সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
মানুষের জীবনে ভ্রমণ একটি অপরিহার্য অংশ। জীবিকা, শিক্ষা, দাওয়াত কিংবা প্রয়োজন; বিভিন্ন কারণে মানুষকে পথ ধরতে হয়। কিন্তু পথ সবসময় নিরাপদ নয়। অজানা ঝুঁকি, দুর্ঘটনা, দুষ্কৃতকারী, ক্লান্তি; সব মিলিয়ে ভ্রমণ একটি অনিশ্চিত অভিজ্ঞতা।
এই বাস্তবতায় ইসলাম কেবল আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনাই দেয়নি, বরং ভ্রমণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যও দিয়েছে সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত কিছু নববী রীতি, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
ভ্রমণের শুরুতেই রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে যাত্রা শুরু করতে। তিনি যখন সফরে বের হতেন, তখন দোয়া পড়তেন—

سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هٰذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ
উচ্চারণ: “সুবহানাল্লাযি সাখ্খারা লানা হাযা ওয়ামা কুন্না লাহু মকিরিনীন
অর্থ: আল্লাহ পবিত্র, যিনি এ বাহনকে আমাদের জন্য অনুগত করে দিয়েছেন…” (মুসলিম, হাদিস : ১৩৪২)
এই দোয়া শুধু ইবাদত নয়, বরং মানসিক প্রস্তুতি। মানুষকে মনে করিয়ে দেয়; নিরাপত্তার প্রকৃত উৎস আল্লাহ, আর মানুষ তাঁরই ওপর নির্ভরশীল।
ভ্রমণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নববী নির্দেশনা হলো একা সফর না করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যদি মানুষ জানত একা ভ্রমণে কী বিপদ আছে, তাহলে কেউ একা সফরে বের হতো না।” (বুখারি, হাদিস : ২৯৯৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, “একজন আরোহী শয়তান, দুইজন দুই শয়তান, আর তিনজন হলে তারা একটি দল।” (আবু দাউদ, হাদিস : ২৬০৭; তিরমিজি, হাদিস : ১৬৭৪)
এই হাদিসগুলোর মধ্যে গভীর নিরাপত্তাবোধ নিহিত রয়েছে।
দলবদ্ধ ভ্রমণ মানে পারস্পরিক সহায়তা, বিপদের সময় সহযোগিতা এবং অপরাধের ঝুঁকি হ্রাস পাওয়া। যা আধুনিক নিরাপত্তা নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভ্রমণে নেতৃত্ব নির্ধারণ করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ নববী রীতি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “যখন তিনজন কোনো সফরে বের হয়, তখন তারা যেন তাদের মধ্য থেকে একজনকে নেতা নির্ধারণ করে।” (আবু দাউদ, হাদিস : ২৬০৮)
এই নির্দেশনা দলগত শৃঙ্খলা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর।
একটি নির্দিষ্ট নেতৃত্ব থাকলে বিভ্রান্তি কমে, সিদ্ধান্ত দ্রুত হয় এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
ভ্রমণের সময় কখন যাত্রা করা হবে; এ বিষয়েও নববী দিকনির্দেশনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “তোমরা রাতে ভ্রমণ করো, কারণ রাতে জমিন সংকুচিত হয়ে যায় (অর্থাৎ পথ সহজ হয়)।” (আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৭১)
তৎকালীন প্রেক্ষাপটে দিনের তাপদাহ এড়ানো এবং পথের সুবিধা লাভের বিষয়টি এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। বর্তমান যুগে এর অর্থ দাঁড়ায়; পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপদ সময় নির্বাচন করা।
ভ্রমণে বিরতি নেওয়া এবং সঠিকভাবে অবস্থান করাও নিরাপত্তার অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন— “তোমরা যখন রাতের বেলা অবস্থান করবে, তখন রাস্তার ওপর অবস্থান করো না; কারণ এটি রাতে জীবজন্তুর চলাচলের পথ।” (মুসলিম, হাদিস নং ১৯২৬)
এটি একেবারেই বাস্তবসম্মত নির্দেশনা। যা আমাদের শিখায় যে, সফর করার সময় বিরতির জন্য নিজ বাহন রাস্তায় না রেখ নিরাপদ জায়গায় রাখতে হবে।
ভ্রমণের সময় সম্পদ ও বাহনের নিরাপত্তার দিকেও ইসলাম দৃষ্টি দিয়েছে। এক ব্যক্তি তার উটকে ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বলেন— “প্রথমে উটকে বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।” (তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৭)
এটি ইসলামের নিরাপত্তা দর্শনের একটি মৌলিক নীতি। শুধু তাওয়াক্কুল নয়, বরং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পর তাওয়াক্কুল।
ভ্রমণে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়েও নববী নির্দেশনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “সফর হলো শাস্তির একটি অংশ; যখন তোমাদের কেউ তার কাজ সম্পন্ন করে, তখন সে যেন দ্রুত তার পরিবারের কাছে ফিরে আসে।” (বুখারি, হাদিস : ১৮০৪) অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব ঝুঁকি বাড়ায়; এই বাস্তবতাই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
সবশেষে, ভ্রমণের নিরাপত্তায় দোয়া ও আল্লাহর স্মরণ একটি শক্তিশালী মানসিক ও আধ্যাত্মিক সুরক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) সফরের সময় বিভিন্ন দোয়া পড়তেন এবং আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা কামনা করতেন। এটি মানুষের ভেতরে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে এবং ভয়-আতঙ্ক কমায়।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, নববী রীতিতে ভ্রমণের নিরাপত্তা কেবল আধ্যাত্মিক অনুশীলন নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এখানে রয়েছে পরিকল্পনা, সতর্কতা, দলগত শৃঙ্খলা, বাস্তব প্রস্তুতি এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতার সমন্বয়। আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বহু নীতিই এই নববী শিক্ষার সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই নিরাপদ ভ্রমণের জন্য এই রীতিগুলো অনুসরণ করা কেবল ধর্মীয় অনুশীলনই নয়, বরং একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com









