রাজশাহী

আরডিএ’র গাফলতিতেই রাজশাহীতে অবৈধ ভবন তৈরীর হিড়িক, চিঠি দিয়েই দায়সার

নিউজ ডেস্ক১৩ জুলাই ২০২৫৬ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজশাহীতে হু হু করে বাড়ছে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের হিড়িক। রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) অনুমতি নিয়েও নকশা বহির্ভূতভাবে বা অনুমোদন ছাড়ায় একের পর এক ভবন গড়ে উঠছে এ নগরীতে। গত ২০ বছরে এমন সাড়ে ৬ হাজার ভবন মালিককে চিঠি দিয়েছে আরডিএ। কিন্তু অবৈধ এসব ভবনের একটিও এখন পর্যন্ত ভাঙার কার্যক্রম হাতে নিতে পারেনি সংস্থাটি। পরিস্থিতি এমন-যেন চিঠি দিয়েই দায়মুক্ত থাকে আরডিএ। এর বাইরে ৭০টি মামলা বিচারাধীন থাকলেও সেগুলোতের নিজেদের পক্ষে রায় নিয়ে আসতে পারছে না আরডিএ।

অভিযোগ উঠেছে, আরডিএ’র ভিতরেই একটি চক্র ভবন মালিকদের পক্ষে যায়, এমন আইনী জটিলতা তৈরী করেন। আবার আরেকটি চক্র অবৈধভাবে নির্মাণ করা ভবনগুলোর মালিকদের থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়ে বিষয়গুলো ধামা-চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে তাদের গাফলতির সুযোগ কাজে লাগিয়েই একের পর এক অবৈধ ভবন নির্মাণ হচ্ছে নগরজুড়ে। এতে করে একটি পরিকল্পিত নগরী গড়ে তুলতে যেমন বেগ হচ্ছে, তেমনি ভবন নিয়ে বাড়ছে ঝূঁকি। এরই মধ্যে রাজশাহীতে সামান্য ভূমিকম্পের ফলে একটি সাততলা ভবনসহ বেশ কয়েকটি ভবন আংশিক হেলে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে।

আরডিএ সূত্র মতে, পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং আধুনিক নগরায়নের লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে রাজশাহী শহর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। পরিবর্তিত হয়ে ২০১৮ সালে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়।

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন, পাব উপজেলার নওহাটা পৌরসভা, কাটাখালী পৌরসভা, দামকুড়া, হড়গ্রাম, হরিপুর, হুজুরিপাড়া, হরিয়ান, বড়গাছি, পারিলা ইউনিয়ন, চারঘাট উপজেলার চারঘাট পৌরসভা (আংশিক), এ উপজেলার ইউসুফপুর ও সলুয়া ইউনিয়ন এবং পুঠিয়া উপজেলার বেলপুকুর, ও বানেশ্বর মিলে মোট ১৫টি প্রশাসনিক এলাকা নিয়ে আরডিএ এলাকা বিস্তৃত। এর মধ্যে প্রধান হিসেবে ধরা হয় রাজশাহী শহরকে। এ শহরে এখন পর্যন্ত অনুমোদিত ভবন গড়ে উঠেছে প্রায় ২৫ হাজার। আর ছোট-বড় মিলে আরও অন্তত ৩০ হাজার রয়েছে। যেগুলোর কিছু অনুমোদন নেওয়া হয়েছে আরডিএ গঠনের আগেই রাজশাহীর তৎকালীন পৌরসভা থেকে। ফলে ঠিক কতটা ভবন রাজশাহীতে অবৈধ এবং কতটা ভবন বৈধ তার কোনো সঠিক হিসেবই এখন পর্যন্ত বের করতে পারেনি আরডিএ।

সূত্র আরও জানায়, আরডিএ মূলত ১৯৮০ সালের পর থেকে নকশা অনুমেদানহীন বা নকশা ছাড়ায় অবৈধভাবে নির্মাণকৃত ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে নোটিশ করতে শুরু করে। তবে কেবলমাত্র প্রতিবেশীরা যেসব ভবন নিয়ে অভিযোগ করেন, সেসব ভবন মালিকদের বিরুদ্ধেই নোটিশ করা হয়। অর্থাৎ অভিযোগ পাওয়ার পরে সেটির সত্যতা যাচাই-বাছাই করে ভবন মালিককে নোটিশ করে আরডিএ। সেই হিসেবে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬ হাজার ভবন মালিককে নোটিশ করেছে আরডিএ। এর মধ্যে গত প্রায় ১০ বছরেই নোটিশ করা হয়েছে ৬ হাজারের মতো। আর নোটিশের পরেও কোনোই জবাব না দেওয়া বড় ধরনের আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৭০টি। তবে সাম্প্রাতিক সময়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে নকশা বহির্ভূতভাবে ব্যাপক হারে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর সঙ্গে ভবন মালিক ও ডেভলোপাররাও যেমন জড়িত, তেমনি আরডিএর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও জড়িত। ফলে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ করার পরেও কোনোই ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না মালিকদের বিরুদ্ধে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাজশাহী নগরীর তেরোখাদিয়া এলাকায় ফুটপাতের কিছু অংশ দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে ৫ তলা ভবন। এই ভবনটির কোনো অনুমোদনই নেননি ভবন মালিক সারোয়ার উদ্দিন। ফলে এ ভবনটি ভেঙে ফেলার জন্য গত ১৩ জানুয়ারি মালিককে নোটিশ করে আরডিএ।

নির্মাণাধীন ওই ভবনটির মালিক আইন ভঙ্গের বিষয়টি স্বীকার করে আরডিএকে লিখিতও দেন পরের দিন। কিন্তু অদ্যবধি এ ভবনটি ভেঙে ফেলার কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি আরডিএ। এমনকি জবাব দেওয়ার পরে ওই অবৈধ ভবনটির নিচের দুই তোলা পর্যন্ত এরই মধ্যে নির্মাণ কাজও শেষ করে ফেলেছেন। বাকি অংশগুলোর কাজও এখনো চলমান রয়েছে।

জানতে চাইলে ভবন মালিক সারোয়ার উদ্দিন বলেন, ‘আরডিএ চাইলে ভেঙে দিবে। আমি আমার কাজ করছি। আমার জমি তো আমি ফেলে রাখতে পারব না।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১১ সালে রাজশাহী নগরীর সবচেয়ে জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সাহেব বাজারে ‘এসএস টাওয়ার’ নামের একটি বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয় ৯ তলা পর্যন্ত। কিন্তু ভবন মালিক অতিরিক্ত আরও দুই তলাসহ মোট ১১ তলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। এর পর বর্ধিত দুই তলা পর্যন্ত ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয় আরডিএ। এ নিয়ে জল গড়ায় আদালত পর্যন্ত।

আরডিএ মামলাটি করলেও শেষ পর্যন্ত নিম্ন আদালতে রায় পান ভবন মালিক সাজ্জাদ হোসেন। পরবর্তিতে আরডিএ মহানগর জজ আদালতে আপিল করেন। আপিলের পর এখন পর্যন্ত মামলাটি চলমান রয়েছে। ফলে ওই ভবনটি আর ভাঙ্গার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা যায়নি।’

ভবন মালিক সাজ্জাদ হোসেন দাবি করেন, ‘আমাকে প্রথমে ১২ তলা পর্যন্ত নো অবজেকশন দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তিতে নকশা অনুমদোন দেওয়া হয় ৯ তলা পর্যন্ত। এ কারণেই নিম্ন আদালতে আমি রায় পেয়েছি। আশা করে জজ আদালতেও আমার পক্ষেই রায় যাবে।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাকে দুই ধরনের অনুমোদন দিল কেন তারা? এর দায়ভার তো তাদেরই। তারা বাণিজ্য করার জন্য আমাকে দুই রকমের অনুমোদন দিয়ে এখন ভবন ভাঙতে বললেই তো আর হবে না।’

সূত্র মতে, রাজশাহী নগরীর ঘোড়ামারা এলাকায় ‘গ্রীণ প্যালেস’ নামের একটি সাততলা ভবনে ১৮৫০ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাট চার বছর আগে কেনেন জনৈক অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, এ ভবনে ডেভেলপার মোস্তাফিজুর রহমানের নিকট থেকে তিনি সেখানে ফ্ল্যাটটি কেনেন। ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার আশায় ওই ফ্ল্যাটটি কিনে পরে রেজিস্ট্রি করতে গিয়ে দেখা যায় ভবনটির অনুমোদন আছে ১৭২০ স্কয়ার ফিট। নকশার বাইরে বাকি ১৩০ স্কয়ার ফিট অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে ওই ফ্ল্যাট মালিক বার ব্যাংক লোন না পেয়ে বেকায়দায় পড়ে যান।

আরডিএ সূত্র মতে, এ নিয়ে অভিযোগ উঠার পরে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ডেভলোপার মোস্তাফিজুর রহমানকে বর্ধিত অংশ ফেলে ফেলার নির্দেশ দেন। কিন্তু অদ্যবধি ওই সেই নির্দেশনা আর বাস্তবায়ন হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরডিএ’র একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, অবৈধ ভবন চিহ্নিত করে সেগুলো ভেঙ্গে ফেলার জন্য একজন আইন কর্মকর্তা রয়েছেন। সাদিক আল হায়াত নামের ওই কর্মকর্তা গত প্রায় ৫ বছর ধরে কাজ করেন হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে (অতিরিক্ত দায়িত্ব)। ফলে ভবন ভাঙার নির্দেশনা বাস্তবায়স করতে নানা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে আরডিএকে। আবার আরডিএ’র ভিতরেই গড়ে উঠা একাধিক অসাধু কর্মচারী ভবন মালিকদের পক্ষে যায় এমন কিছু জটিতলতা রেখেই দিচ্ছেন নকশায়। এতে করে মামলা করেও কোনো ফায়দা করতে পারছে না আরডিএ।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক অথোরাইজড কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘সার্বিক বিষয়ে আমার মন্তব্য করার এখতিয়ার নাই। তবে আমি বলতে পারি, অবৈধ ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে আমি থাকাকালে অভিযোগ পেলে বসে থাকিনি। তাদের ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে ফেরার নোটিশ জারি করা হয়। কখনো কখনো মামলাও হয়েছে। তবে নানা কারণে হয়তো অবৈধ ভবন ভেঙে ফেলা যায়নি। এই সুযোগ কিছু চক্র সেটি কাজে লাগাচ্ছে।’

বিষয়টি নিয়ে আরডিএর কর্মকর্তাদের বর্তমান অথোরাইজড কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল তারিকের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি ফোন ধরেননি।