সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
মেঘনা নদীর মোহনায় ২৪ হাজার ৭০০ একর (১০ হাজার হেক্টর) ভূমি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এজন্য ৭৮২ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
প্রকল্পের মাধ্যমে নোয়াখালী জেলার উড়িরচরের মধ্যে ক্রসবাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে এ ভূমি উদ্ধার করা হবে। পরবর্তীতে সেখানে বসতি স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে স্থানীয় হতদরিদ্র জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া কৃষি জমির পরিমাণ বৃদ্ধি, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রকল্পটি বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।
প্রস্তাবিত এ প্রকল্পটি নিয়ে বৃহস্পতিবার পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগে এ্যাপ্রেইজাল সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে প্রকল্পটির বেশি ব্যয়ে যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। সভায় ক্রসড্যামের ফলে নতুন পুনরুদ্ধার হওয়া জমি ব্যবহারে একটি পরিকল্পনা (যেমন মানব বসতি, কৃষি মৎস্য, অবকাঠামো ও বনায়নের এরিয়া প্লান এবং ভূমি বণ্টন নীতিমালা) প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছে। সেই সঙ্গে প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বণ্টন নীতিমালার কথা বলা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর অনুমোদন প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে এ্যাপ্রেইজাল সভা করা হয়েছে। সভায় দেয়া সুপারিশগুলো প্রতিপালন করা হলে পরবর্তীতে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হবে। তারপরই যাবে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে। অনুমোদন পেলে ২০২১ সালের জুনের মধ্যে নোয়াখালী জেলার কোম্পানিগঞ্জ ও সুবর্ণচর উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড।
প্রকল্প প্রস্তাবে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। নতুন জেগে ওঠা ভূমি অর্থনৈতিক অগ্রগতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। মেঘনা নদীর মোহনায় নদী ভাঙন ও ভূমি পুনরুদ্ধার একটি চলমান প্রাকৃতিক ব্যাপার।
লোয়ার মেঘনা নদীর মাধ্যমে প্রতিবছর ১ দশমিক ১০ বিলিয়ন টন পলি বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়, যা প্রাকৃতিকভাবে মেঘনা নদীর মোহনায় নতুন চর জেগে উঠতে ব্যাপকভাবে অবদান রাখে। ১৯৫৬-৫৭ এবং ১৯৬৪ সালে মেঘনার মোহনায় ক্রসড্যাম-১ ও ২ নামে দুটি সফল ক্রসড্যাম নির্মাণ করা হয়।
ভূমি পুনরুদ্ধারের গুরুত্ব অনুধাবন করে মেঘনার মোহনায় ‘ভূমি পুনরুদ্ধার প্রকল্প (এলআরপি)’, মেঘনার মোহনা নীরিক্ষা (এমইএস)’ এবং মোহনা উন্নয়ন প্রকল্পসহ (ইডিপি) বহু সমীক্ষা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে ভূমি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে এলআরপি ও এমইএস সমীক্ষা প্রতিবেদনের আলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাংলাদেশের ১৯টি লোকেশনে ক্রসড্যাম নির্মাণের তালিকা প্রণয়ন করা হয়।
মোহনা উন্নয়ন প্রকল্প সমীক্ষায় সদ্বীপ-উড়িরচর-নোয়াখালী এলাকায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রসড্যাম নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। এ তিনটি ক্রসড্যামের মধ্যে উড়িরচরের সঙ্গে নোয়াখালীর মূল ভূ-খণ্ডের সংযোগকারী উড়িরচর-নোয়াখালী ক্রসড্যাম নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় নেদারল্যান্ডসভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রয়েল হ্যাসকোনিং ডিএইচভি ২০১৪ সালে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি হাতে নেয়া হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম হল- ২ কিলোমিটার ক্রসড্যাম নির্মাণ এবং ৬ কিলোমিটার টাইবাঁধ নির্মাণ করা হবে।
সূত্র জানায়, এ্যাপ্রেইজাল সভায় জানানো হয় প্রকল্পটির জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২০১৪ সালে সমীক্ষা সম্পাদন করা হয়। বিশ্বব্যাংক প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন গ্রহণ করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ফান্ড অনুমোদন করেনি বলে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) উল্লেখ করা হয়েছে। সভায় এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য জানতে চাওয়া হয়।
এছাড়া প্রকল্প ব্যয়ের যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। এক্ষেত্রে বলা হয়, সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৩৬৭ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্প প্রস্তাবে এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৮২ কোটি ২১ লাখ টাকা। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনের প্রাক্কলনের চেয়ে প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় ৪১৫ কোটি ২১ লাখ টাকা অর্থাৎ দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধির যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।
এছাড়া ক্রসড্যাম নির্মাণে ৯ দশমিক শূন্য ৬ লাখ ঘনমিটার মাটির কাজ বাবদ ৩৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা অর্থাৎ প্রতি ঘনমিটার মাটির কাজ বাবদ ৪৩৮ দশমিক ২২ টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। টাইবাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রেও একই ব্যয় ধরা হয়েছে। টাইবাঁধ নির্মাণে লিড ও কম্পেকশসহ ম্যানুয়েল লেবার দিয়ে প্রতি ঘনমিটার মাটির কাজ বাবদ ৩০২ দশমিক ৫৩ টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। এসব ব্যয়ের প্রাক্কলন অন্যান্য প্রকল্পের মাটির কাজের চেয়ে বেশি বলে প্রতীয়মান হয়েছে, যা যুক্তিযুক্ত করা যায় বলে সভায় তাগিদ দেয়া হয়েছে।









