সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (রামেবি) ক্যাম্পাসের আমবাগান ইজারার বিজ্ঞপ্তি স্থানীয় দুই পত্রিকায় প্রকাশ করার কথা জানায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পত্রিকা দুইটির কপিও সংরক্ষণে রয়েছে তাদের কাছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর মধ্যে একটি পত্রিকার কোনো সংখ্যা সেদিন রাজশাহীর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অন্য পত্রিকাটির ই-পেপারেও এমন কোনো বিজ্ঞপ্তির অস্তিত্ব ছিল না।
অভিযোগ উঠেছে, নিয়ম অনুযায়ী বাগানের ইজারা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতায় পরিকল্পিতভাবে সেটি গোপন করা হয়েছিল। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তথ্য আগে থেকে জানা থাকায় কেউ একটি পত্রিকার সব কপি নিজেরাই কিনে নিয়েছিলেন। অপর একটি পত্রিকার মাত্র একটি কপিতেই সেই বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করা হয়, যেটি রামেবির রেজিস্ট্রার দপ্তরে রয়েছে। ফলে ইজারা গ্রহণে আগ্রহী ব্যবসায়ীরা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বিষয়টি জানতেই পারেননি।

তবে আশ্চর্যজনকভাবে শুধু সিরাজুল এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানই শুধু বিষয়টি জানতে পেরেছিলেন। পরে ওই প্রতিষ্ঠানটি নামমাত্র ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বাগানটির ইজারা পায়।
রামেবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত ২৮ মার্চ আমবাগান ইজারার বিজ্ঞপ্তিটি স্থানীয় দুটি পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিটি দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. হাসিবুল হোসেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রামেবির ক্যাম্পাসের জন্য অধিগ্রহণ করা ২০৫ বিঘা জমিতে প্রায় ৪ হাজার আম গাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে গত মৌসুমে প্রায় কোটি টাকার আম বিক্রি করা হয়। এতগুলো গাছসহ বাগানটি ইজারা দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দায়িত্বে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরের ওপর। রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার দাবি জানালেও, বাস্তবে পত্রিকা কিংবা বিজ্ঞাপন কোনোকিছুই পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া বিষয়টি গোপন করতে রামেবির নোটিশ বোর্ড কিংবা ওয়েবসাইটেও এ বিষয়ে কোনো কিছু প্রকাশ করা হয়নি।
আবার রামেবির কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা পত্রিকার বিজ্ঞপ্তিতে ৪ হাজার গাছের জায়গায় গাছ সংখ্যা উল্লেখ্য করা হয়েছে মাত্র ৬০০।
যে দুইটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়ার কথা জানায় বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার দপ্তর, তার মধ্যে একটি নিয়মিত ছাপা হয়। বিভিন্ন দপ্তরেও তার কপি সংরক্ষণ করা হয়। প্রতিবেদক ওই পত্রিকার ২৮ মার্চের একটি কপি খুঁজতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ দপ্তর, জেলা ও আঞ্চলিক তথ্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান। সিটি করপোরেশনে দেখা যায়, পত্রিকাটির ২৬ ও ২৯ মার্চের কপি সংরক্ষণ করা আছে। তবে ২৮ মার্চের সংখ্যা নেই।
জনসংযোগ বিভাগ জানায়, পত্রিকাটি সেদিন আসেনি। একই তথ্য জানায়, জেলা ও আঞ্চলিক তথ্য অফিসও।
ওই দিনের একটি কপি পেতে প্রতিবেদক তিনবার পত্রিকাটির অফিসেও যান। তবে তাকে কোনো কপি সরবরাহ করা হয়নি। পরে বিজ্ঞাপন বিভাগের একজন কর্মী বলেন, ‘পত্রিকাটি আপনি পাবেন না।’
২৮ মার্চ প্রকাশিত অপর আরেকটি পত্রিকার চারপাতার ই-পেপারের কোথাও রামেবির আমবাগান ইজারার বিজ্ঞপ্তিটি দেখা যায়নি। যদিও রামেবির রেজিস্ট্রারের দপ্তরে সংরক্ষিত পত্রিকাটির তৃতীয় পাতায় ওই বিজ্ঞপ্তিটি ছিল।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক রামেবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, পছন্দের লোককে পানি দরে আমবাগান ইজারা দিতে পরিকল্পিতভাবে সেদিনের ওই বিজ্ঞপ্তি গোপন করা হয়েছিল। এই দুর্নীতির হোতা রেজিস্ট্রার হাসিবুল হোসেন। তাকে সহযোগিতা করেছেন উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী নাজমুল হোসেন। তারা বাগান ইজারা নেওয়া ব্যক্তির কাছ থেকে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাগানের ইজারা পাওয়া সিরাজুল এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠানটি একটি ছাত্রসংগঠনের রাজশাহী মহানগরের সাবেক সভাপতি খাইরুল ইসলামের। তার হয়ে সবকিছু দেখাশোনা করেছিলেন হাফিজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। আমের মৌসুম শেষে কর্মকর্তাদের খুশি করতে তারা উপাচার্যের দপ্তরে ভূরিভোজেরও আয়োজন করেছিলেন। হাফিজুল বিষয়টি স্বীকার করে বলেছেন, ‘টাকা দিয়েছিলেন খাইরুল ইসলাম।’
তবে খাইরুল তা অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার এত টাকা নেই। হাফিজুল কেন আমার কথা বলেছে আমি বলতে পারব না। কেন বলেছে তাকেই জিজ্ঞেস করেন।’ পানি দরে আমবাগান ইজারা নেওয়ার বিষয়ে খাইরুল বলেন, ‘আমি তো দুই পয়সা লাভ করার জন্যই নিয়েছি।’
পরিকল্পিতভাবে ইজারা বিজ্ঞপ্তি গোপন করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন রামেবির রেজিস্ট্রার হাসিবুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘পত্রিকার সব কপিতে বিজ্ঞাপন ছাপানো হলো কি না সেটা আমার পক্ষে দেখা সম্ভব না। আমি শুধু দেখেছি, আমার অফিসে আসা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন আছে কি না।’ তিনি এই ইজারা সংক্রান্ত কোনো তথ্য দেবেন না জানিয়ে রামেবির জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
তবে জনসংযোগ কর্মকর্তা জামাল উদ্দীন জানান, রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে তাকেও কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। তাই তিনিও কোনো তথ্য দিতে পারবেন না। কোনো তথ্যের প্রয়োজন হলে প্রতিবেদককে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার কথা বলেন তিনি।









