রাজশাহী

আত্মহননে ঝুঁকছে স্কুল-কলেজের ছাত্রীরা

নিউজ ডেস্ক২৪ অক্টোবর ২০১৬৫ মিনিট পড়া

শাহিনুল ইসলাম আশিক:
আত্মহত্যা একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে। আর এ আত্মহত্যা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে স্কুল-কলেজ পডুয়া ছাত্রীদের মধ্যে। কেউ বাবা-মায়ের ওপর অভিমান করে আবার কেউ প্রেম ঘটিত নানা কারণে এ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে।

আত্মহত্যার প্রবনতা স্কুল-কলেজ পডুয়া বা ১৫ থেকে ২২ বছরের ছেলে মেয়েরাই বেশি। আর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ রামেকের তথ্য মতে রাজশাহী অঞ্চলে এ বছরের গত ৯ মাসে আত্মহত্যা করেছেন ১২৭ জন। এর মধ্যে বিষপানে আত্মহত্যা ১১৩ জন ও গলায়ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ১৪ জন। এদের মধ্যে স্কুলের চেয়ে কলেজ শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি। সোমবার রামেক তথ্য কেন্দ্রে ইনচার্জ নাজিম উদ্দিনের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাত নয়টায় নগরীর বর্ণালি মোড় এলাকার সালামা খান ছাত্রীনিবাসের ষষ্ঠ তলার ৬০৭ নম্বর রুমে গলায় ফাঁস দিয়ে মাহবুবা ইসলাম মুন্নি (১৭) নামের এক কলেজ ছাত্রী আত্মহত্যা করে। তিনি রাজশাহী মদজিদ মিশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে শিবগঞ্জ থানা এলাকার মনিরুল ইসলামের মেয়ে। মুন্নির বান্ধবি মাহবুবা জানায়, মুন্নির সাথে শেষ বারের মত বিকেলে কথা হয়।

images-19

গত বছরের ৫ জুলাই রোববার নগরীর হেতেম খাঁ এলাকার একটি ছাত্রীনিবাসে নিজ রুমে তানহা মুকিলা খাতুন (১৭) নামের এক কলেজছাত্রী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। তিনি রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী। সে বাগমারা উপজেলার দিঘলকান্দি গ্রামের মেহের আলীর মেয়ে।

আর আগের বছরের ১২ অগাস্ট নগরীতে এক কলেজছাত্রী নিজ ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে নাবিলা গণি। নিহত নাবিলা রাজশাহী কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। তার বাবা আবদুল গণি কুয়েত প্রবাসি।

তার কিছু দিন পরে চারঘাট উপজেলার কুঠিপাড়া এলাকায় প্রেমিকের যৌতুক দাবির কারণে বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় আত্মহত্যা করে কলেজছাত্রী অ্যানি। তিনি কাদিরাবাদ ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। অ্যানির বাবা অমল দাস পুলিশ একাডেমিতে কনস্টেবল পদে কর্মরত। চারঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার গোলাম মর্তুজা জানিয়েছেন, অ্যানির সঙ্গে পবার হরিপুরের অনিক নামের একজনের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অনিকের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ১০ লাখ টাকা চাওয়া হয়।

index-36-300x168
শনিবার অ্যানি টাকা দিয়ে অনিকের সঙ্গে তার বিয়ের ব্যবস্থা করতে পরিবারের ওপর চাপ দেয়। কিন্তু অমল দাসের কাছে এত টাকা নেই বলে মেয়েকে জানান। পরে অ্যানি আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

গত বছরের ১০ অক্টোবর রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় চৌপুকুরিয়া গ্রামে হীরা খাতুন (১৮) নামে কলেজছাত্রী বিষপানে আত্মহত্যা করে। হীরা চৌপুকুরিয়া গ্রামের আরশাদ আলীর মেয়ে।

গত ১৭ জুলাই নগরীতে মোবাইল ফোন কিনে না দেওয়ায় মা-বাবার উপর অভিমান করে সূর্যী খাতুন (১৮) নামের কলেজছাত্রী নিজ শয়ন কক্ষে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। সে নগরীর সাধুর মোড় এলাকার মজিবুরের রহমানের মেয়ে। নগরীর খাদেমুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার্থী।

গত ৬ জুন প্রেমে ব্যর্থ হয়ে নগরীতে কলেজছাত্রী তালহা মুকিলা খাতুন আত্মহত্যা করে। সেই দিন সন্ধ্যায় নগরীর হেতেম খাঁ এলাকার একটি মেসে থেকে তার ঝুঁলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত তালহা নগরীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী। আত্মহত্যার ঘটনায় তার রুম তল্লাশী করে পুলিশ তিন পৃষ্ঠার একটি সুইসাইডল নোট উদ্ধার করে।

dead-220160515064143-300x166
তার কিছু দিন পরে নগরীর সপুরা এলাকায় পরিবারের ওপর অভিমান করে গলায় ফাঁস দিয়ে কলেজছাত্রী আত্মহত্যা করে। তিনি একই এলাকার সাইফুল ইসলামের মেয়ে ও রাজশাহী কলেজের মাস্টার শেষ বর্ষের ছাত্রী সাথী (২২)। এই বছরের ১৬ জানুয়ারি জেলার চারঘাট উপজেলার বাদুড়িয়া গ্রামে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে মলি খাতুন (১৭) নামের এক কলেজ ছাত্রী আত্মহত্যা করে। মলি একই এলাকার আব্দুল আজিজের মেয়ে।

রাজশাহী মহানগরীর কাজলা এলাকায় একটি ছাত্রীনিবাসে থাকে নকশী নামের এক ছাত্রী বলেন, আমার বাড়ি বগুড়া। আমি রাজশাহীর একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরে। আমার সেই সুবাদে রাজশাহীতে ২ বছর থেকে থাকা। আমি যে ছাত্রীনিবাসে থাকি সেখানকার একটি রুমে আমরা চারজন থাকি। আমার সিনিয়র বড় দুই আপা আর একজন জুনিয়র বোন থাকে। গতকাল শুক্রবার বিকেল সাহেব বাজর আসার পথে এসব কথা বলেন সেই শিক্ষার্থী।

তিনি আরো বলেন, ওই দুই আপার মধ্যে একজন বিবাহিত। তার স্বামী সিলেটেতে একটি বেসকারী কোম্পানিতে চাকরি করেন। আর আপাটা এখানে পড়েন। তিনি ক্লাস শেষে বেশির ভাগ সময় বিকেল পরে আসেতেন। আর ভাইয়াটা ফোন দিলে তিনি ফোন ধরতেন না। পরে বলতেন ক্লাস বা কোচিং এ ছিলাম। ভাইয়া বিশ্বাস না করলে তিনি আমাকে দিয়ে কথা বলাতেন। তখন আমাকে তার দিকে তাকিয়ে বলতাম যে আমার সঙ্গে ক্লাস বা কোচিং এ ছিলো।
images0125
নাম না প্রকাশ করা সর্তে একজন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, আগে কোন শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হোস্টেল ছাড়া বাইরে থাকতে পাড়তো না। আর যদিও থাকতো সেটা এখানকার তুলো নায় অনেক অনেক কম। শিক্ষারা কোন হোস্টেলে থাকেলে তারা একটা বন্দি, ঘেড়া বা জবাবদিহীতা মধ্যে থাকতে হয়। তাই তারা খারপ কাজে তেমন যেতে পারতো না।

তিনি বলেন, এখন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেই তুলোনায় হোস্টেলে থাকার যায়গার সঙ্কট। এর কারণে অনেক শিক্ষার্থী বাইরে থাকেন। শিক্ষার্থীদের হারানো শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে শিক্ষকসহ তাদের নিজেদের এগিয়ে আসতে হবে। আর বাবা মাকে বেশি খোঁজ খবর রাখতে হবে। ছেলে-মেয়ে কি করে।

স/আ