জাতীয়

সন্তানের অবহেলার চেয়ে বৃদ্ধাশ্রমে থাকাই ভালো’

নিউজ ডেস্ক১ অক্টোবর ২০২৬৩ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

অভাবের কারণে শামসুল হকের জীবনের পুরো সময়ই কেটেছে দুঃখ-কষ্টে। চিরকাল সুখ জিনিসটি অধরাই রয়ে গেছে ৮৫ বছর বয়সী এই বৃদ্ধের জীবনে।

চার মেয়ে ও এক ছেলের বাবা হওয়া সত্ত্বেও গত ১৫ বছর ধরে তিনি বাস করছেন বৃদ্ধ নিবাসে।
শামসুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের দিকে একমাত্র ছেলে বউয়ের অত্যাচার ও অপমান সহ্য করতে না পেরে ভোলা শহরের নিজাম-হাসিনা ফাউন্ডেশন পরিচালিত বৃদ্ধ নিবাসে আশ্রয় হয় তার। সেখানে আসার পর নিজের নামে থাকা বাড়ির সাড়ে ৩১ শতাংশ জমি লিখে দেন ছেলে-মেয়েদের নামে।

তার দেওয়া জমিতে ছেলে মফিজুর রহমান নতুন ঘর তোলেন।

তবে সেই ঘরে যায়গা হয়নি বৃদ্ধ বাবার। বিশ্ব প্রবীণ দিবস উপলক্ষে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কালের কণ্ঠকে নিজের কষ্টের কথাগুলো জানান ভোলা সদর উপজেলার আলী নগর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. শামসুল হক।
কালের কণ্ঠকে এই বৃদ্ধ বলেন, ‘জীবনের বেশির ভাগ সময়ই কৃষিকাজ করে কেটেছে আমার। চার মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি।

সংসারে অভাবের কারণে সন্তানদের তেমন পড়ালেখা করাতে পারিনি। চার মেয়ের জামাই সবাই দিনমজুর। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল।’
শামসুল হক বলেন, ‘২০০৬ সালে বিয়ে করে বউ ঘরে আনে আমার ছেলে মফিজুর। কিন্তু বয়সের ভারে যখন আমার কাজ বন্ধ হয়ে যায়, তখন থেকেই ছেলে ও ছেলের বউয়ের ব্যবহার পাল্টাতে শুরু করে।

ভোলা সদর হাসপাতালের সামনে মফিজের চা-পানের দোকান, সারাদিন সে দোকানে থাকে।’
শামসুলের অভিযোগ, ছেলে বাড়িতে না থাকায় ছেলের বউ তাকে ঠিকমতো খাবারও দিতেন না। যা দিতেন, তা দিয়ে পেটের খিদে মিটত না। খাবার চাইলে ছেলে বউ তাকে ঝাড়ু নিয়ে মারতে আসতেন। কিন্তু এসব বিষয় জেনেও বউকে কিছু বলতেন না ছেলে মফিজ। এ অবস্থায় ২০১১ সালের দিকে তাদের সঙ্গে রাগ ও অভিমান করে বৃদ্ধাশ্রমে চলে আসেন তিনি। এর পর থেকেই বৃদ্ধাশ্রমই তার ঠিকানা।

নিজের স্ত্রী প্রসঙ্গে শামসুল হক বলেন, ‘বাড়ি থেকে চলে আসার পর আমার স্ত্রী বিলকিস বেগম বেশির ভাগ সময় মেয়েদের কাছেই রয়েছেন। ২০১৭ সালে তিনি মারা যান।’ তিনি বলেন, ‘বৃদ্ধাশ্রমে আসার পর মেয়েরা প্রায়ই বিভিন্ন খাবার নিয়ে দেখতে আসত। কিন্তু ছেলে কোনো কাজ ছাড়া আমাকে দেখতে আসে না।’

বাড়িতে যেতে মন চায় কি না—জানতে চাইলে শামসুল হক বলেন, ‘এখন এখানেই ভালো লাগে। ১৫ বছর ধরে বৃদ্ধাশ্রমে থাকায় এখানে থাকা সবাইকে এখন আপন মনে হয়। এখানকার সবাই আন্তরিক। সময়মতো খাবার-দাবারসহ সব কিছুই এখান থেকে দেয়। তাই আর বাড়ির কথা মনে হয় না।’

শামসুল হক আরো বলেন, বৃদ্ধাশ্রমের আসার পর প্রথম প্রথম বাড়ি ও ছেলে-মেয়েদের কথা খুব মনে পড়ত। কিন্তু এখন আর তেমন মনে পড়ে না। উল্টো বাড়িতে গেলে মন টেকে না। বাকি জীবন বৃদ্ধাশ্রমেই কাটাতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘সন্তানদের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই আমার। তারা ভালো থাকুক—এই কামন করি।’

তবে ওই বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রবীণরা জানান, তারা সমস্যার মুখে পড়ে বাধ্য হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে এসেছেন। তাদেরও ইচ্ছা হয়, বৃদ্ধ বয়সে পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটাতে।