সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
মানুষের অন্তরের সবচেয়ে গভীর প্রশ্নগুলোর একটি হলো, মৃত্যুর পর আবার জীবন কি সত্যিই সম্ভব? চোখে দেখা বাস্তবতার বাইরে গিয়ে পুনরুত্থানের ধারণা অনেকের কাছেই জটিল মনে হয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দা ও নবীদের মাধ্যমে এমন নিদর্শন দেখিয়েছেন, যা শুধুই ঈমান দৃঢ়ই করে না, বরং হৃদয়কে পরিপূর্ণ প্রশান্তিও দান করে। তেমনই একটি ঘটনা হলো ইবরাহিম (আ.)-এর সেই প্রশ্ন ও আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত চারটি পাখির মাধ্যমে জীবিত করার নিদর্শন, যা কোরআনে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে।
ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে আবদার করলেন, আপনি কিভাবে মৃতকে পুনর্জীবিত করবেন, তা আমাকে দেখান।

আল্লাহ জিজ্ঞাসা করলেন, এমন আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করার কারণ কি? আমার সর্বসময় ক্ষমতার প্রতি কি তোমার আস্থা নেই ? ইবরাহিম (আ.) বললেন, আস্থা-বিশ্বাস তো অবশ্যই আছে। কেননা, আপনার সর্বময় ক্ষমতার নিদর্শন সর্বদা, প্রতি মুহূর্তেই দেখতে পাচ্ছি এবং চিন্তাশীল ব্যক্তিমাত্রই তার নিজের সত্তা থেকে শুরু করে এ বিশ্ব-জাহানের প্রতিটি অণু-পরমাণুতে এর প্রমাণ দেখতে পায়। কিন্তু মানব-প্রকৃতির সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে যে, অন্তরের বিশ্বাস যতই দৃঢ় হোক, চোখে না দেখা পর্যন্ত অন্তরে পূর্ণ প্রশান্তি আসতে চায় না, প্রশ্নের পর প্রশ্ন জাগতে থাকে, এটা কি করে হবে, না জানি এর প্রক্রিয়াটা কেমন? তাই ইবরাহিম (আ.) আবদার করেই বসলেন, যাতে নানা প্রশ্নের জাল অন্তরে বাসা বাঁধতে না পারে এবং মনের দৃঢ়তাও যাতে বজায় থাকে। (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন)
আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রার্থনা কবুল করলেন এবং বিষয়টি প্রত্যক্ষ করানোর জন্য এক অভিনব ব্যবস্থা করলেন, যাতে মুশরিকদের যাবতীয় সন্দেহ-সংশয়ও দূর হয়ে যায়।
প্রক্রিয়াটি ছিল এই যে, ইবরাহীমকে চারটি পাখি ধরে নিজের কাছে রেখে সেগুলোকে এমনভাবে লালন-পালন করতে নির্দেশ দেওয়া হলো, যাতে সেগুলো সম্পূর্ণরূপে পোষ মেনে যায় এবং ডাকামাত্র হাতের কাছে চলে আসে। তিনিও যেন সেগুলোকে ভালভাবে চিনতে পারেন। নির্দেশ দেয়া হলো, পাখিগুলোকে জবাই করে এর হাড়-মাংস, পাখা ইত্যাদি সবগুলোকেই কিমায় পরিণত কর, তারপর সেগুলোকে ভাল করে মিশিয়ে নিয়ে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে নিজে পছন্দমত কয়েকটি পাহাড়ে এক একটি ভাগ রেখে দাও। তারপর এদের ডাক।
তখন এগুলি আল্লাহর কুদরতে জীবিত হয়ে দৌড়ে এসে তোমার কাছে পড়বে। কোরআনের ভাষায়, (সেই সময়ের কথা স্বরণ করো) যখন ইবরাহিম বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! আপনি মৃতকে কিভাবে জীবিত করবেন আমাকে তা দেখান। আল্লাহ বললেন, তুমি কি বিশ্বাস করছ না? তিনি বললেন, বিশ্বাস কেন করব না? কিন্তু (এ আগ্রহ প্রকাশ করছি এজন্য যে,) যাতে আমার অন্তর পরিপূর্ণ প্রশান্তি লাভ করে। আল্লাহ বললেন, আচ্ছা, চারটি পাখি ধর এবং সেগুলোকে তোমার পোষ মানিয়ে নাও। তারপর (সেগুলোকে জবাই করে) তার একেক অংশ একেক পাহাড়ে রেখে দাও।
তাদের ডাক দাও। সবগুলো তোমার কাছে ছুটে চলে আসবে। আর জেনে রেখ, আল্লাহ তাআলা মহাক্ষমতাবান, প্রজ্ঞাময়। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬০)
ইবরাহিম (আ.) তাই করলেন। তারপর এদের যখন ডাকলেন, সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের সাথে হাড়, পাখার সাথে পাখা, মাংসের সাথে মাংস ও রক্তের সাথে রক্ত মিলে পাখিগুলো পূর্বের রূপ ধারণ করে এবং তাঁর কাছে দৌড়ে এসে উপস্থিত হয়। (তফসিরে রুহুল মাআনি)
এ ঘটনাতে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের পরে পুনর্জীবনের এমন এক নিদর্শন ইবরাহিম (আ.)-কে দেখান, যাতে মুশরিকদের যাবতীয় সন্দেহ-সংশয়েরও অবসান হয়ে যায়। কারণ পুনর্জীবন এবং পরকালীন জীবন সম্পর্কে মুশরিকদের এটাই ছিল বড় প্রশ্ন। মানুষ মৃত্যুর পর মাটিতে মিশে যায়, আর এ মাটি বাতাসের সাথে কোথায় কোথায় উড়ে যায় ! আবার কখনো পানির স্রোতের সাথে গলে যায়। এতকিছুর পরও একত্র করে তাতে প্রাণ সঞ্চার করার বিষয়টি সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন লোকদের বোধগম্য হওয়ার কথা নয়। কেননা মানুষ সব বিষয়কেই তারা নিজের সীমাবদ্ধ জ্ঞানে ওজন করতে চায়। তাই তারা তাদের বোধশক্তির বাইরের কোন ক্ষমতা সম্পর্কে চিন্তাও করতে পারে না। (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন, তাফসিরে তাওজিহুল কোরআন)
এই ঘটনা কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনা নয়, বরং এটি ঈমানের এক জীবন্ত নিদর্শন। এই ঘটনা আমাদের শেখায়, যে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করতে পারেন, তাঁর কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। আজও যদি কোনো হৃদয়ে পুনরুত্থান বা আখিরাত নিয়ে সন্দেহ জন্ম নেয়, তাহলে এই আয়াতই উত্তর হিসাবে যথেষ্ট। আল্লাহ চাইলে ছিন্নভিন্ন দেহও আবার জীবিত হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং, আমাদের উচিত এই ঘটনাটি থেকে শিক্ষা নিয়ে ঈমানকে আরও দৃঢ় করা এবং আখিরাতের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা।









