শিক্ষা

রাবিতে ডিজিটাল উপস্থিতি ব্যবস্থায় শিক্ষকদের বাধা : বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা

নিউজ ডেস্ক২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬৫ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ডিজিটাল’  উপস্থিতি ব্যবস্থা আগামী ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি বিভাগ ও দফতরে ‘ডিজিটাল অ্যাটেনডেন্স মনিটরিং ডিভাইস’ বসানো হয়েছে। প্রতিদিন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ডিভাইসে নিজেদের স্মার্ট কার্ড পাঞ্চ করতে হবে। এতে তার সকল তথ্য বিশ্ববিদ্যালয় সার্ভারে জমা হবে। কিন্তু এ পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি তুলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ। এতে এ পদ্ধতি বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ডিজিটাল অ্যাটেনডেন্স মনিটরিং সিস্টেমে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি প্রদান করতে হবে জানিয়ে গত ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মুহাম্মদ এন্তাজুল হক স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, আগামী ১ অক্টোবর থেকে তা কার্যকর করা হবে। ৪৬৭ তম সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু শিক্ষকরা উপস্থিত না হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে সম্পর্কে কোনও ধারণা দেওয়া হয়নি ওই বিজ্ঞপ্তিতে।

এ সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়ে মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি করে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের আহ্বায়ক অধ্যাপক রকীব আহমদের নেতৃত্বে একটি একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।

  • সেখানে তারা উল্লেখ করেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশ পরিপন্থি রেজিস্ট্রার মহোদয়ের বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাখ্যান করছে এবং শিক্ষকদের অ্যাটেনডেন্স চালু করার এহেন উদ্যোগের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে।’ অথচ অধ্যাপক রকীব আহমদ-ই ২০১১ সালে শুরু হওয়া স্মাট আইডি কার্ড প্রকল্পের সাব-প্রজেক্ট ম্যানেজার ছিলেন।

এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সভা করেন প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ। সভায় উপস্থিত থাকা এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওই সভায় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের ৬৭২ জন সদস্যের মধ্যে প্রায় ৯০ জন শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। সেখানে কয়েকজন শিক্ষক এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। আর সভায় ওই কয়েকজন শিক্ষকের অনুসারী ছিলেন প্রায় ৫০ জন। ওই সভাতেই উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের বিরোধিতা করে পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

এদিকে একই দাবিতে মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিনের সাথে দেখা করেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক শহীদুল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শাহ আজম। তারাও এ পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি বাতিলের দাবি জানিয়েছে। অন্যথায় তারা ১ অক্টোবর বেলা ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত এক ঘণ্টার কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দেন।

’৭৩-এর অধ্যাদেশের প্রসঙ্গ টেনে আপত্তিকারী শিক্ষকদের অভিযোগ, এই পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষকদের স্বাধীনতা খর্ব করে নিয়ন্ত্রণারোপ করা হবে। এভাবে শৃঙ্খলিত করা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও মুক্তচিন্তার পরিপন্থি। তাদের মতে, জ্ঞান বিতরণের কোনও সময় নেই, সেটা সকাল, বিকেল, রাত যে কোনও সময় হতে পারে। ‘৭৩-এর অধ্যাদেশ অনুযায়ী আমরা শুধু বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকবো। কিন্তু এ ডিজিটাল উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে আমাদের সে স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিটি বিভাগ ও দপ্তরে একটি করে ডিভাইস বসানো হবে। ডিভাইসের সামনের দিকে ক্যামেরা লাগানো থাকবে। প্রতিদিন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ডিভাইসে নিজেদের স্মার্ট কার্ড পাঞ্চ করবে। এতে তার সকল তথ্য বিশ্ববিদ্যালয় সার্ভারে জমা হবে। একই সঙ্গে কার্ডে লাগানো ক্যামেরার মাধ্যমে কার্ড হোল্ডারের স্থিরচিত্রও সার্ভারে পোঁছে যাবে। ফলে এক জনের কার্ড অন্যজনকে দিয়ে পাঞ্চ করানোর সুযোগও থাকবে না। এক ব্যক্তি একাধিক কার্ড ব্যবহার করলেও সেই তথ্য সার্ভারে ধরা পড়বে।

  • এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিত কর্মক্ষেত্রে আসেন না। অনেক শিক্ষক নিয়মিত ক্লাশ নেন না, বিশেষ করে সিনিয়র শিক্ষকরা। এছাড়া ছুটি ছাড়াই কর্মক্ষেত্রেও বাইরে অবস্থান করে অনেকে। এতে অ্যাকাডেমিক পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে এবং সেশন জট বাড়াছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে উপস্থিতিতে স্বচ্ছতা আনতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের আহ্বায়ক অধ্যাপক রকীব আহমদ  বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের শিক্ষকরা এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করায় উপাচার্যের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।’ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করলে আপনারা কোনও কর্মসূচি দিবেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা শিক্ষক সমিতির অংশ। তাই শিক্ষক সমিতি যে কর্মসূচি দিবে তাতেই আমরা আছি।’ তাহলে আপনার আলাদাভাবে লিখিত অভিযোগ দিলেন কেনÑএমন প্রশ্ন করলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শাহ্ আজম বলেন, ‘৭৩-এর অধ্যাদেশ অনুযয়ী শিক্ষকদের অ্যাকাডেমিক ফ্রিডমের (স্বাধীনতা) প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাদানের কোনও টাইম মেইন্টেইন নেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা, কখোনও মধ্য রাতেও শিক্ষকরা যুক্ত থাকবেন গবেষণার সঙ্গে, সৃজনশীল কাজের সঙ্গে, নতুন জ্ঞান সৃজন করবেন এবং বিতরণ করবেন। সেই সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে শিক্ষকদের ডিজিটাল অ্যাটেনডেন্সের মধ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এ সিদ্ধান্ত সেই সংস্কৃতির ও শিক্ষকদের মর্যাদার প্রতি আঘাত। সেক্ষেত্রে আমরা উপচার্যকে বিষয়টি নিয়ে ভিন্নভাবে ভাবতে এবং প্রত্যাহার করতে বলেছি।’ এছাড়া আগামী ১ অক্টোবরের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করলে ওই দিন এক ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মিজানউদ্দিন সিল্কসিটি নিউজকে বলেন, ‘সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রকল্পের অংশ হিসেবে সরকারি অর্থয়ানে ডিজিটাল উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষকরা এতে আপত্তি জানিয়েছে। আমি তাদের সময় দিতে চেয়েছি। যেকোনো প্রযুক্তি প্রথমে চালু হলে সবাই এটা নিয়ে সন্দেহ পোষণ ও শঙ্কায় থাকেন। বিষয়টি বুঝতে পারলে ধীরে ধীরে সবাই অভ্যস্ত হয়ে যায়।

তিনি আরো বলেন, কাউকে শৃঙ্খলিত করা, হয়রানি করার জন্যে এ পদ্ধতি করা হচ্ছে না। এটি আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে, দক্ষতা বৃদ্ধি করবে, সেবার মান বৃদ্ধি করবে। আমরা দ্রুত সব করতে পারবো-এর জন্যেই তো ডিজিটালাইজেশন করা। সেই সাথে সাথে কিছুটা জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

শিক্ষকদের বিরোধীতার পরও এই পদ্ধতি চালু করা সম্ভব হবে কিনা-এই প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, শিক্ষকরা না চাইলে এটা চালু করা সম্ভব হবে না। আমাদের পিছিয়ে আসতে হবে। কারণ শিক্ষকদের সহযোগিতা ছাড়া এ পদ্ধতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

স/মি