সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
মানুষের জীবনে কিছু বিষয় আছে, যা কেবল প্রয়োজন নয়, বরং অস্তিত্বের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। ভাষা তেমনই একটি বাস্তবতা। মানুষ চিন্তা করে ভাষায়, অনুভব প্রকাশ করে ভাষায়, জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষা বিস্তার করে ভাষার মাধ্যমেই। একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও চেতনা সংরক্ষণের প্রধান বাহনও ভাষা।
তাই ভাষা কেবল যোগাযোগের উপকরণ নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, আবেগ ও সভ্যতার ধারক।
ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, সংস্কৃতি ও মানবিক অনুভূতির প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন করেছে। যেমন ইসলাম মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাকে ঈমানি দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করেছে, তেমনি মানুষের স্বাভাবিক ভাষাগত পরিচয় ও মাতৃভাষার গুরুত্বকেও স্বীকৃতি দিয়েছে। মাতৃভাষা মানুষের হৃদয়ের ভাষা।

এই ভাষার মাধ্যমেই সে তার অন্তরের কথা সবচেয়ে স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে পারে। তাই মাতৃভাষা মহান আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত।
মহান আল্লাহ সব নবী-রাসূলকে তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছেন, যাতে তারা নিজ জাতির কাছে দ্বীনের বাণী স্পষ্টভাবে পৌঁছে দিতে পারেন। এ বিষয়ে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “আমি প্রত্যেক রাসূলকে তার স্বজাতির ভাষায় প্রেরণ করেছি, যাতে সে তাদের কাছে বিষয়টি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে পারে।
” (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের কাছে সত্য ও কল্যাণের বার্তা পৌঁছানোর জন্য তাদের ভাষাই সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। এখান থেকে দাওয়াত ও জ্ঞান প্রচারের ক্ষেত্রে মাতৃভাষায় দক্ষতা অর্জনের গুরুত্বও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, “আপনি আপনার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা ও উত্তম ভাষণের মাধ্যমে।” (সুরা নাহল, আয়াত : ১২৫)
এই নির্দেশনা আমাদের শেখায়, মানুষের হৃদয়ে প্রভাব সৃষ্টি করতে হলে ভাষা হতে হবে শুদ্ধ, প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী। তাই মাতৃভাষার বিশুদ্ধ চর্চা ও যথাযথ ব্যবহার ইসলামী দৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ।
মহানবী মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও বিশুদ্ধ ভাষার অধিকারী। তাঁর সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবহ বাণী আরবি ভাষাকে অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী ও বক্তব্যে ভাষার সৌন্দর্য, স্পষ্টতা ও প্রভাবশক্তির এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়, যা আজও ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক আদর্শ হিসেবে বিবেচিত।
মূসা (আ.)-এর ঘটনাও ভাষার গুরুত্বকে স্পষ্ট করে। ফেরাউনের কাছে দাওয়াত দেওয়ার দায়িত্ব পেয়ে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, তাঁর ভাই হারুন (আ.) যেন তাঁর সহযোগী হন; কারণ তিনি অধিক স্পষ্ট ও সাবলীলভাবে কথা বলতে পারতেন। কোরআনে এসেছে, ‘আমার ভাই হারুন আমার চেয়ে বেশি স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারে; সুতরাং তাকে আমার সহকারী হিসেবে প্রেরণ করুন।’ (সুরা ক্বাসাস, আয়াত : ৩৪)
এ থেকে বোঝা যায়, সত্য বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছাতে ভাষার স্বচ্ছতা ও সাবলীলতা কতটা প্রয়োজনীয়।
ভাষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বৈচিত্র্য। আল্লাহ তাআলা ভাষার ভিন্নতাকেও তাঁর সৃষ্টির একটি নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা রূম, আয়াত : ২২)
এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, আমাদের মাতৃভাষা বাংলাও আল্লাহর একটি নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত। তাই এ ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও এর যথাযথ চর্চা করা আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনেরই অংশ।
বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার ইতিহাস আমাদের জাতীয় জীবনের এক গৌরবময় অধ্যায়। একসময় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে বাংলাভাষী মানুষ তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বরকত, সালাম, রফিক, জব্বারসহ অসংখ্য ছাত্র-জনতা জীবন উৎসর্গ করেন। মাতৃভাষার জন্য এভাবে রক্তদানের ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।
এই আত্মত্যাগের ফলেই বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ভাষা আন্দোলনের চেতনা পরবর্তীতে জাতির স্বাধীনতার প্রেরণাও জুগিয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, ভাষা আন্দোলনের বহু বছর পরও মাতৃভাষার প্রতি আমাদের সচেতনতা ও দায়বোধ সব ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রতিফলিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিদেশি ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। নবপ্রজন্মের একটি অংশের মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি সেই আবেগ ও অনুরাগ কমে যাচ্ছে। বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতিকে অনেক সময় আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই প্রবণতা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। মাতৃভাষার প্রতি উদাসীনতা কি ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগকে অস্বীকার করার শামিল নয়?
তাই ভাষা আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—মাতৃভাষার শুদ্ধ ব্যবহার, চর্চা ও প্রসারে সচেষ্ট হওয়া। বিদেশি ভাষা শেখা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু নিজের ভাষাকে অবহেলা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের শিক্ষা, চিন্তা, গবেষণা ও সংস্কৃতির চর্চায় বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করে তোলাই সময়ের দাবি।
আসুন, এই মহান নিয়ামতের জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের জন্য দোয়া করি এবং নিজেদের জীবনে বাংলা ভাষার শুদ্ধ, প্রাঞ্জল ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই। তবেই ভাষার প্রতি ভালোবাসা হবে অর্থবহ, আর ভাষা আন্দোলনের চেতনা থাকবে জীবন্ত।









