নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯৫৫ সালের আজকের এই দিনে রাজশাহী জেলার বাগমারা থানার দ্বীপপুর গ্রামের মাতুলালয়ে তিনি জন্মগ্রহন করেন। এ উপলক্ষে নগরীর শালবাগান সংলগ্ন তার নিজ বাস ভবনে প্রদর্শণীর আয়োজন করা হয়েছে। প্রদর্শনীতে অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর স্মৃতিবিজরিত এবং তার ভালোবাসার আসবাব প্রদর্শণ করা হয়েছে।
শনিবার সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তার বাসভবনে আয়োজিত এ প্রদর্শনী দেখতে ভীড় জমান। তার পরিবারের সাথে পরিচিত হতে এবং তার সংগ্রহ শালা প্রদর্শণ করতে আসেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। আর তার স্মতি চারণ করতে গিয়ে, ব্যাবহৃত ভালোবাসার জিনিসগুলো দেখে আবেগে আপ্লুত করেছে অনেককেই।
প্রদর্শনীতে অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর ব্যবহৃত তানপুরা, তবলা, হারমোনিয়াম, তার সংগৃহীত বিখ্যাত বই, ফিল্ম এবং তার তোলা বিশেস মূহুর্তের চিত্রকর্ম প্রদর্শন করা হয়েছে। তার স্বরচিত কবিতা, রচনাসহ বিভিন্ন ম্যাগাজিন প্রদর্শণ করা হয়।

অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর ছেলে রিয়াসাত জানান, বাবার সংগ্রহে অনেক বই ছিল। বাবা অনেক কে সেগুলো বিলিয়ে দিয়েছিলেন। অনেক বইয়ে তার নিজস্ব রচনা ছিল। তিনি সবাইকে বই পড়তে আগ্রহী করে তুলতেন। প্রদর্শনীতে এমন অনেক বই আছে যেগুলো বাবার লিখা আছে। আবার এমন অনেক বই আছে যেগুলো খুবই দূর্লভ।

প্রদর্শনী ঢুকতেই দেখা মেলে তার নিজস্ব তৈরী জীবন জীবিকা এবং গ্রামের বিভিন্ন মেলা নিয়ে ডকুমেন্টারী। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বিলসতি, লালন মেলা, খেতুর মেলা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের অবস্থাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয়ের উপর ডকুমেন্টারী।


প্রদর্শনীর ডান দিকে প্রথমইে রয়েছে তার সংগৃহীত বই সমূহের স্টল। যেখানে রয়েছে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন কবি, সঙ্গীত শিল্পী, উপন্যাসিকদের রচনা ও উপন্যাস গ্রন্থ। আবার ইংরেজী সহিত্যের জোসেফ কনার্ড, টাফ লাক, দ্যা রোমান্টিক ইমাজিনেশন এর মতো অসংখ্য দূর্লভ গ্রন্থ সমূহ। এছাড়াও রয়েছে ভাষাত্বত্ত, চিকিৎসাশাত্র, ভ্রমনকাহিনীর উপর সংগৃহীত নানান গ্রন্থ। তার প্রকাশিত মাসিক সাহিত্যপত্র ‘কোমলগন্ধার’-এর বেশ তার লেখা ছাপা হতো। সেই ম্যাগজিনগুলোও তিনি সংগ্রহ করে রাখতেন যা এই প্রদর্শনীতে সাজানো হয়েছে।

অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী একজন সংস্কৃতমনা ব্যাক্তি ছিলেন। বই এর স্টলের পরেই দেখা মেলে তার সংগৃহীত ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন ফিল্মের ভলিয়াম। সেখানে রয়েছে সেকালের কলের গানের বেশ কিছু ভলিয়াম। তার মধ্যে কিশোর কুমার, সতীন্দ্রনাথ মুখ্যপাধ্যায়, হেমন্ত মুখ্যপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখার্জি, ভূপেন হাজারিক, শ্যামল মিত্র, মান্না দে সহ কিংবদন্তী সঙ্গীত শিল্পীদের ভলিয়াম। এছাড়াও ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন সিনেমা সংগ্রহ রয়েছে।

এর পরেই সাজানো হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ভিডিও সিডি। তার চাকুরী থেকে শুরু করে শিক্ষা সফর, তার জীবনের কিছু স্মরণীয় দিনগুলোর ধারণকৃত ভিডিও সিডি। প্রায় হাজার খানেক সিডির সংগ্রহ রয়েছে সেখানে।

পরের স্টলে রয়েছে তার ব্যবহৃত তানপুরা, হারমোনিয়াম সহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। যেগুলো দিয়ে তিনি সঙ্গীত চর্চা করতেন আর ছেলে মেয়েদের শেখাতেন। তানপুরা আর সেতারের কভার গুলোও আছে স্বযতনে। তার ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রগুলো স্পর্শ করলে তার স্মৃতি মনে পড়ে যায় পরিবারের কাছে।

ব্যাখ্যা দিলেন রেজাউল করিম সিদ্দিকীর মেয়ে রিজওয়ানা হাসিন। তিনি বলেন, বাবা এই তানপুরা সাথে নিয়ে গান বলতেন। মুগ্ধ হয়ে শুনতাম আমরা। তিনি নিজেই হারমোনিয়াম বাজাতেন। আমাদের শেখাতেন। তার স্পর্শ রয়েছে এখানে তাই অতি যত্নে রাখা হয়েছে বাদ্যযন্ত্রগুলো।

তার ভাই রিয়াসাত সিল্কসিটি নিউজকে বলেন, বাবা তখন ষ্টিল ক্যামেরায় ছবি তুলতে পছন্দ করতেন। আমাদের বিভিন্ন আনন্দঘন মুহূর্তগুলোকে ফ্রেম বন্দি করতে ভালোবাসতেন। গ্রামের বিভিন্ন সমস্যা, গ্রামীন ঐতিহ্য তিনি ফুটিয়ে তুলতেন এই ষ্টিল ক্যামেরা দিয়েই। তার অনেক ছবির মধ্যে বিশেষ বিশেষ ছবি এবং হাতের কাছে পাওয়া কিছু ভালো ছবি নিয়ে এ প্রদর্শনী।
এক নজরে রেজাউল করিম
১৯৫৫ সালের ৭ জানুয়ারী রাজশাহী জেলার বাগমারা থানার দ্বীপপুর গ্রামের মাতুলালয়ে জন্মগ্রহন করেন। ১৯৫৮ সালে পিতার চাকরীর সুবাদে কক্সবাজারের রামুতে শৈশবের ২ বছর কাটান। ১৯৬১ সালে নওগাঁর ধামুরহাটে স্কুলজীবন শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর এবি উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৬৬ সালে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হন।১৯৬৮ সালের নভেম্বরে টেষ্ট পরীক্ষা দিতে গিয়ে টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হন। ১৯৬৯ সালে অসুস্থ অবস্থায় ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়ে লেটারসহ প্রথম বিভাগে পাশ করেন এবং রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের কারণে সে সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না হওয়ায় ১৯৭২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় কৃতিত্ত্বে¡র সাথে পাশ করেন। ১৯৭৪ সালে বাবা মা এর ইচ্ছা এবং সুযোগ থাকা স্বত্তেও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগের কারণে মেডিকেল কলেজে না পড়ে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭৭ সালে মাষ্টার্স ডিগ্রি অর্জণ করেন(অনুষ্টিত হয় ১৯৮০ সালে)। ১৯৮১ সালে বিসিএস এর মাধ্যমে ফরিদপুর রাজেন্দ্র সরকারী কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৮৩ সালের ১৬ মার্চ রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮৬ সালে পদন্নোতি লাভ করে সহকারী অধ্যাপক এবং একই বছরে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৯৭ সালে সহযোগী অধ্যাপক হন। ২০০০ সালে স্ব-তত্ত্বাবধানে জড়নবৎঃ ইৎড়হিরহম এর উপর পি.এইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০১-০৪ বিভাগের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব লাভ করেন। ২০০৬ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।২০০৭ সালের ১১ ডিসেম্বর কোমল গন্ধার এর প্রথম সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন, যেখানে সাধারণ মানুষ ও ছাত্রছাত্রীদের লেখা ন্থান পায়। ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারী নিজগ্রাম দরগামাড়িয়াতে শিশুকিশোরদের জন্য একটি গানের স্কুল প্রতিষ্টা করেন। ২০১৬ সালের ২৩ এপ্রিল সকাল ৭ টা ৪০ মিনিটে নিজ বাসার সামনে আততায়ীর চাপাতির আঘাতে খুন হন।
অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর পরিবারের দাবি মূল আসামিকে গ্রেফতার করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হোক। রিয়াসাত বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খুন হয়, সুষ্ঠ বিচার হয়না। আর কোন শিক্ষকের সাথে যেন এমনটা না হয় সে জন্য অপরাধীকে ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। রিজওয়ানা বলেন, বাবার হত্যাকাণ্ডের সাথে কোন ভাবে জড়িত থাকলেও তার ফাঁসি চাই আমরা।
স/শ









