেলার মোহর গ্রামে প্রায় ৩৫০ বছর বয়সী একটি তেঁতুল গাছের নিচে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী ‘কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য উৎসব’। “একটি গাছ, একটি বাস্তুসংস্থান” প্রতিপাদ্যে বৃহস্পতিবার এ উৎসবের আয়োজন করে তানোর উপজেলা জনসংগঠন সমন্বয় কমিটি, গ্রিন কোয়ালিশন ও বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক)।
আয়োজকরা জানান, মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের নিবিড় সম্পর্ক নতুনভাবে উপলব্ধি করানো এবং দেশীয় প্রাণবৈচিত্র্য ও কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরাই ছিল এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য। বক্তারা বলেন, একটি গাছ শুধু ছায়া দেয় না; তার শিকড়, কাণ্ড, ডালপালা ও পাতাকে ঘিরে অসংখ্য অণুজীব, পাখি, মৌমাছি, কাঠবিড়ালি ও অন্যান্য প্রাণীর আবাস গড়ে ওঠে। ফলে একটি প্রবীণ গাছ নিজেই একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্রের অংশ হয়ে ওঠে।

উৎসবে ১৪০ প্রজাতির ধান, গম ও সবজির বীজ প্রদর্শন করা হয়। পাশাপাশি শাপলা, শালুক, পদ্ম, শামুক, ঝিনুক, দেশীয় পরিবেশবান্ধব মাছ ধরার সরঞ্জাম, ৪৫ প্রজাতির অচাষকৃত শাকসবজি, বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন নদীর পানি ও মাটির বৈচিত্র্য এবং পরিবেশবান্ধব চুলা প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী কৃষক-কৃষাণীরাও নিজেদের মধ্যে দেশীয় বীজ বিনিময় করেন।
বারসিকের প্রোগ্রাম অফিসার অমৃত সরকারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবসের তাৎপর্য ও কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেন বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান আতিক। তিনি বলেন, প্রাণবৈচিত্র্য শুধু বন বা বন্যপ্রাণীর বিষয় নয়; এটি খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কৃষি, বন, মৎস্য, খাদ্যব্যবস্থা ও নির্মাণ খাত সরাসরি জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল। তাই জৈবিক সম্পদ সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানে তানোর উপজেলার ১০টি গ্রামের কৃষক-কৃষাণী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন তরুণ ও যুব সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন। আলোচনায় স্থানীয় পর্যায়ে প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে গৃহীত নানা উদ্যোগ তুলে ধরা হয়।
দুবইল গ্রামের কৃষক ও বরেন্দ্র বীজ ব্যাংকের সভাপতি জায়দুর রহমান বলেন, দেশীয় ধানের বৈচিত্র্য রক্ষার জন্য তিনি প্রতি বছর আউশ, আমন ও বোরো মৌসুমে প্রায় ১৭০ জাতের ধান চাষ করেন এবং কৃষকদের মধ্যে সেই বীজ বিনিময় করেন। তার মতে, দেশীয় ধানের জাত হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে গ্রামীণ ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও নবান্ন উৎসবের মতো কৃষিনির্ভর সামাজিক চর্চাও।
জগদীশপুর গ্রামের কৃষাণী সেতারা বেগম বলেন, তিনি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াই বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করেন এবং জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করেন। তার বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের দেশীয় বীজ সংরক্ষণ করা হয়, যেখান থেকে স্থানীয় মানুষ বীজ সংগ্রহ করেন। তিনি জানান, বর্তমানে অনেক অচাষকৃত শাক বিলুপ্তির পথে। তাই তিনি নিজের বাড়িতে প্রায় ৩০ প্রজাতির অচাষকৃত শাক চাষ করে সেগুলো সংরক্ষণের চেষ্টা করছেন।
মণ্ডুমালা গ্রামের আদিবাসী কৃষাণী মনিকা টুডু বলেন, একসময় এলাকার খাদ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিভিন্ন জলজ প্রাণী, শামুক ও ঝিনুক। কিন্তু বর্তমানে এসব অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তাই তিনি একটি পুকুরে শামুক-ঝিনুক, শাপলা ও শালুক সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন, যাতে জলজ প্রাণবৈচিত্র্য টিকে থাকে।
স্বশিক্ষিত কৃষিবিজ্ঞানী নূর মোহাম্মদ বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে কৃষিজমিতে নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, তানোরের প্রাণবৈচিত্র্যের অন্যতম আধার বিল কুমারী ও বিলজোয়ানা এলাকায় অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে অনেক দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গ্রিন কোয়ালিশনের মাধ্যমে সচেতনতামূলক সভা ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
বক্তারা বলেন, প্রকৃতি ও কৃষির টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে দেশীয় বীজ, জলজ সম্পদ, অচাষকৃত খাদ্যশস্য এবং পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চা সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।









