ধর্ম

কালের সাক্ষী খান জাহান আলী জামে মসজিদ

নিউজ ডেস্ক২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫৩ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

যশোরের অভয়নগরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক খান জাহান আলী জামে মসজিদ, স্থানীয়রা যাকে শুভরাড়া জামে মসজিদ নামেও চেনে। এই মসজিদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অত্র অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টীয় ১৫ শতকে খুলনা-বাগেরহাট অঞ্চলের বিখ্যাত সুফি সাধক ও ইসলাম প্রচারক খান জাহান আলী (রহ.) এই মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনি অত্র অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বের হলে শুভরাড়া গ্রামে পৌঁছান।

তখন তিনি এই গ্রামের বাশুয়াড়িতে একটি বিশাল দিঘি খনন করেন এবং পাশে প্রাচীন এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। শুভরাড়া জামে মসজিদ খান জাহান আলী (রহ.)-এর আমলের উন্নত নির্মাণশৈলী ও কৌশলের নিদর্শনও বটে। খান জাহান আলী (রহ.) শুধু একজন ধর্ম প্রচারক সুফি ছিলেন না, তিনি একজন দক্ষ শাসকও ছিলেন। তিনি তাঁর শাসনামলে অত্র অঞ্চলে অসংখ্য রাস্তাঘাট, মসজিদ ও সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

তিনি অসংখ্য দিঘি খনন করে অত্র অঞ্চলের মানুষের সুপেয় পানির কষ্ট দূর করেন।
ভৈরব নদের তীরে নির্মিত খান জাহান আলী মসজিদ নওয়াপাড়া বাজার থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে এবং প্রাচীন নগরী খলিফাতাবাদ থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মসজিদটি এক গম্বুজ ও চার মিনার বিশিষ্ট। শুভরাড়া মসজিদের পাশেই রয়েছে একটি প্রাচীন মাজার।

ধারণা করা হয়, তিনি ছিলেন খান জাহান আলী (রহ.)-এর শিষ্য ও খাদেম। তাঁকে তিনি মসজিদ পরিচালনা ও দ্বিন প্রচারের জন্য রেখে যান। তবে স্থানীয়দের কেউ কেউ এটাকে জিনের কবর বলেন। তাঁদের মতে, খান জাহান আলী (রহ.) যেসব জিনের সাহায্যের দিঘি খনন ও মসজিদ নির্মাণ করাতেন তাদের একজনের মৃত্যু হলে মসজিদের পাশে তাকে দাফন করা হয়। কারো কারো মতে, খান জাহান আলী (রহ.) নিজে শুভরাড়া মসজিদ নির্মাণ করেননি, বরং তাঁর নির্দেশে তাঁর কোনো অনুসারী মসজিদ নির্মাণ করেন, যাকে পরে মসজিদের পাশে দাফন করা হয়।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, বর্গাকার মসজিদটির অভ্যন্তরীণ পরিমাপ ৫.১৩ বর্গমিটার। এর চার কোণায় চারটি অষ্টম কোণাকৃতি টারেট রয়েছে। মসজিদের ভেতরের আয়তন ১৬ ফুট ১০ ইঞ্চি গুণ ১৬ ফুট ১০ ইঞ্চি, উচ্চতা ২৫ ফুট। মসজিদের উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ দেয়ালে তিনটি দরজা আছে। পূর্ব দিকের দেয়ালে আছে সদর দরজার খিলান, যার দৈর্ঘ্য ১১ ফুট এবং প্রস্থ ছয় ফুট ১০ ইঞ্চি। বিশেষ পদ্ধতিতে নির্মিত মসজিদে ছোট-বড় সব ধরনের ইট ব্যবহার করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্রের ‘যশোর ও খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, খ্রিস্টীয় ১৪৪৫ থেকে ১৪৫৯ সালের মধ্যে কোনো একসময় মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী বাশুয়াড়ি গ্রামে মাত্র এক রাতের মধ্যে সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে একটি দিঘিও খনন করেন। দিঘির খননকাজে ৫০ হাজার শ্রমিক অংশ নিয়েছিল।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুসারে, ১৯৬৩ সালের আগে খান জাহান আলী জামে মসজিদ পরিত্যক্ত ছিল, এর গম্বুজও ভাঙা ছিল। পরে এলাকাবাসী এটি কোনোমতে সংস্কার করে নামাজ আদায় শুরু করে। পরবর্তী সময়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে মসজিদের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার করা হয়। মূল নকশা ও শৈলী অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা হয়। মুসল্লিদের নামাজের জায়গা না হওয়ায় মসজিদের পূর্ব পাশে টিনশেড দিয়ে নামাজের জায়গা বাড়ানো হয়েছে।