
সামাজিক বাস্তবতায় পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাত খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। জীবনের নানা প্রয়োজনে একে অন্যের মুখোমুখি হতে হয় আমাদের। মতবিনিময় হয় চেনা-অচেনা হাজারো মানুষের সঙ্গে।পারস্পরিক এ সাক্ষাতের অনন্য সৌন্দর্য হলো হাসিমুখে কথা বলা। মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়ার এটি একটি মহৎ গুণ। এ গুণের অধিকারী যারা, তাদের সবাই পছন্দ করে। কিন্তু আমরা অনেকেই হাসিমুখে সাক্ষাতের এই সৌজন্যটুকু রক্ষা করি না।
কোনো ভালো কাজই ছোট নয় : রাসুল (সা.) উম্মতকে এ ধরনের ভালো আচরণের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এক হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘কোনো ভালো কাজকেই তুচ্ছ মনে করবে না, এমনকি তা যদি তোমার ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাত করার বিষয়ও হয়।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬২৬)

এই হাদিসের মাধ্যমে নবীজি (সা.) আমাদের এই উপদেশই দিচ্ছেন—ছোট কোনো ভালো কাজকেও ছোট মনে করবে না, অবহেলা করবে না। এমনকি স্বাভাবিক মতবিনিময়কালেও সৌজন্য রক্ষা করার মতো বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবে।
একবার গ্রামাঞ্চল থেকে এক কাফেলা এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা গ্রামের মানুষ। আমাদের কাজে লাগবে এমন কিছু বিষয় আপনি আমাদের শিখিয়ে দিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদেরও এই উপদেশ দিলেন— ‘ভালো কোনো কাজকেই তুচ্ছ মনে করবে না। এমনকি কেউ যদি একটু পানি চায় তাহলে তোমার (পানি ভর্তি) বালতি থেকে তার পাত্রে একটু পানি ঢেলে দেবে, তোমার ভাইয়ের সঙ্গে প্রসন্ন মুখে কথা বলবে।’ এরপর তাদের দুটি কাজ করতে নিষেধ করেছেন। ‘টাখনুর নিচে লুঙ্গি ঝুলিয়ে পরা থেকে বিরত থেকো। এটা অহংকার আর আল্লাহ অহংকার পছন্দ করেন না। আর কেউ যদি তোমার কোনো বিষয় জেনে তোমাকে গালি দেয়, তবু তার কোনো বিষয় তোমার জানা থাকলেও তুমি তাকে গালি দেবে না। এতে পুরস্কৃত হবে তুমি আর অনিষ্ট সব আরোপিত হবে গালিদাতার ওপর।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২০৬৩৩)
রাসুলের হাসিমুখ : রাসুল (সা.) যেমন হাসিমুখে সাক্ষাতের জন্য আমাদের উৎসাহিত করেছেন, তেমনি নিজেও ছিলেন এর এক সার্থক দৃষ্টান্ত। আবদুল্লাহ ইবনে হারেস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, মুচকি হাসিতে নবীজির চেয়ে অগ্রগামী কাউকে আমি দেখিনি। (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ২২৭)
হাসিমুখে কথা বলা পূণ্যের কাজ : নবীজি সবার সঙ্গে এমনভাবে হাসিমুখে কথা বলতেন, সাহাবিরা ভেবে নিতেন রাসুল তাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। আমর ইবনুল আস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সমাজের একেবারে সাধারণ মানুষটির সঙ্গেও নিজে কথা বলতেন, তার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেন। এভাবেই তিনি তাদের হৃদয় জয় করে নিতেন। আমার সঙ্গে যখন কথা বলতেন, তখনো তিনি আমার দিকে ভালোভাবে ফিরে সরাসরি কথা বলতেন। আর এতেই আমার মনে এ ধারণা সৃষ্টি হয়—আমিই হয়তো সবচেয়ে ভালো মানুষ। তখন আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম—ইয়া রাসুলাল্লাহ! কে সেরা? আমি, না আবু বকর? তিনি উত্তরে বলেন, আবু বকর। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আমি এবং উমরের মধ্যে সেরা কে? তিনি বলেন, উমর। এরপর জানতে চাইলাম, সেরা কে? আমি, না উসমান? তিনি বলেন, উসমান। এভাবে যখন আমার একেকটি প্রশ্নে রাসুলুল্লাহ (সা.) যথাযথ উত্তর দিচ্ছিলেন তখন আমি ভাবতে লাগলাম— আমি যদি তাঁকে এই প্রশ্নগুলোই না করতাম! (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৪)
আরেক হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি ভালো কাজই সদকা। আর তুমি তোমার ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাত করবে, তোমার পানির পাত্র থেকে তার পাত্রেও একটু পানি ঢেলে দেবে—এগুলোও ভালো কাজ।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৭০)
বিনয়, নম্রতা ও মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলার আচরণ ছিল রাসুলের মজ্জাগত। রাসুল (সা.) তাঁর এই গুণগুলোর মাধ্যমে জাহিলি যুগের চরম অহংকারী মানুষের হৃদয়ে খুব সহজেই ইসলাম গেঁথে দিয়েছিলেন। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন তিনি।
আজকের সমাজে মানুষে মানুষে যে অহংকার আর অশ্রদ্ধা তা দূর হতে পারে পারস্পরিক সাক্ষাতে হাসিমুখে কথা বলার অনন্য এ সুন্নত চর্চার মাধ্যমে। আল্লাহ আমাদেরকে নবীজির প্রতিটি সুন্নত যথাযথভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন।
সুত্রঃ কালের কণ্ঠ









