সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনে ব্যর্থ হওয়ায় এক্সিম ফার্মা সহ ২০টি কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল এবং আদ-দ্বীন ফার্মা সহ ১৪টি কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠিত পাঁচ সদস্যের বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জিএমপি (গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস বা উত্তম উৎপাদন কৌশল) নীতিমালা অনুসরণ না করে ওষুধ উৎপাদন করায় প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনের অনুমতি বাতিলের সুপারিশ করে এই কমিটি। লাইসেন্স বাতিল এবং অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন বন্ধ রাখার নির্দেশ পাওয়া কোম্পানির মালিকরা অবশ্য বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটির সুপারিশ নিয়ে অসন্তুষ্ট। অন্যদিকে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের অভিমত, হাইকোর্টের নির্দেশনার পর বাজার থেকে মানহীন ওষুধ উধাও হয়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটি যে ২০টি কোম্পানির লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করেছে সেগুলো হলো- এক্সিম ফার্মাসিউটিক্যাল, এভার্ট ফার্মা, বিকল্প ফার্মাসিউটিক্যাল, ডলফিন ফার্মাসিউটিক্যাল, ড্রাগল্যান্ড, গ্লোব ল্যাবরেটরিজ, জলপা ল্যাবরেটরিজ, কাফিনা ফার্মাসিউটিক্যাল, মেডিকো ফার্মাসিউটিক্যাল, ন্যাশনাল ড্রাগ, নর্থ বেঙ্গল ফার্মাসিউটিক্যাল, রিমো কেমিকেল, রিদ ফার্মাসিউটিক্যাল, স্কাইল্যাব ফার্মাসিউটিক্যাল, স্পার্ক ফার্মাসিউটিক্যাল, স্টার ফার্মাসিউটিক্যাল, সুনিপুণ ফার্মাসিউটিক্যাল, টুডে ফার্মাসিউটিক্যাল, ট্রপিক্যাল ফার্মাসিউটিক্যাল ও ইউনিভার্সাল ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড।
এছাড়া ১৪টি কোম্পানির সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক (নন-পেনিসিলিন, পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন গ্রুপ) উৎপাদনের অনুমতি বাতিল এবং ২২টি কোম্পানির পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন গ্রুপের অ্যান্টিবায়েটিক উৎপাদনের অনুমতি স্থগিত করার সুপারিশও করে বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটি।
সংসদীয় কমিটি জিএমপি মূল্যায়ন বিষয়ক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ‘ওষুধ উৎপাদনকালে জিএমপি নীতিমালা অনুসরণ না করলে উৎপাদিত ওষুধ মানসম্পন্ন হয় না, ব্যবহারকারীর অসুখ না সেরে বরং শরীরের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে, যে ক্ষতি প্রাণঘাতীও হতে পারে এবং এই ওষুধ জনস্বাস্থ্যের জন্য সার্বিক বিবেচনায় পরিতাজ্য।’
এর আগে ২০১৬ সালের ৭ জুন ২০টি কোম্পানির ওষুধ উৎপাদন এক সপ্তাহের মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অপর ১৪টি প্রতিষ্ঠানের অ্যান্টিবায়েটিক (নন-পেনিসিলিন, পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন) ওষুধ উৎপাদনও বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সেসময়।
এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের নির্দেশনা চেয়ে করা রিট আবেদনে বলা হয়, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করতে ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটি দেশের ৮৪টি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে দেওয়া প্রতিবেদনে মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হওয়া ২০টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় রিট আবেদনটি করা হয়।
এ প্রসঙ্গে কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সহ-সভাপতি আব্দুল হাই বলেন, এসব কোম্পানির ওষুধের জন্য আমাদের সুনাম ক্ষুন্ন হতো। ভেজাল এবং নিম্নমানের ওষুধ কারও কাছে কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমরা অবিলম্বে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বাস্তবায়ন দেখতে চাই।
ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক মো. রুহুল আমিন বলেন, লাইসেন্স বাতিল এবং অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ পাওয়া কোম্পানিগুলোর বেশ কয়েকটি আগে থেকেই বন্ধ ছিল। তাদেরকে আমরা বারবার সতর্ক করলেও তারা নিজেদের সংশোধন করেনি। উচ্চ আদালতের নির্দেশের পর সেগুলো আমরা বন্ধ করে দিয়েছি, তাদেরকে আর কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি আরও বলেন, যে ওষুধের মানুষের জীবন বাঁচানোর কথা, সেই ওষুধ যদি মানুষের মৃত্যু ঘটায় তাহলে সেটি অপরাধ। আমরা এসব কোম্পানির সব ওষুধ বাজার থেকে উঠিয়ে নিচ্ছি। সারা দেশে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের কর্মীরা কাজ করছেন। এসব ওষুধ বাজারে একটাও থাকবে না।
তবে বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রতিবেদনে উল্লেখিত কোম্পানি এমএসটি ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম তসলিম হাসান। তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদন আমাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। তবে আইনের প্রতি সবাইকে শ্রদ্ধা দেখাতে হবে, আমরাও তার বাইরে নই। উচ্চ আদালতের দেওয়া আদেশের পূর্ণাঙ্গ কপি বের হলে আমরা সেটি পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটির প্রধান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক এবিএম ফারুক বলেন, ১৭টি কোম্পানি সাসপেন্ডেড ছিল। সাসপেন্ডেড মানে হলো সাময়িক বন্ধ হওয়া, উৎপাদনও বন্ধ থাকবে সেখানে। কিন্তু সাসপেন্ডেড হলেও তারা ওষুধ তৈরি করছিল এবং সেই ওষুধ বাজারে পাওয়াও যাচ্ছিল। আমরা দেখেছি, বাইরে তালা মেরে ভেতরে উৎপাদন কাজ চলছে। ওষুধ কোম্পানির লোকজনকেও এ ধরনের কাজ করতে দেখেছি।
তিনি আরও বলেন, বরিশাল, ময়মনসিংহ, মুন্সীগঞ্জ, রংপুর, ঢাকা সহ বিভিন্ন জায়গায় এমনটা পেয়েছি। এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য, সাময়িক বন্ধ করার দরকার নাই, এগুলোকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হোক। কারণ তাদের ওষুধ উৎপাদনের ক্ষমতা নাই। এক্ষেত্রে মরালিটির (নৈতিকতা) প্রশ্নটি অনেক বড়। জনস্বাস্থ্যের জন্যই এগুলো বন্ধ করে দেওয়া নিরাপদ।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন









