জাতীয়

জ্বালানি খাতের ভর্তুকি শূন্যে নামানোর চাপ

নিউজ ডেস্ক১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটি নিউজ ডেস্ক

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তির অর্থছাড় পেতে চলতি বছরে বাংলাদেশকে বড় ধরনের সংস্কার করতে হবে। তৃতীয় কিস্তির অর্থছাড় করার কথা রয়েছে আগামী জুন মাসে। এর আগে আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যালোচনা করবে। তৃতীয় কিস্তির জন্য যেসব সংস্কার করতে হবে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে করছাড় কমানো, জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়, ভর্তুকি যৌক্তিক করার কৌশল নির্ধারণ এবং খেলাপি ঋণ কমানো।

আইএমএফের শর্তানুসারে এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে জ্বালানি পণ্যের দাম সমন্বয়ে একটি সময় ভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করতে হবে সরকারকে। এতে ঋণ কর্মসূচি চলাকালে দেশে জ্বালানি পণ্যে কাঠামোগত ভর্তুকির পরিমাণ শূন্যে নামবে।

জানা গেছে, প্রতি মাসে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। শুরুতে অল্প অল্প করে সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকার ভর্তুকি থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীও ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, আইএমএফের চলমান পরীক্ষায় পাস করলেই কেবল ঋণের তৃতীয় কিস্তির অর্থ পাওয়া যাবে। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, অনগোয়িং টেস্টগুলোতে (চলমান পরীক্ষা) পাস করতে হবে। তাহলে সেটি পাওয়া যাবে। আইএমএফ যে টার্গেট দিয়েছে, আমরা তো ভালো করছি। বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয়েছে আমাদের। মার্চ মাসে তারা আবার আসবে এবং দেখবে। এটা তো চলতেই থাকে। আমার তো মনে হচ্ছে, দ্বিতীয় ধাপটাও আমরা মিট করব।

জানা গেছে, আগামী জুন মাসের মধ্যে রাজস্ব, আর্থিক, জ্বালানি, সামাজিক নিরাপত্তা-এই চারটি খাতেই দৃশ্যমান বড় সংস্কার করতে হবে। রাজস্ব খাতে সংস্কারের অন্যতম হলো আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট এবং শুল্ক খাতে বছরের পর বছর যেসব করছাড় দেওয়া হয়েছে, তা কমাতে হবে। চলতি অর্থবছর থেকেই মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক-কর আদায়ের শর্ত পূরণের অগ্রগতি দেখাতে হবে তৃতীয় কিস্তির অর্থছাড়ের আগেই।

আগামী জুন মাসে চলতি অর্থবছর শেষ হবে। বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়। তবে আইএমএফ এই লক্ষ্য কমিয়ে বলেছে, ৪ লাখ কোটি টাকা আদায় করলেই হবে। অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) অবশ্য মাত্র ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার শুল্ক-কর পেয়েছে এনবিআর। আগামী

বাজেটের আগে ভ্যাট ও কাস্টমস শাখায় একটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিট স্থাপন করতে হবে। তবে এনবিআর দুটি ইউনিট স্থাপন করেছে। এসব ইউনিট অবশ্য এখনো পুরোদমে কাজ শুরু করেনি।

জুনের আগে সরকারের দেওয়া ভর্তুকির ক্ষেত্রে দুটি বড় শর্ত আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দর ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করার একটি ‘দাম নির্ধারণ কৌশল’ তৈরির কাজ করতে হবে সরকারকে। আবার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নেওয়া কর্মসূচিগুলো যৌক্তিক করার শর্ত আছে। এই শর্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্য হলো, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি যেন সুরক্ষা বাড়ানো যায়।

জুন মাসের আগে আইএমএফের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক ও বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমানো; মূলধনের জোগান বাড়ানো; প্রভিশনিং রাখা-এসব শর্ত পালন করতে হবে।

সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি খাতে ৪৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাবনা করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। বরাবরের ন্যায়, এবারের বাজেটেও কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে সার, বীজ, অন্যান্য উপকরণ ও সেচ সুবিধা প্রদানে ভর্তুকির জন্য অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। টাকার হিসাবে প্রস্তাবিত বাজেটে এই বরাদ্দের পরিমাণ ১৭ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। এতে একটা বড় অংশ রয়েছে সেচ ব্যবস্থাপনার প্রণোদনা বা ডিজেল ক্রয়ের ভর্তুকি। যা কৃষকদের প্রণোদনার অংশ।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজস্ব বাড়ানোসহ ব্যাংক খাতে যেসব সংস্কারের কথা বলা হয়েছে সেগুলো অনেক আগে থেকেই বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল। কিন্তু এতদিন এসব বিষয়ে হাত না দেওয়ায় এখন একবারে বাস্তবায়ন শুরু হওয়ায় অর্থনীতির ওপর কিছুটা চাপ পড়েছে।

জ্বালানি পণ্য ও বিদ্যুতে ভর্তুকি কমাতে ধাপে ধাপে দাম সমন্বয় করা হবে উল্লেখ করে আইএমএফ বলছে, প্রকৃতপক্ষে এরই মধ্যে সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। এ বছরের জানুয়ারিতে সরকার খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য ৫ শতাংশ এবং সব ধরনের গ্রাহকের ডিমান্ড চার্জ ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। আইএমএফের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে বিভিন্ন ধরনের তথ্য, উপাত্ত ও পরিসংখ্যান কখন কীভাবে প্রকাশ করতে হবে সে বিষয়েও শর্ত দেওয়া হয়েছে। এতে দেখা যায়, বিপিসি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, পদ্মা অয়েল কোম্পানি ও যমুনা অয়েল কোম্পানির ব্যাংক আমানতের তথ্য মাসিক ভিত্তিতে প্রকাশ করতে হবে। মাস শেষ হওয়ার ছয় সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে এ তথ্য প্রকাশ করতে হবে।

 

 

ট্যাগ: