নিজস্ব প্রতিবেদক:
২০১৫ সালের ৭ জুন বরখাস্ত হওয়ার পরে মাঝে কেটে গেছে ২২টি মাস। এর পর পদ ফিরে পেতে দফায় দফায় চালিয়েছেন আইনি লড়াই। এ লড়াই শেষ করে গতকাল রবিবার সকাল ১১টার দিকে তিনি যখন নগর ভবনে ফিরলেন তখন দেখলেন তাঁর কার্যালয়টিতে তালা।
এর ঘন্টা তিনেক পরে তালা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করলেন। তারও ঘন্টা দুয়েক পরে তিনি যখন চেয়ারে বসলেন ঠিক তার মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় পেলেন বরখাস্তের আদেশ। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এক ফ্যাক্সযোগে পাঠানো চিঠিতে গতকাল বিকেল ৩ টা ২০ মিনিটের দিকে ফের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। এরপর চেয়ার ছেড়ে নগর ভবন থেকে বের হয়ে যান জনগণের ভোটে নির্বাচিত নগর পিতা। এমন নাটকীয় ঘটনাটিই ঘটেছে গতকাল রবিবার রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের ক্ষেত্রে।


- যদিও গতকাল রবিবার বিকেলে বরখাস্তে সেই চিঠি পেয়েই যেন হতম্বিত হয়ে পড়েন মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। কি করবেন, উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যেই বা কি বলবেন-শুরুতে যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তবে কিছুক্ষণ থেমে নিজেকে শক্ত করে ফের সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করতে থাকেন তার ক্ষোভ ও ভবিশ্যত কিছু পরিকল্পনা। গতকাল সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া সেই সাক্ষাতকার সিল্কসিটি নিউজের পাঠকদের কাছে তুলে ধরা হলো।
২২ মাস পর নিজের চেয়ারে বসে মেয়র বুলবুল উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট যেই ওয়ার্ডার বা আদেশ দিয়েছেন-তাতে আগামী নির্বাচনের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত আমাকে আর বরখাস্ত করা যাবে না। আদালতের নির্দেশের পরে সরকারের গণতন্ত্র পরিপন্থি যেই কর্মকাণ্ড ছিল, সেগুলো আর ঘটতে পারে না। আমি স্থানীয় সরকারের এই বিভাগকে (রাসিককে) শক্তিশালী করার চেষ্টা করছি। কিন্তু বর্তমান যে অন্তরায় সৃষ্টি হয়েছে-তা দেশের জন্য অশনি সংকেত।’
মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, ‘আইনের মধ্যে দিয়েই আমার বরখাস্তের আদেশ সর্বোচ্চ আদালতে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। তাই আমার বিরুদ্ধে রাজশাহী শহরে যদি রাজনৈতিক বা সামাজিক কারণে ৫০টিও মামলা হয় তার জন্য আমাকে বরখাস্ত করা যাবে না’। কিন্তু সরকার আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে আমাকে আবারো বরখাস্তের আদেশ দিয়েছেন।’
তবে বরখাস্তের আদেশকৃত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় দফার ফ্যাক্স সম্পর্কে মেয়র বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের আদেশবলে আমি এখন থেকে মেয়র। আদালত খেকে পরবর্তি কোনো নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত আমি নিয়মিত অফিস ও দায়িত্ব পালন করবো।’ যেহেতু আমার কাছে কোনো ফ্যাক্স আসেনি। এটা আদালতের কোনো আদেশ নয়। এটা সরকারের ষড়যন্ত্রমূলক ফ্যাক্স। এর আইনগত বৈধতা নেই। কাজেই আমি আমার দায়িত্ব পালন করবো। আমাকে স্থানীয়ভাবে কেউ বাধা দিলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আমি ব্যবস্থা নিব।’

বুলবুল অভিযোগ করে আরো বলেন, ‘আজকে সরকারি এই সেবা প্রতিষ্ঠানকে (রাসিককে) চোরের আখড়া তৈরী করে ফেলা হয়েছে। গত দুই বছর এই সকল কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি। যেই কাউন্সিলর দায়িত্বে ছিলেন আমি বসেই দেখতে পেয়েছি তার নামে দুর্নীতির অভিযোগ। তাহলে সহজেই বোঝা যায় গত দুই বছরে সিটি করপোরেশনের সেবা থেকে জনগণ বঞ্চিত হয়েছে। সাধারণ জনগণরে সেবা প্রাপ্তির জায়গাটি অবমূল্যায়িত হয়েছে। এই অনিয়ম দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত যারা আছেন, আগামী দিনে জনগণের কাছে তাদের কৈফিয়ত দিতে হবে।’
- গতকাল রাসিক ভবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে বুলবুল বলেন, ‘আদালতের নির্দেশে আমিই বৈধ মেয়র। আজকে অসৎ ও দুর্নীতিবাজ কিছু কর্মকর্তার কারণে যেসব কর্মকাণ্ড করা হয়েছে তা দুঃখ ও ন্যাক্কারজনক। আমি সকাল ১০টা থেকে এখানে বসে রয়েছি। কিন্তু আমার যেসব কর্মকর্তা রয়েছেন তাদের দোচালা ভূমিকা আমি দেখতে পেয়েছি। এখানে কাল থেকে যদি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর অসাদাচারণ দেখি তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো। তবে আশা করছি সবাই আমাকে সহযোগিতা করবেন।’
প্রসঙ্গত, মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ২০১৩ সালের ১৫ জুনের সিটি নির্বাচনে ১ লাখ ৩১ হাজার ৫৮ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। ওই বছরের ২১ জুলাই তিনি মেয়র হিসেবে শপথ নেন। পরে ১৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৮ সালের ১৫ জুন তার পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার কথা। কিন্তু তার আগেই নাশকতার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হওয়ায় গত ২০১৫ সালের ৭ মে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালায় থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। এ নিয়ে আইনী লড়াই শেষে গতকাল নগর ফিরে দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি গ্রহণের সময় ফের বরখাস্তের চিঠি পান বুলবুল। এবার নাশকতার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় অভিযোগপত্র আদালত গ্রহণ করায় তাকে বরখাস্ত করে মন্ত্রণালয়।
স/আর









