
নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজশাহীর-০৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মো. আয়েন উদ্দিনের চাহিদাপত্র (ডিও) জালিয়াতি করে ট্রেনের টিকিট কাটার অভিযোগ উঠেছে। সেই টিকিটে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌরসভার মেয়র শহীদুজ্জামান শহীদ ও তার কয়েকজন ঘনিষ্টজন গত সোমবার (২২ আগস্ট) রাজশাহী থেকে ঢাকায় গিয়েছেন।

তবে যেই টিকিটে পৌর মেয়র ঢাকায় গিয়েছেন সেটি এমপি আয়েনের ডিও লেটারের মাধ্যমে কাটা হয়েছিলো এবং ডিওতে এমপি আয়েন পরিবার নিয়ে ঢাকায় যাবেন বলে উল্লেখ ছিলো। তবে এমপি আয়েনের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলা হলে তিনি ডিও দিয়ে টিকিট কাটার কথা অস্বীকার করেন। এমনকি কেশরহাট পৌরসভার মেয়র শহীদও এমপি আয়েনের ডিও লেটার দিয়ে টিকিট কাটার কথা অস্বীকার করেন। তবে ট্রেনের টিকিট ক্রয় করতে এমপি আয়েনের ডিও লেটার রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের টিকিট কাউন্টারে কীভাবে গেল এই নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
সূত্র জানায়, এমপি আয়েনের ডিও লেটার দিয়ে রাজশাহী-ঢাকার মধ্যে চলাচলকারী ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি ডাবল কেবিনের টিকিট কাটা হয়। তবে সেই টিকিটে এমপি আয়েন ও তার পরিবার ঢাকায় না যাওয়ায় গত সোমবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টায় পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) অসীম কুমার তালুকদার ঢাকাগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেন ছাড়ার আগে ট্রেনের নির্দিষ্ট কেবিনে গিয়ে সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের বিষয়ে খোঁজ-খবর নেন।
জানতে চাইলে পশ্চিম রেলের জিএম বলেন, রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিন সাহেব সপরিবারে ঢাকায় যাবেন বলে একটি ডিও দেন। ফলে তাকে ধূমকেতু ট্রেনের একটি ডাবল কেবিন দেওয়া হয়। তবে আমি নিজে সরেজমিনে গিয়ে দেখি- এমপি সাহেব ঢাকায় যাচ্ছেন না। তার জন্য বরাদ্দকৃত কেবিনে যাচ্ছেন অন্য যাত্রীরা। বিষয়টি এক ধরনের জালিয়াতি। এ ঘটনার সঙ্গে রেলের কেউ জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলেও জানান পশ্চিম রেলের এই শীর্ষ কর্মকর্তা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২১ আগস্ট (রবিবার) রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিনের সংসদের প্যাডে একটি চাহিদাপত্র (ডিও) আসে রেলওয়ে টিকিট বুকিং শাখায়। তাতে বলা হয়, ‘আগামী ২২ আগস্ট রাতে আমি ও আমার পরিবারসহ রাজশাহী থেকে ঢাকায় যাব। বিধায় আমাকে একটি ডাবল কেবিন প্রদানের জন্য জোর সুপারিশ করছি।’
এমপির সিল ও স্বাক্ষর করা ডিও লেটারটি রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের প্রধান বুকিং সহকারী আব্দুল মোমিনের কাছে জমা দেন রেলওয়ের ওপেন লাইন শাখা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক আকতার আলী। ফলে প্রধান বুকিং সহকারী ২১ আগস্ট এমপি আয়েন উদ্দিনের নামে ট্রেনের ‘ক’ বগির ৭-১০ নম্বর আসন সম্বলিত একটি ডাবল কেবিন নিশ্চিত ও বরাদ্দ করেন।
টিকিটটি কেটে সাত নম্বর কাউন্টারে রেখে দেওয়া হয়। গত সোমবার শ্রমিক লীগ নেতা আকতার আলী ফোন দিয়ে ৭ নম্বর কাউন্টারের বুকিং সহকারী আব্দুর রশিদকে জানান, মিজানুর রহমান (এমপির পিএস) নামে এমপির একজন লোক আসবেন। তাকে যেন টিকিটটি হস্তান্তর করা হয়। সেই অনুযায়ী, মিজানুর রহমান সোমবার বিকালে রাজশাহী স্টেশনে গেলে তাকে টিকিটটি দেওয়া হয়। তবে টিকিটটি কাটার সময় শ্রমিক লীগ নেতা আখতারে নামের বিপরীতে বকেয়া লিখে রাখা হয়।
এদিকে এমপির ডিওটি দেখে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের প্রধান বুকিং সহকারী আব্দুল মোমিনের সন্দেহ হয়। তিনি এমপিকে ফোন করে কেবিনের জন্য কোনো ডিও দিয়েছেন কিনা জানতে চান। উত্তরে এমপি আয়েন উদ্দিন তাকে জানান, তিনি ২০ আগস্ট (শনিবার) সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে এসেছেন। তিনি ঢাকায় যাচ্ছেন না। আর টিকিটের জন্য কোনো ডিও লেটারও ইস্যু করেননি। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত পশ্চিম রেলওয়ের জিএমের কানে যায়। ফলে জিএম সোমবার রাতে নিজেই ট্রেনের সংশ্লিষ্ট কেবিনে হাজির হন বিষয়টি জানার জন্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এমপির নামে টিকিট ইস্যু হলেও রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী ধূমকেতু আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেনের নির্দিষ্ট কেবিনে যাত্রী ছিলেন মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌরসভার মেয়র শহীদুজ্জামান ও তার তিন ঘনিষ্টজন।
জানতে চাইলে কেশরহাট পৌরসভার মেয়র শহীদুজ্জামান বলেন, ‘আমি এমপির বন্ধু, সেই সাথে আমি একজন জনপ্রতিনিধি। আর আমি এমপির ডিও দিয়ে টিকিট কেটে ঢাকায় যাবো, এটা কীভাবে সম্ভব? আমি একজনকে টিকিট কাটতে বলেছিলাম, সেই ব্যক্তি আমাকে টিকিট কেটে দিয়েছে। এমপির ডিও কে, কীভাবে জালিয়াতি করে টিকিট কেটেছে তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে আমি পশ্চিম রেলের কর্তা ব্যক্তিদের অনুরোধ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি বিষয়টি নিয়ে খুবই অপমানিত বোধ করেছি। ঢাকায় যাওয়া রেলের টিকিটের জন্য বন্ধু আয়েন উদ্দিনের ডিও লেটার জালিয়াতি করে টিকিট কাটতে হবে? আমার নিজেরও তো একটা পরিচয় আছে। আমি একটি পৌরসভার জনপ্রতিনিধি। সেই দিক থেকে আমি যদি রেলওয়ের সংশ্লিষ্টদের ফোন দিয়ে টিকিটের ব্যবস্থা করতে বলি তাহলেই তো আমি টিকিট পাই। তারই ধারাবাহিকতায় আমি রেলের একজনের নিকট ঢাকায় যাওয়ার জন্য টিকিট কাটতে বলি। তিনি এই টিকিট সংগ্রহ আমার লোকের কাছে দিয়েছে বলে জানতে পেরেছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান বুকিং সহকারী আব্দুল মোমিন বলেন, ডিও লেটারটি দেখে আমার প্রথমেই সন্দেহ হয়। তাই সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আমি নিজে এমপি সাহেবকে ফোন করি। এমপি সাহেব ডিও লেটার ইস্যু করেননি বলে আমাকে জানান। তবে এক শ্রমিক লীগ নেতার মাধ্যমে ডিওটি কাউন্টারে আসায় আগেই টিকিট ইস্যু হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে পুরো বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি।’
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে শ্রমিক লীগ নেতা আখতার আলীর ব্যবহৃত মুঠোফোনে মঙ্গলবার (২৩ আগস্ট) রাতে অসংখ্যবার ফোন করা হয়। কিন্তু তার ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এমপির ডিও লেটারটি কীভাবে তার হাতে আসলো তা জানা সম্ভব হয়নি।
সংসদ সদস্য মো. আয়েন উদ্দিন বলেন, ‘ আমি ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য কোনো ডিও লেটার ইস্যু করিনি। কারণ আমার এই মূহুর্তে ঢাকায় যাওয়ার কোনো কর্মসূচি নেই। কে, কীভাবে আমার ডিও রেলে জমা দিয়েছেন তা জানি না। তবে যে বা যারা আমার ডিও লেটার জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত তাকে/তাদের খুঁজে বের করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তদন্ত কমিটি তদন্ত সাপেক্ষে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশাবাদি।’
এএইচ/এস








