ধর্ম

শবেকদর কেন এত মর্যাদাপূর্ণ

নিউজ ডেস্ক২০ মে ২০২০৪ মিনিট পড়া

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআন বিশ্বমানবতার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে নাজিল করেছেন। আর রাসুল (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় পবিত্র কোরআনের সব বিধি-বিধান বাস্তবে অনুসরণ ও অনুশীলন করেছেন। তাই পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হওয়া সমগ্র মানবজাতির জন্য এক বড় নিয়ামত। কখন বা কবে কোরআন নাজিল হয়েছিল সে বিষয়ে যদিও আমরা অনেকে জানি, তবু কোরআন নাজিল হওয়ার বিষয়ে এখানে কোরআনের কিছু আয়াত উল্লেখ করা হলো—কোরআন নাজিল হওয়ার বিষয়টি আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনেই বর্ণনা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি একে নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়।’ (সুরা : দুখান, আয়াত : ৩-৪)

এ দুটি আয়াত থেকে জানা যায়, কোরআন এক বরকতময় রাতে অবতীর্ণ হয়েছে এবং এ রাতেই প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা হয়। মহান আল্লাহ কোরআনের অন্যত্র বর্ণনা করেছেন, ‘রমজান মাসই হলো সেই মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য বিধানকারী।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৫)

পবিত্র কোরআনের বর্ণনা থেকেই জানা যায়, কোরআন রমজান মাসেই নাজিল হয়েছে।

এখন আমরা একটি আয়াতের অর্থ অনুধাবন করলেই দেখতে পাব যে আল্লাহ সুনির্দিষ্টভাবে কোরআনেই এর নাজিলের সময় সম্পর্কে বলেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি একে নাজিল করেছি শবেকদরে।’ (সুরা : কদর, আয়াত : ১)

অর্থাৎ লাইলাতুল কদরেই পবিত্র কোরআন নাজিল করা হয়েছে। কদরের অর্থ হলো সর্বোত্কৃষ্ট, মহান ও সম্মান। এ জন্য একে ‘মহিমান্বিত’ রাত বলা হয়।

ইতিমধ্যে কোরআন রমজান মাসে এবং তা লাইলাতুল কদরে নাজিল হয়েছে—সে সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানতে পারলাম। এখন আমরা জানার চেষ্টা করব যে লাইলাতুল কদর কবে সংঘটিত হয়েছিল বা এর ফজিলত কী?

মহান আল্লাহ শবেকদরের ফজিলত সম্পর্কে পবিত্র কোরআনেই বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘শবেকদর হলো এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেশতারা ও রুহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। এটা নিরাপত্তা, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।’ (সুরা : কদর, আয়াত : ৩-৫)

সুরা কদর নাজিলের একটা প্রেক্ষাপট আছে। তা হলো, ইবনে আবি হাতেম (রহ.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন বনি ইসরাঈলের একজন মুজাহিদ সম্পর্কে আলোচনা করেন। ওই মুজাহিদ এক হাজার মাস পর্যন্ত অস্ত্র সংবরণ ছাড়া জিহাদে নিয়োজিত থাকত। তাফসিরবিদ ইবনে জারির (রহ.) বর্ণনা করেন, বনি ইসরাঈলের এক ব্যক্তি সারা রাত ইবাদতে মশগুল থাকত এবং সারা দিন জিহাদে নিয়োজিত থাকত। সে এক হাজার মাস এভাবে অতিবাহিত করে। মুসলমানরা তাঁর এ ধরনের ইবাদতের কথা শুনে বিস্মিত হলো। এই পরিপ্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ সুরা কদর নাজিল করেন। আল্লাহ এ রাতের ইবাদতকে শুধু উম্মতে মোহাম্মদির জন্য এক হাজার রাতের ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। যা শুধু উম্মতে মোহাম্মদিরই এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

কোরআন শবেকদরে নাজিল করা হয়েছে—এর অর্থ এই যে লওহে মাহফুজ থেকে সমগ্র কোরআন দুনিয়ার আকাশে এ রাতেই নাজিল করা হয়েছে। অতঃপর রাসুল (সা.)-এর নবুয়তি জীবনের ২৩ বছরে অল্প অল্প করে তা নাজিল করা হয়েছে। এ রাতকে মোবারক বলার কারণ হলো—এ রাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অসংখ্য কল্যাণ ও বরকত নাজিল হয়। এ রাতে প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা আল্লাহ করে থাকেন। এ রাত শুধুই কল্যাণময় ও মঙ্গলময়। এ রাতে ফেরেশতারা আল্লাহর নির্দেশে শান্তি ও কল্যাণ নিয়ে দুনিয়াতে আগমন করেন এবং প্রার্থনারত সব নারী-পুরুষের রহমতের জন্য দোয়া করেন। যা ফজর পর্যন্ত  বলবৎ থাকে। হাদিসে লাইলাতুল কদরের বিষয়ে বর্ণিত আছে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতে লাইলাতুল কদরের সন্ধান করো।’ (বুখারি, হাদিস : ১৮৯০)

মুসলিম শরিফে লাইলাতুল কদরের ফজিলত ও তার অনুসন্ধানের আশাব্যঞ্জক সময় সম্পর্কে বর্ণিত আছে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তার পিতা আবদুল্লাহ (রা.) বলেছেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে লাইলাতুল কদর সম্পর্কে বলতে শুনেছি, তোমাদের কিছু লোককে স্বপ্নে দেখানো হলো যে তা রমজানের প্রথম সাত দিনের মধ্যে, আবার কিছু লোককে স্বপ্নে দেখানো হলো যে তা শেষ সাত দিনের মধ্যে। অতএব, (রমজানের) শেষ দশকের মধ্যে তা অন্বেষণ করো।’ (মুসলিম, হাদিস ২৬৩৫)

শবেকদরেই তাকদিরসংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ের ফয়সালা হয়। যা পরবর্তী শবেকদর পর্যন্ত এক বছরে সংঘটিত হবে। অর্থাৎ এ রাতেই প্রত্যেক মানুষের বয়স, মৃত্যু, রিজিক ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ের ফয়সালা হয়। এর অর্থ এই যে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তাকদিরে আগে নির্ধারিত সব ফয়সালা এ রাতে ফেরেশতাদের কাছে অর্পণ করা হয়। কারণ কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ তাআলা সব ফয়সালা মানুষের সৃষ্টিলগ্নেই লিখে দিয়েছেন। এ রাতে ফেরেশতাদের মাধ্যমে যাবতীয় বিধান প্রয়োগ করা হয়।

লেখক : উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস্), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা।

 

সুত্রঃ কালের কণ্ঠ