আন্তর্জাতিক

জ্বালানি মূল্যের চাপে বৈদেশিক লেনদেন, ৩ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ৭৪৭ কোটি ডলার

নিউজ ডেস্ক৫ নভেম্বর ২০২৬৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:


বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের প্রভাব পড়েছে দেশের বৈদেশিক লেনদেনে। জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। অন্যদিকে শিল্প খাতের স্থবিরতা ও জ্বালানি সংকটে প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না রপ্তানি আয়। ফলে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪৭ কোটি ডলারে। এ সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ। বিপরীতে রপ্তানি আয় বেড়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে এই ব্যবধানের কারণে বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ বাড়ছে।

রেমিট্যান্সে ১৩ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি থাকার পরও চলতি হিসাবে ১৩৩ কোটি ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যেও ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৬ কোটি ডলারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৯৩৩ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ব্যয় ছিল এর চেয়ে কম। এ সময়ে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৮৩৮ কোটি ডলার।

আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ও লুব্রিকেন্ট আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৪২২ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ২০৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে ১০৫ শতাংশ।

খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় দেশের ডলার বাজার ও বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোতে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি না থাকায় আমদানি ব্যয়ের বিপরীতে রপ্তানি আয় যথেষ্ট হচ্ছে না। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের উচ্চমূল্য এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

রেমিট্যান্সেও কাটছে না চলতি হিসাবের ঘাটতি

দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্যও ঘাটতিতে পড়েছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) চলতি হিসাবে ৫৯ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বর শেষে তা ১৩৩ কোটি ডলারের ঘাটতিতে পরিণত হয়েছে।

এ সময়ে রেমিট্যান্সে ১৩ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি থাকলেও চলতি হিসাবের ঘাটতি ঠেকানো যায়নি। কারণ, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশে যে পরিমাণ ডলার আসছে, আমদানির বিপরীতে তার চেয়ে বেশি ডলার ব্যয় হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, আমদানি ব্যয় বেশি হওয়ায় চলতি হিসাবে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়লেও তা আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।

আর্থিক হিসাবে কিছুটা উন্নতি

চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়লেও আর্থিক হিসাবে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আর্থিক হিসাবে ঘাটতি থাকলেও সেপ্টেম্বর শেষে তা ৩২ কোটি ডলারের উদ্বৃত্তে ফিরেছে। মূলত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই), বিদেশি অনুদান ও ঋণপ্রবাহ কিছুটা বাড়ায় এ অবস্থার উন্নতি হয়েছে।

তবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত অনেক কম। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এ হিসাবে ১৭৯ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। ওই সময়ে বিদেশি ঋণ এসেছিল ১০০ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বিদেশি ঋণ এসেছে এর অর্ধেক।

সামগ্রিক লেনদেনেও বাড়ছে চাপ

বাণিজ্যঘাটতি বাড়লেও এতদিন দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনে বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়নি। তবে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে বিদেশি অর্থায়ন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে ৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে ১১৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। রেমিট্যান্সে ভালো প্রবৃদ্ধি থাকলেও সামগ্রিক ঘাটতি পূরণে তা যথেষ্ট হয়নি। এতে দেশের বৈদেশিক খাতের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, জ্বালানি আমদানির উচ্চ ব্যয়ের কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে এর দাম আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এতে সামগ্রিক ব্যয়ের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

তবে এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, সাময়িকভাবে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হলেও পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।

সূত্র: ঢাকা পোস্ট