সবশেষ
জাতীয়

ভাস্কর্যগুলো প্রতিস্থাপনে গড়িমসি

নিউজ ডেস্ক২৬ মার্চ ২০২৬৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বিকেলে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সে হামলা চালানো হয়। ভেঙে ফেলা হয় প্রায় সব ভাস্কর্য। এরপর দেড় বছর পার হয়েছে। ভাস্কর্যগুলো প্রতিস্থাপনে জেলা ব্যবস্থাপনা কমিটি চাহিদা পাঠালেও কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সরকার পতনের খবর ছড়িয়ে পড়ার কিছুক্ষণ পর থেকে দুই শতাধিক মানুষ রড, বাঁশ ও হাতুড়ি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে। প্রথমে তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটির মাথা ভেঙে ফেলে। একই সময় এলোপাতাড়ি আঘাত করে ১৭ এপ্রিলের গার্ড অব অনার ভাস্কর্যটিতে। আরেকটি দল ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের আত্মসমর্থনের ভাস্কর্যগুলোতে আঘাত করে।

পরে কমপ্লেক্সের ভেতর দেশের মানচিত্রের আদলে তৈরি মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরে যুদ্ধের বর্ণনা সংবলিত ছোট ভাস্কর্যগুলো ভেঙে আশপাশে ছুড়ে ফেলা হয়। আরো একটি দল শহীদ স্মৃতিসৌধের প্রধান ফটকটি ভেঙে নিয়ে যায়।
মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন আনসার সদস্য সুমন আহমেদ বলেন, ‘তিন শতাধিক ছোট-বড় ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমরা প্রথমে তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে আমাদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে তারা ভাস্কর্যগুলো ভাঙতে শুরু করে।

এসময় আমাদের এক সদস্য পড়ে গিয়ে আহত হন। একদল লোক এসে কিছু ভাস্কর্য ভেঙে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার আরেকদল এসে স্মৃতি কমপ্লেক্সের মানচিত্র ও গ্যালারির সব ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে। হামলাকারীরা সীমানা বেষ্টনী, স্মৃতিসৌধের প্রধান ফটক, পানির পাম্পসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।’
মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স আনসার ক্যাম্পে তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবেদার রবিউল ইসলাম বলেন, ‘যখন হামলাকারীরা এখানে হামলা শুরু করে, তখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মুঠোফোনে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল।

তিনি কোনো নির্দেশনা দিতে পারেননি। এ কারণে আনসার সদস্যরা নিজেদের জীবন ও অস্ত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যারাকে অবস্থান নেন।’
সম্প্রতি সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ভেতরে যেন এক বিরানভূমি। এক সময়ের দর্শনার্থীদের পদভারে মুখরিত মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সটি আজ নির্বিকার। কমপ্লেক্সের মধ্যে রয়েছে পর্যটন মোটেল, মসজিদ ও রাষ্ট্রীয় অতিথিদের বাংলো। এগুলো ভাঙচুর করা হয়নি। এগুলো পেরিয়ে স্মৃতি কমপ্লেক্স। কমপ্লেক্সের সামনে সারি সারি ভাস্কর্য। সেখানে সব ভাস্কর্য কম-বেশি ভাঙচুর করা হয়। সেগুলো এখনো ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। বাংলাদেশের মানচিত্রের ওপরে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধকালীন ১১টি সেক্টরের আদলে তৈরি ছোট ভাস্কর্যগুলো একেবারে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। কমপ্লেক্সের পেছনে জয় বাংলা তোরণের ‘জয় বাংলা’ লেখাটি খুলে নিয়ে যায় হামলাকারীরা।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠনের লক্ষ্যে নিরাপদ স্থান বিবেচনায় মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর) সমবেত হন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। সেখানে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রথম সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। পরে স্থানটির নামকরণ করা হয় মুজিবনগর।

ওই অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। এম এ জি ওসমানীকে সরকারের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। মুজিবনগরে তৎকালীন সাবডিভিশনাল পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের নেতৃত্বে ১২ জন আনসার সদস্য বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।

দেশ স্বাধীনের পর ১৯৮৭ সালে মুজিবনগর আম্রকাননে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিসৌধ। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ স্থানকে আরো তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলতে ১৯৯৬ সালে ওই স্থানে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স স্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সটিকে আন্তর্জাতিক মানের মুক্তিযুদ্ধ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে ৪০৯ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করে।

মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ স্বেচ্ছাশ্রমে দীর্ঘদিন ধরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন সুভাস মল্লিক। তিনি বলেন, ‘মুজিবনগরের সৌন্দর্য সব শেষ হয়ে গেছে। আর ভালো লাগছে না। পর্যটকরা এসে আর কী দেখবে?’

মুজিবনগরে বেড়াতে যাওয়া স্কুলশিক্ষক ইয়ামিন হাসান বলেন, ‘রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু ইতিহাসের ওপর আঘাত করা মোটেও কাম্য নয়। ইতিহাসের টানে বারবার মুজিবনগরে আসি। কিন্তু আগের সেই মুজিবনগর আর পাই না। বর্তমান সরকারের উচিত খুব দ্রুত মুজিবগর স্মৃতি কমপ্লেক্স পুনর্গঠন করা।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল মালেক বলেন, ‘মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমেপ্লেক্সের একেকটি ভাস্কর্য স্বাধীনতার প্রতীক। যারা এগুলো ভেঙেছে তারা গর্হিত কাজ করেছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এ ঘটনার শোনার পর থেকে আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি, সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং ভেঙে ফেলা ভাস্কর্যগুলো নতুন করে প্রতিস্থাপন করা হোক।’

মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা মুজিবনগরে পরিদর্শন করে একটি চাহিদা পাঠাতে বলেছিলেন। তার পরই ভাস্কর্যগুলো নতুন করে প্রতিস্থাপন, অবকাঠামো ও ইলেকট্রিক কাজগুলো মেরামত করার জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়। এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।’

মুজিবনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল হুদা বলেন, ‘জেলা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভাস্কর্যের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে আমি যোগ দেওয়ার আগেই। তবে এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয় থেকে কোনো নির্দেশনা আসেনি।’

মুজিবনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি।’