সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
‘কোরআন’ শব্দটি শুনলেই কেন জানি শ্রদ্ধা, নমনীয়তা আর নীরবতা মনে ভর করে। অস্বাভাবিক ধর্মীয়, ধর্মীয় ভাব নিয়ে নিজেকে সংবরণ করার মিথ্যা অভিনয় করি আমরা। কিন্তু পরোক্ষভাবে আমাদের নীতি হয়ে দাঁড়ায়, ভ্যাংচানো নীতিই! উনি কোরআন নিয়ে কথা বলতে এসেছেন!
আমরা কেন জানি, এ গ্রন্থটিকে পরিপূর্ণ ভালোবাসা দিয়ে গ্রহণ করতে পারছি না শুধু বিশ্বাস করে বসে আছি যে, এটি ঐশীবাণী, এতটুকুনই। শুধু তাই নয়, আরবি ভাষাটাকে আমরা মুসলমানরাই বা কতটা ভালোবাসি?

আপনার সন্তানের আরবি শিক্ষকের বেতন দিতেও মনের মধ্যে একটা দ্বিধা কাজ করে না? মনে মনে বলেননি যে, ‘আরে আরবি আর কি-ইবা এমন কিছু যে, যা শিখতে হলে ওই শিক্ষককে হাজার টাকা দিতে হবে?’ শ্রদ্ধার দায় ঠেকাতে বা ধর্মভীতি ঠেকাতে, আমরা আমাদের সন্তানকে আরবি ওতটুকুনই শিখতে বসাই যতটুকুন শিখলে সে, কোরআনটুকু পড়তে পারবে। ব্যস!
আমরা ধর্মটাকে কেন জানি, শুধু শ্রদ্ধা আর ভয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছি। আর এটুকুই মাত্র ‘ধর্ম-ভীতি’ শব্দটির উৎপত্তি? আর সে জায়গা থেকেই অসম্ভব কিছু ধর্মান্ধ সৃষ্টি হয়েছে।
দাড়ি-টুপির কথা আর কি-ইবা বলব? এদের দেখলে কেবলই লোক দেখানো করুণার শ্রদ্ধা বিছিয়ে দিই। আর পেছনে বলি, ‘আরে অই বেটা হুজুর আইছিল’!
এই ‘শ্রদ্ধা’, ‘শ্রদ্ধা’ ভাব আর কতদিন? আমরা এটা কেন বুঝতে চেষ্টা করি না যে, শ্রদ্ধার সঙ্গে ভালোবাসা না থাকলে সেটা পানসে শ্রদ্ধা হয়ে ওঠে, সেটা কেবলই করুণার পাত্র হয়ে ওঠে।
আমরা ধর্মটাকে কেন ভীতিকর চোখে দেখব? ধর্ম কি কেবলই ভয়ের জন্য? কেবলই ভয়, ভয়! ভয়ের কারণে কাউকে ‘সালাম’ দেয়া আর ভালোবেসে কাউকে ‘সালাম’ দেয়ার মধ্যে কতটা তফাৎ তা কেন আমরা বুঝব না?
কোরআন তো কেবলই ভয় দেখানোর বই নয়, কেবলই নীতি কথার বই নয়, কেবলই উপদেশমূলক কোনো বই নয়। -এই জিনিসগুলো আমরা কেন বোঝার চেষ্টা করি না?
আমরা এতটাই গর্দভ যে, এটাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে কষে বেঁধে বুকসেলফে উঠিয়ে রাখি। বিপদে পড়লে সূরা ইয়াসিন বা সূরা আররহমান অথবা বিপদ কাটানোর কোনো সূরা পড়ে, চুমু খেয়ে আবার ভক্তি করে কষে বেঁধে উঠিয়ে রাখি!
আমরা বিশ্বাসই করি না যে, কোরআন একটি দৈনন্দিন চর্চার বই হতে পারে। বিশ্বাস করি না যে, কোরআন কোনো বিজ্ঞানের বই হতে পারে; বিশ্বাস করি না যে, এটি কোনো সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস অথবা ভূগোলের বই হতে পারে।
শুধু তাই-ই নয়, এটাকে কোনোভাবেই গণিতের বই হিসেবে দেখতে নারাজ। শুধু মনেই করি, এটা একটি ধর্মীয় নীতিগ্রন্থ। এটা দিয়ে বিপদাপদ দূর করা যায়, ভূত-প্রেতের আসর থেকে রক্ষা পেতে এটির কোনো একটি সূরা ব্যবহার করতে হয়।
মনগড়া আর উদাসী মুসলমান আর কত দিন ধরে এভাবে বেমালুম ভুলে থাকবে? কবে এটাকে কেবল একটি ধর্মীয় গ্রন্থ না বলে, ভালোলাগা আর ভালোবাসার বই হিসেবে গ্রহণ করবে? কবে এটাকে বিস্তর গবেষণার জন্য মন-প্রাণ উজাড় করে দেবে?
অনেকেই আবার এটাকে শুধু সুর দিয়ে পড়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি কিন্তু একটাবারও চেষ্টা করি না যে, আয়াতগুলো মানুষের জন্য কী বলছে!
আমাদের মনোভাব যদি, ‘ধর্মভীতি’ না হয়ে ধর্মপ্রীতি বা ধর্মপ্রিয় হতো, তাহলে মনে হয়, আমরা কোরআন চর্চা অনেকটা বাড়িয়ে দিতাম। নিজেদের সব সমস্যার সমাধান এই কোরআন থেকে খুঁজে নিতাম।
তবে, অপ্রিয় সত্য কথা হচ্ছে, এ দেশের আলেমরাই ধর্মটাকে মানুষের কাছে প্রিয় করে তুলতে পারেনি। শুধু ভয় দেখিয়ে আর ধর্মানুষ্ঠানাদি পালন করে ধর্মচর্চা অব্যাহত রেখেছে।
যার ফল দাঁড়িয়েছে, আজকের মুসলমান নামধারীরাই অমুসলিম ভাবধারার ধারক-বাহক হতে; দাড়ি-টুপি কিংবা পাঞ্জাবিওয়ালা দেখলেই নাক সিটকাতে থাকে!
সমাজে আলেম নামে পরিচিতরা কোরআনকে উন্মুক্ত করতে পারছে না, আলোচনায় কোনো আধুনিকতা কিংবা তথ্যবিজ্ঞান দিয়ে কথা বলছে না, কোরআনের গাণিতিক বিস্ময় তুলে ধরতে পারছে না, বিজ্ঞানচর্চায়ও তেমন করে কোরআনের যুক্তি ফুটিয়ে তুলতে পারছে না।
কেবলই মনগড়া ব্যাখ্যা আর কিছু ঘটনাবলি সুর দিয়ে বর্ণনা করে, পকেটে টাকা ঢুকিয়ে দিলেই মনে করে নিচ্ছে, আল-হামদুলিল্লাহ! দায়িত্ব পালন হয়ে গেছে! তবে সুখের কথা হচ্ছে, আধুনিকমনা কিছু কিছু তরুণ কোরআনের বিস্ময়ভাব তুলে ধরতে এগিয়ে আসছেন।
সর্বশেষ যে কথাটি বলা-ই-বাহুল্য তা হচ্ছে, মনের সব সংকীর্ণতাকে ঝেড়ে ফেলে, সব আলেমকেই একাট্টা হয়ে কোরআনের বিস্ময়ভাব মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ
যুগান্তর









