সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
আগামী অর্থবছরের (২০১৯-২০) বাজেটে চিনি ও ভোজ্যতেলের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর প্রভাবে বাজারে এ দুটি পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ভোজ্যতেলের দাম পাইকারি বাজারে প্রতি লিটারে ২ টাকা বেড়েছে, খুচরা বাজারে এর দাম এখনও বাড়েনি। চিনির দাম পাইকারি ও খুচরা- দুই বাজারেই প্রতি কেজিতে ২ টাকা করে বেড়েছে।
বর্তমানে বাজারে যে চিনি ও ভোজ্যতেল রয়েছে তা চলমান অর্থবছরের নির্ধারিত কর বা শুল্কে আনা। এখন যা আমদানি করা হচ্ছে তা বাজারে আসতে অন্তত এক মাস, ক্ষেত্র বিশেষে তার চেয়ে বেশি সময় লাগবে। অথচ এরই মধ্যে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্রেতা-ভোক্তারা।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে অপরিশোধিত চিনির ওপর প্রতি টনে স্পেসিফিক ডিউটি (নির্ধারিত কর) ছিল ২ হাজার টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে তা ৩ হাজার টাকা করা হয়েছে। প্রতি টনে কর বেড়েছে ১ হাজার টাকা। পরিশোধিত চিনিতে স্পেসিফিক ডিউটি ৪ হাজার ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ কর বেড়েছে দেড় হাজার টাকা।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নয়াবাজার ও রামপুরা কাঁচাবাজার এবং কেরানীগঞ্জের জিনজিরা বাজারের মুদি দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি খোলা চিনি ২ টাকা বেড়ে এখন ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজেট প্রস্তাবের আগে তা ৫০ টাকায় বিক্রি হতো। কারওয়ান বাজারের মুদি দোকানদার মো. ইলিয়াস যুগান্তরকে বলেন, বাজেটের পর পাইকারি বাজারে চিনির দাম বেড়েছে। সে কারণে বেশি দাম দিয়ে চিনি কিনতে হচ্ছে। বিক্রিও করতে হচ্ছে বেশি দামে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাজেট প্রস্তাবের আগে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চিনি ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হতো। সে ক্ষেত্রে প্রতি কেজি চিনির পাইকারি দাম হয় ৪৮ টাকা। কিন্তু বাজেট প্রস্তাবের পর এই চিনি পাইকারি পর্যায়ে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে প্রতি কেজি চিনির পাইকারি দাম ৫০ টাকা। কারওয়ান বাজার ও কেরানীগঞ্জের পাইকারি ব্যাবসায়ীরা বলছেন, বাজেটের পর মিল পর্যায়ে চিনির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে মিল মালিক ও আমদানিকারকরা। যে কারণে পাইকারি বাজারে চিনির দাম বেড়েছে। ফলে খুচরা বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
জানতে চাইলে সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, আমরা মিলগেটে এখনও কোনো পণ্যের দাম বাড়াইনি। অসাধু ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফা করতে গিয়ে আমাদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের আপত্তি নেই। কিন্তু হয়রানি ও জটিলতা এড়াতে আগের নিয়মে শুধু এক পর্যায়ে ভ্যাট দিতে চাই। এতে ব্যবসায়ীরা স্বস্তি পাবে।
প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ভোজ্যতেল আমদানিতে বর্তমানে ভ্যাট রয়েছে ১৫ শতাংশ। বাজেট প্রস্তাবে সেটি বহাল আছে। তবে এর সঙ্গে ৫ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপ করা হয়েছে। বর্তমানে ট্যারিফ মূল্য ৪ হাজার ১১০ টাকা। এর ওপর কর দিতে হতো। প্রস্তাবিত বাজেটে ট্যারিফ মূল্য বাতিল করা হয়েছে। ফলে বাজার দরের ওপর ভ্যাট দিতে হবে। ভোজ্যতেলের প্রতি টনের মূল্য ট্যারিফ মূল্যের চেয়ে বেশি। এতে ভোজ্যতেল আমদানির খরচ বাড়বে।
ভোজ্যতেল উৎপাদন, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী পর্যায়ে আগে ভ্যাট অব্যাহতি ছিল। প্রস্তাবিত বাজেটে উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ আগাম কর এবং ব্যবসায়ী পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এর প্রভাবে পাইকারি বাজারে দাম বাড়তে শুরু করেছে। মঙ্গলবার রাজধানীর পাইকারি বাজারে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ৯৮ টাকা। বাজেটের আগে বিক্রি হয়েছিল ৯৫-৯৬ টাকা।
ঢাকার মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম মাওলা বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে চিনি ও ভোজ্যতেলের ওপর ভ্যাট আরোপ করায় ইতিমধ্যে চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। এতে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে।
এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই’র পরিচালক আবু মোতালেব বলেন, নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে অনেক প্রয়োজনীয় পণ্যে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এফবিসিসিআই’র পক্ষ থেকে এসব পণ্যের ভ্যাট তুলে দেয়ার প্রস্তাব করেছিলাম। বাজেটে দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রে যে সব পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট ছিল সেগুলোকে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। ৫ শতাংশকে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, বাজেটে অনেকগুলো খাদ্যপণ্য ও নিত্যপণ্যের ওপর শুল্ক ও ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। যে কারণে এসব পণ্যের দাম বাড়বে। আর এসব পণ্যের দাম বাড়লে সাধারণ ভোক্তার খাদ্যপণ্য কিনতে ভোগান্তিতে পড়তে হবে।
আবার এখনই চিনি ও তেলের দাম বেড়ে যাওয়া যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। কারণ বাজেট এখনও চূড়ান্ত হয়নি, নতুন আমদানি করা পণ্যও বাজারে আসেনি।
সেই পণ্য দেশের বাজারে আসতে এক মাসেরও বেশি সময় লাগবে। গোলাম রহমান বলেন, এটা একটা অসাধুতা। তাই বাজার মনিটরিংয়ে যারা সংশ্লিষ্ট তাদের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। আর যারা অন্যায়ভাবে পণ্যের দাম বাড়িয়েছে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তা না হলে ভোক্তা ঠকবে।









