রাজশাহী

‘ঘুমের ছেলেকে বেঁধে চুল কেটে মাথায় কালি দেয়’

নিউজ ডেস্ক২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭৩ মিনিট পড়া

শাহিনুল ইসলাম আশিক:

‘পাবনার ট্রাকে থাকতো শিশু নাজমুল। ট্রিপ থেকে এসে নাজমুল ট্রাকে ঘুমাচ্ছিল। এ সময়ের মধ্যে বা তার আগে কি হয়েছে তা জানে না নাজমুল। তাকে আলমঙ্গীর ঘুম থেকে টেনে তুলে বলে তুই সিডি চালানোর মেমোরি কার্ড নিয়েছিস। তাড়া-তাড়ি দে। নাজমুল বলে আমি তো ঘুমাছিলাম, আমি কখন লিনু (নিলাম)। কুনো(কোন)  কথা না শুনে তাকে মারধর করে তারা।’

আজ বৃহস্পতিবার পুঠিয়ায় নির্যাতনের শিকার শিশু নাজমুল হকের বাবা হাফিজুর রহমান মুঠোফোনে আজ বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সিল্কসিটিনিউজকে এসব কথা বলেন ।

শিশু নাজমুল হকের বাবা হাফিজুর রহমান সিল্কসিটিনিউজকে  বলেন, ‘যখন আলমঙ্গীরের ট্রাকে থাকতো তখন নাজমুলকে ঠিকমত টাকা দিতো না। এক ট্রিপ থেকে আসলে অন্য ট্রিপে যাওয়ার পরে টাকা দিতো। তাই নাজমুল সেই ট্রাক ছেড়ে দিয়ে পাবনার ট্রাকে ওঠে। তাই আলমঙ্গীরের রাগ। সেই জন্য তার গাড়ি ছেড়ে অন্যের গাড়িতে যাওয়া রাগেই নাজমুলকে আরো মাড়ে (মেড়েছে)।’

হাফিজুর রহমান বলেন, ‘নাজমুলের মোটরসাইকেল ঠিক করার কাজ মোটামুটি শেখা হয়ে গেছে। তাই নিজের একটা দোকান দেয়ার জন্য টাকা চায় নাজমুল। বাবার অভাবের সংসার হওয়ায় টাকা দিতে পারে না নাজমুলকে। তাই বাবাকে বলে ট্রাকের কাজে গিয়ে মোটরসাইকেল ঠিক করার জন্য হাতিয়ার পাতি (যন্ত্রপাতি) কিনবে বলে। বর্তমানে পাবনার ট্রাকে নাজমুল।’

তিনি বলেন, ‘ছেলে আমার মোটরসাইকলে মেকানিক্সের কাজ করতো। হাতিয়ার পাতি কিনার জন্য ট্রাকের কাজে লাগে। আমার অভাবের সংসার। কোন মতে চালাতে হয়। তাই বেটা (ছেলে) আমাকে বলে আব্বা আপনে তো টাকা দিতে পারছেন না, আমি কিছু দিন ট্রাকের হেলপারির কাজ করি। তাহলে কিছু টাকা হলে আমি মোটরসাইকেল ঠিক করার জন্য হাতিয়ার পাতি (যন্ত্রপাতি) কিনবো।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি আগে কৃষি কাজ করতাম। এখন পুঠিয়া থানায় বড় স্যারের ফয়ফরমাজ (হুকুম) শুনি। আমার চার ছেলে মেয়ে। এর মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। একটা মেয়ে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। আর ছোট ছেলে ক্লাস ৫ম শ্রেণিতে পড়ে ও আর একটা ছেলে নাজমুল কাজ করে। নাজমুল শান্ত বললেই চলে। কারো সাথে কোন ঝামেলা করে না। নিজের কাজ করে, আর বাড়িতে চলে আসে। কেউ কিছু বললে জবাব পর্যন্ত দেয় না।’

আসামি পক্ষের লোকজন আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে নাজমুলের বাবা হাফিজুর রজমান সিল্কসিটিনিউজকে  বলেন, ‘আমি তাদের পাত্তা দেই নি।’ আসামি পক্ষের লোকজন টাকা পয়সার দিয়ে মীমাংসা করতে চাইলে আপনি কি করবেন? এমন প্রশ্নের উত্তরেও তিনি বলেন, ‘তারা আমার ঘুমের ছেলেকে বেঁধে চুল কেটে মাথায় কালি দিয়ে মারধর করেছে। আমি এর বিচার চাই। আইনে যা হবে আমি তা মেনে নেবো।’

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার সকালে উপজেলা সদরে খাঁন ফিলিং স্টেশনে বিপি পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সিডি মেমোরী চুরি হয়। ওই চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার অপবাদে নির্যাতনের স্বীকার শিশু নাজমুল হককে সন্দেহ করে ট্রাকের সাথে বেঁধে রাখে চালকসহ পরিবহনের অন্যন্য সহযোগীরা। স্টেশনের কর্তব্যরত কর্মচারী ও পরিবহনের চালকসহ সহযোগীরা শিশু নাজমুলকে ব্যাপক মারধর করে মাথার চুল কেটে মুখে কালি মাখিয়ে দেন। এঘটনায় নির্যাতিত শিশু নাজমুলের বাবা এই অমানবিক নির্যাতনের বিচার দাবি করেন।

এ ঘটনায় মঙ্গলবার নাজমুলের বাবা বাদি হয়ে পুঠিয়ায় একটি শিশু নির্যাতনের মামলা করেন। মামলায় ৫ জনকে আসামী করা হলে বিপি পরিবহনের সুপার ভাইজার নুরুল ইসলাম ও গাড়ির ড্রাইভার আক্কেল আলীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এঘটনার পরে নাজমুল থানায় নির্যাতনের স্বীকারক্তিমূলোক জবানবন্দি দেয়।

পুঠিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি তদন্ত) রাকিবুল হাসান জানান, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টায় নির্যাতিত শিশু নাজমুল হকের (১২) বাবা হাফিজুর রহমান বাদী হয়ে ৫ জনকে আসামী করে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। বাকি তথ্যগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

 

স/আ