জাতীয়

অতিউৎসাহী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে ইসি

নিউজ ডেস্ক২৮ ডিসেম্বর ২০২৩৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটি নিউজ ডেস্ক

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাঠে আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন খোদ সরকারি কর্মকর্তারা। রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠছে শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, পুলিশ, টিএনওসহ আরও অনেকের বিরুদ্ধে। অভিযোগের সত্যতা মেলায় অনেক কর্মকর্তাকে শোকজও করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রশাসনের তরফে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দফায় দফায় সতর্ক বার্তা দেওয়া হলেও এমন কাণ্ড থামছে না। এসব অতিউৎসাহী কর্মকর্তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে রীতিমতো বিব্রত প্রশাসন।

ইসি বলছে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে তাদের নিয়মিত শোকজ, তলব ও বদলি করা হচ্ছে। আরও গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের থামাতে আরও কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধি অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী কোনো প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না। আর সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ২৫(৩) ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অথবা অন্যত্র কোনো আইনসভার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে অথবা নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণ করতে বা অন্য কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করতে বা প্রভাব খাটাতে পারবেন না।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব করার অভিযোগ করেছেন অ্যাডভোকেট সোহানা তাহমিনা। গত ২৪ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে দেওয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ইউএনও তার নিজের উপজেলা পরিষদ অফিস কক্ষে সব ইউপি চেয়ারম্যানদের ডেকে এনে নৌকার (সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি) পক্ষে নির্বাচন করার নির্দেশ দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, কোনো কর্মকর্তা কোনো পক্ষ নিলে এটি হবে তার ব্যক্তিগত দায়। এ বিষয়ে সরকার কঠোর হবে। নির্বাচনী আচরণবিধি না মানলে বা কেউ ক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা করলে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মেনে বিচারের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

সম্প্রতি বিভাগীয় কমিশনারদের নিয়ে বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেছেন, নিরপেক্ষতার সঙ্গে সুন্দর একটি নির্বাচন উপহার দিতে হবে। তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ভোটে কর্মকর্তাদের যেন কোনো পক্ষ না থাকে।

তবে প্রশাসনের শীর্ষপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি কর্মকর্তারা সচেতন। ভুল করে চাকরির আচরণবিধি ভঙ্গ করছেন না- বরং তারা অতিউৎসাহী হয়ে এসব করতে পারেন। তাদের এমন আচরণে প্রশাসন বিব্রত। অবশ্যই কঠোর হওয়া উচিত নির্বাচন কমিশনের।

জানা গেছে, সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুল মমিন মণ্ডলের পক্ষে নৌকা প্রতীকে সরাসরি ভোট চান চৌহালী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আরিফ সরকার। সরকারি চাকরিজীবী হয়েও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের নৌকার প্রচার চালাতে এবং ভোট দিতে চাপ সৃষ্টি করেন তিনি। এমন অভিযোগে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির কর্মকর্তা ও শাহজাদপুরের সিনিয়র সহকারী জজ মো. সোহেল রানা তাকে তলব করেন। এরপর তিনি আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ২১ ডিসেম্বর এই শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন স্থানীয় ১০ ব্যক্তি। পরে তাকে শোকজ করে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি।

এর আগে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে সরাসরি অংশগ্রহণ করায় আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. সায়মা আফরোজকে শোকজ করেন নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির সভাপতি ও সিনিয়র সহকারী জজ ধীমান চন্দ্র মণ্ডল।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লা আসনে নৌকার প্রার্থী পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের ভাই আবদুল্লাহ আল মাহমুদ। ওই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বর্তমান এমপি জয়া সেনগুপ্তা কমিশনে অভিযোগ দিয়েছেন, আল মাহমুদের পক্ষে কাজ করছেন দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী।

পাবনা-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেন যে, ওই আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর বাসায় এক বৈঠকে কয়েকজন শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারী সরাসরি নৌকার পক্ষে ভোট চান।

এর আগে লালমনিরহাট-২ আসনে নির্বাচনী প্রচারে অন্তত ২০ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই আসনের নৌকার প্রার্থী সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ। কালীগঞ্জের উত্তর বালাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু সাঈদ প্রকাশ্যে নৌকার নির্বাচনী সভায় বক্তব্য দিয়েছেন। নির্বাচনী পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে ভোট গ্রহণের প্রশিক্ষণ নিলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নৌকার প্রচার চালাচ্ছেন আদিতমারী উপজেলা সমাজসেবা অফিসের সুপারভাইজার রাশেদ আহমেদ।

বগুড়ায় বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য এবং নৌকার প্রার্থী সাহাদারা মান্নান। কমিশনে লিখিত অভিযোগে তিনি বলেছেন, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত অতিরিক্ত কমিশনার (অতিরিক্ত ডিআইজি) হামিদুল আলম মিলন, তার বড় ভাই গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত তৌহিদুল ইসলাম নয়ন এবং নওগাঁ জেলার সাপাহারে কর্মরত উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক রওশনুল কাওছার স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহাজাদী আলম লিপির পক্ষে প্রচার করেন।

ফেনীতে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের নির্বাচনী প্রচারে আনার অভিযোগ উঠেছে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং ধর্মপুর আমিন উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি নূর উদ্দিন জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে।

‘ইসি যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে’

এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সরকারি কর্মকর্তারা জড়িত হতে পারেন না উল্লেখ করে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার আমাদের সময়কে বলেন, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ২৫(৩) লঙ্ঘন। কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী কোনো প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না। নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে।

‘আচরণবিধির ব্যাপারে ইসি সোচ্চার’

সরকারি চাকরিজীবীদের আচরণবিধি লঙ্ঘন সম্পর্কে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ জানান, নির্বাচনী আচরণবিধির ব্যাপারে কমিশন সোচ্চার। সারাদেশে প্রতিদিনই আচরণবিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে শোকজ, তলব, জরিমানাসহ মামলা করা হচ্ছে। সরকারি পদে থেকে কেউ বিধি লঙ্ঘন করলেও ছাড়া হচ্ছে না। ভবিষ্যতে প্রয়োজনে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ট্যাগ: