অর্থ ও বাণিজ্য

মহামারিতে ব্যাংক পরিচালকদের খরচ কমেছে, আছে ভিন্ন চিত্রও

নিউজ ডেস্ক৩ নভেম্বর ২০২০৬ মিনিট পড়া

মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপ ঠেকাতে চলতি বছরের ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত টানা ৬৬ দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। জনজীবন ও অর্থনীতিতে নেমে আসে স্থবিরতা। স্বাভাবিকভাবেই এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে প্রায় সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সাধারণ ছুটির মধ্যে সীমিত আকারে ব্যাংক খোলা থাকলেও করোনার ছোবল থেকে রক্ষা পায়নি বেশিরভাগ ব্যাংক। খরচ কমাতে অনেক ব্যাংকের কর্মীদের বেতন কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। কয়েকটি ব্যাংক তা বাস্তবায়নও করে। ১০ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) পেছনের খরচ ও কমিয়ে আনা হয়। তবে করোনার তিন মাসে ১৬ ব্যাংকের এমডির পেছনে ব্যয় হয় সাত কোটি ৫৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকা।

মহামারির মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংকের খরচ কমানোর উদ্যোগ নেয়ার মধ্যে চলতি বছরের এপ্রিল-জুন এই তিন মাসে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ ব্যাংকের পরিচালকদের পেছনে খরচ কমেছে।

ওই তিন মাসে তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটির পরিচালকদের পেছনে খরচ বেড়েছে। বিপরীতে ২৪টির খরচ কমেছে। আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের তথ্য পাওয়া যায়নি। সবমিলিয়ে পরিচালকদের পেছনে এপ্রিল-জুন সময়ে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর খরচ কমেছে দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার টাকা।

খরচ কমলেও মহামারির মধ্যে পরিচালকদের পেছনে কিছু ব্যাংকের খরচের চিত্র সন্দেহজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ব্যাংকের পরিচালকরা কত সম্মানী পাবেন তা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। সুতরাং যে ব্যাংকগুলো পরিচালকদের পেছনে অতিরিক্ত বা সন্দেহজনক খরচ করছেন তা খতিয়ে দেখা উচিত। তারা কোন খাতে এবং কীভাবে পরিচালকদের পেছনে টাকা ব্যয় করছেন তা বের করতে হবে। সেক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে পরিচালকদের পেছনে বেশিরভাগ ব্যাংকের খরচ কমলেও ন্যাশনাল ব্যাংকের খরচ মোটা অঙ্কে বেড়েছে। মহামারির মধ্যে ব্যাংকটি পরিচালকদের পেছনে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ব্যাংকটি থেকে পরিচালকরা সম্মানী হিসেবে নিয়েছেন ১৮ লাখ ১৬ হাজার ৭৮৮ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৩ লাখ ৫১ হাজার ৯৮২ টাকা। এ হিসাবে আগের বছরের তুলনায় ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালকরা বেশি নিয়েছেন চার লাখ ৬৪ হাজার ৮০৬ টাকা।

jagonews24

মহামারির মধ্যে পরিচালকদের পেছনে খরচ বাড়া অন্য চার ব্যাংক হলো- সিটি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। এর মধ্যে সিটি ব্যাংকের পরিচালকরা চলতি বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে ব্যাংক থেকে নিয়েছেন ৯ লাখ ৯১ হাজার ৯১০ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৫৭৬ টাকা। অর্থাৎ পরিচালকদের পেছনে ব্যাংকটির খরচ বেড়েছে চার হাজার ৩৩৪ টাকা।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালকদের পেছনে খরচ বেড়েছে ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে ব্যাংকটি থেকে পরিচালকরা নিয়েছেন সাত লাখ ২৯ হাজার ৮০০ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ছয় লাখ ৭১ হাজার ১০০ টাকা।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালকরা নিয়েছেন তিন লাখ ২৮ হাজার টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল দুই লাখ ৬৪ হাজার টাকা। এ হিসাবে ব্যাংকটি থেকে পরিচালকরা চলতি বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে ৬৪ হাজার টাকা বেশি নিয়েছেন।

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পরিচালকদের পেছনে খরচ বেড়েছে ২১ হাজার ৬০ টাকা। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে ব্যাংকটির পরিচালকরা নিয়েছেন ২৬ হাজার টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল চার হাজার ৯৪০ টাকা।

এদিকে মহামারির মধ্যে পরিচালকদের পেছনে সবচেয়ে বেশি খরচ কমেছে ইসলামী ব্যাংকের। গত বছরের তুলনায় পরিচালকদের পেছনে ব্যাংকটির খরচ কমেছে ৩২ লাখ ২৮ হাজার ৯৪৯ টাকা। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে পরিচালকরা ব্যাংকটি থেকে নিয়েছেন চার লাখ আট হাজার ১২১ টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার ৭০ টাকা।

২৯ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৭ টাকা খরচ কমিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে পরিচালকরা ব্যাংকটি থেকে নিয়েছেন এক লাখ ৭৩ হাজার ৭৪২ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩১ লাখ আট হাজার ১৩৯ টাকা।

jagonews24

তৃতীয় স্থানে থাকা আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের খরচ কমেছে ২০ লাখ ৫১ হাজার ৫৭২ টাকা। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে পরিচালকরা ব্যাংকটি থেকে নিয়েছেন ছয় লাখ ৬৫ হাজার ৬১৬ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৭ লাখ ১৭ হাজার ১৮৮ টাকা।

পরিচালকদের পেছনে বেশিরভাগ ব্যাংকের খরচ কমার বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি ও ইবিএল’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আলী রেজা ইফতেখার  বলেন, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন সময়টা স্বাভাবিক সময়ের মতো ছিল না। এ সময়ে অডিট কমিটির মিটিং, বোর্ড মিটিং কম হয়েছে। বোর্ড মিটিং কম হলে খরচ অবশ্যই কমবে।

এবিবি’র সাবেক সভাপতি আনিস এ খান  বলেন, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে পরিচালকদের পেছনে ব্যাংকের খরচ কমেছে, এটা আমার কাছে পজিটিভও না, নেগেটিভও না। পরিচালকরা মিটিংয়ে অংশ নিলে তাদের ৭ হাজার ২০০ টাকা দেয়া হয়, এটা বড় কোনো বিষয় নয়। করোনার কারণে এপ্রিল-জুন সময়ে বোর্ড মিটিং, অডিট কমিটির মিটিং, রিক্স ম্যানেজমেন্ট কমিটির মিটিং অনেক কম হয়েছে। এসব কারণে ব্যয় কমেছে। অন্য কোনো কারণে নয়।

পরিচালকদের পেছনে এক ব্যাংকের খরচের সঙ্গে অন্য ব্যাংকের খরচের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কিছু ব্যাংকের পরিচালক আছেন ২০ জন। আবার কারও পরিচালক আছেন ১৩ জন। আবার কেউ মাসে একটা বোর্ড মিটিং করেন, কেউ দুটি। সুতরাং পরিচালক ও বোর্ড মিটিংয়ের ওপর নির্ভর করে কিছু ব্যাংকের ডাবল (দ্বিগুণ) খরচ হতে পারে। তবে মিটিংয়ের বাইরে পরিচালকদের পেছনে ব্যাংকগুলোর খরচ যে বেশি মনে হচ্ছে, সেগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। কোথায় তারা খরচ করছেন, তা দেখতে হবে।

তিনি এ সময় একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘ধরেন, একটি ব্যাংক মাসে দুটি বোর্ড মিটিং করল। ব্যাংকটির পরিচালক আছেন ২০ জন। তাহলে বোর্ড মিটিংবাবদ খরচ হওয়ার কথা দুই লাখ ৮৮ হাজার টাকার মতো। এর সঙ্গে রিক্স কমিটির মিটিং এবং অডিট কমিটির মিটিং ধরেন আরও চারটি। এসব মিটিংয়ে সবাই অংশগ্রহণ করেন না, পাঁচ-ছয়জন থাকেন। তাহলে ছয়জনের চারটি মিটিংয়ের জন্য খরচ হওয়ার কথা এক লাখ ৭২ হাজার টাকার মতো। সুতরাং মাসে পরিচালকদের সম্মানীবাবদ পাঁচ লাখ টাকার ওপর খরচ হওয়ার কথা নয়। সেখানে কেউ ১৮ লাখ টাকা খরচ করলে তা খতিয়ে দেখা উচিত, কোথায় তারা খরচ করছে।

অন্য ব্যাংক থেকে পরিচালকদের টাকা নেয়ার চিত্র

ব্যাংকের নামপরিচালকরা টাকা নিয়েছেনটাকা নেয়ার পরিমাণ কমেছে
২০২০(এপ্রিল-জুন)২০১৯(এপ্রিল-জুন)
এবি ব্যাংক২,৯১,৭৩৪৭,৪২,৫৬৯৪,৫০,৮৩৫
ব্যাংক এশিয়া৩,৭৮,০০০১৩,৭৬,৮০০৯,৯৮,৮০০
ব্র্যাক ব্যাংক১২,৩৭,৫৯০১৭,৮৭,৭৮১৫,৫০,১৯১
ঢাকা ব্যাংক৭,৬৫,৩৯৯১৩,৭১,৮০০৬,০৬,৪০১
ইস্টার্ন ব্যাংক৫,৭৬,৪০৫১২,৭৯,১৭৯৭,০২,৭৭৪
এক্সিম ব্যাংক৬,৪৩,২০০৮,৬১,১৯৯২,১৭,৯৯৯
আইএফআইসি২,৭১,০০০৫,৬৫,৫০০২,৯৪,৫০০
যমুনা ব্যাংক৬,৩৯,৮৭০১৭,২৬,৪১৪১০,৮৬,৫৪৪
মার্কেন্টাইল ব্যাংক৭,১৯,৭৩৩১৪,১৪,৪০০৬,৯৪,৬৬৭
মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক১,৮৪,৯৪৯৮,২৪,৫০০৬,৩৯,৫৫১
এনসিসি ব্যাংক৬,৮৮,৫৯৯১৭,৬৫,৬৫০১০,৭৭,০৫১
ওয়ান ব্যাংক১,৫৮,০০০৪,৯৫,০০০৩,৩৭,০০০
প্রাইম ব্যাংক৯,৮০,৬৬৭১১,৩৯,৯৬৩১,৫৯,২৯৬
পূবালী ব্যাংক৮,০৫,৪৪৮১৬,১০,২১৮৮,০৪,৭৭০
রূপালী ব্যাংক৩,৮৬,২০০১১,২২,৪০০৭,৩৬,২০০
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক৯,০০,০০০২৩,৬৭,০৩৬১৪,৬৭,০৩৬
সাইথইস্ট ব্যাংক৭৪,৭৬৫৯,৫৩,৫১৭৮,৭৮,৭৫২
স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক১৩,০২,৫৬৮১৮,৫৫,১৪৫৫,৫২,৫৭৭
ট্রাস্ট ব্যাংক৪,২৪,০০০৮,৬৭,০০০৪,৪৩,০০০
ইউসিবি৫,৫৭,৪৭১৫,৭৩,০০০১৫,৫২৯
উত্তরা ব্যাংক২,৭৬,০০০১০,৩২,০০০৭,৫৬,০০০

 

সূত্রঃ জাগো নিউজ