সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
গর্ভাবস্থায় অ্যাসিটামিনোফেন (প্যারাসিটামল) সেবনের ফলে সন্তানের অটিজম আক্রান্ত হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলে জানিয়েছেন সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা।
অ্যাসিটামিনোফেন বা প্যারাসিটামল হলো টাইলেনল ও প্যানাডল নামের দুটি ব্যথানাশক ওষুধের প্রধান উপাদান। কেকে উইমেন’স অ্যান্ড চিলড্রেন’স হসপিটালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগীয় চেয়ারম্যান অধ্যাপক ট্যান হাক কুন দ্য স্ট্রেইটস টাইমসকে জানান, গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল কয়েক দশক ধরে নিরাপদে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এটি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসা সংগঠনগুলোর সমর্থনপ্রাপ্ত।

তিনি বলেন, ‘বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ গর্ভাবস্থায় অ্যাসিটামিনোফেন বা প্যারাসিটামল সেবনে অটিজম সৃষ্টি করে—এমন দাবিকে সমর্থন করে না।
’
দ্য স্ট্রেইটস টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা গর্ভবতী নারীদের আশ্বস্ত করতে চান, চিকিৎসকের পরামর্শমতো মাত্রায় এবং প্রয়োজনীয় স্বল্প সময়ের জন্য ব্যবহার করলে গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল সেবন নিরাপদ।
গত ২২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, গর্ভবতী নারীরা টাইলেনল সেবন করলে কিছু শিশুর অটিজম হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
তিনি প্রচলিত বৈজ্ঞানিক পরামর্শ ও চিকিৎসামতের বিপরীতে বলেন, টাইলেনল সেবন করা ‘ভালো নয়’ এবং গর্ভবতী নারীদের উচিত ‘প্রচণ্ড জ্বর ছাড়া লড়াই করে এটি এড়িয়ে চলা।’
তার এই মন্তব্য আসে স্বাস্থ্যসচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের নেতৃত্বে কয়েক মাস ধরে বহুল প্রচারিত তদন্তের পর।
তবে বিজ্ঞানীরা এটি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বিশ্বব্যাপী গবেষণাগুলো তার দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থাগুলো এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানায়। সর্বশেষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২৪ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে জানায়, গর্ভাবস্থায় অ্যাসিটামিনোফেন সেবন ও অটিজমের মধ্যে কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়নি।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ বা প্রতি ১২৭ জনে একজন অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সচেতনতা ও রোগ নির্ণয় বেড়েছে, তবে অটিজমের সঠিক কারণ এখনো অজানা।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত এক দশকে গর্ভাবস্থায় অ্যাসিটামিনোফেন সেবন ও অটিজমের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে বহু বৃহৎ গবেষণা হয়েছে। কোনো ধারাবাহিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
ডব্লিউএইচও আরো জানায়, গর্ভাবস্থায় ব্যথা ও জ্বরের চিকিৎসায় প্যারাসিটামল এখনো সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
অধ্যাপক ট্যান বলেন, ‘আসলে, গর্ভাবস্থায় চিকিৎসাহীন জ্বর ও তীব্র ব্যথা মা ও শিশুর উভয়ের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
চিকিৎসাহীন জ্বরের সঙ্গে গর্ভপাত, ভ্রূণের অঙ্গ বিকলাঙ্গতা এবং হৃদরোগ জটিলতার সম্পর্ক আছে। আবার অচিকিৎসিত ব্যথা রক্তচাপ বৃদ্ধি, মানসিক চাপ ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে, যা গর্ভধারণের ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কুয়েক সুই চং বলেন, ‘আমি আমার গর্ভবতী রোগীদের ব্যথা, মাথাব্যথা বা জ্বরের জন্য প্যানাডল (অ্যাসিটামিনোফেন) দিতে দ্বিধা করি না এবং এফডিএ, এইচএসএ ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষ দ্বারা স্পষ্টভাবে ঝুঁকি প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তা চালিয়ে যাব।’
বেসরকারি চিকিৎসক ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ক্রিস্টোফার চং বলেন, ‘গর্ভবতী নারীদের ওষুধ কেবল প্রয়োজন হলে দেওয়া হয় এবং আমরা সর্বদা সেই ওষুধ দিয়ে শুরু করি যার ভ্রূণকে ক্ষতি করার ঝুঁকি সবচেয়ে কম।’
তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে অটিজম পূর্বাভাস দেওয়ার কোনো পরীক্ষা নেই। অটিজম একটি আচরণগত সমস্যা এবং এর পেছনে বহু কারণ কাজ করে। এটি প্রমাণের জন্য বৃহৎ পরিসরে র্যান্ডমাইজড গবেষণা প্রয়োজন। কিন্তু গর্ভবতী নারীদের এমন পরীক্ষার আওতায় আনা নৈতিক বা ন্যায্য নয়, যেগুলো ভ্রূণকে ক্ষতি করতে পারে।’
অটিজম একটি স্নায়বিক বিকাশজনিত অবস্থা, যার প্রকোপ বিশ্বব্যাপী বাড়ছে। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে সুইডেন ও যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের যৌথ এক বৃহৎ গবেষণায় ১ লাখ ৮৬ হাজার শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল সেবন ও সন্তানের অটিজম বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।
মার্কিন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের অর্থায়নে পরিচালিত এ গবেষণায় গর্ভাবস্থায় মায়েরা প্যারাসিটামল সেবন করেছেন এমন সন্তানদের সঙ্গে তাদের ভাইবোনদের তুলনা করে দেখা হয়। উপসংহারে বলা হয়, মাতৃসুলভ প্যারাসিটামল সেবন ও সন্তানের অটিস্টিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কোনো প্রমাণ নেই।
সিঙ্গাপুরে ২০১০ সাল থেকে অটিজম সংক্রান্ত গবেষণা ব্যাপকভাবে বেড়েছে, যখন প্রথমবারের মতো সিঙ্গাপুর ক্লিনিকাল প্র্যাকটিস গাইডলাইনস প্রকাশিত হয়।
২০২৩ সালে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হসপিটাল ও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি পলিক্লিনিক প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, সিঙ্গাপুরে ১৮ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রতি ১০০ জনে একজনের বেশি অটিজমে আক্রান্ত। এই বয়সে শিশুদের নিউরোডেভেলপমেন্টাল সমস্যা শনাক্ত করা যায়।
একটি চিঠিতে, অটিজম ক্লিনিকাল প্র্যাকটিস গাইডলাইনস ওয়ার্কগ্রুপের সহনেতৃত্বে থাকা ডা. ওং চুই মে এবং ডা. আইশ্বরিয়া রামকুমার লেখেন, ‘বর্তমান পর্যন্ত চিকিৎসা প্রমাণ, যার মধ্যে ২০২৪–২০২৫ সালের প্রকাশনাগুলোও অন্তর্ভুক্ত, দেখায় যে গর্ভাবস্থায় মায়ের প্যারাসিটামল সেবন ও সন্তানের অটিজম ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্কের পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। তাই গর্ভবতী নারীদের প্যারাসিটামল এড়িয়ে চলার প্রয়োজন নেই।’
অধ্যাপক ট্যান বলেন, ‘গর্ভবতী নারীদের জন্য আমাদের পরামর্শ অপরিবর্তিত, যদি ব্যথানাশক প্রয়োজন হয় বা জ্বর আসে, প্যারাসিটামল নিরাপদ এবং ব্যবহারযোগ্য। আমরা তাদের উৎসাহিত করি যেন কোনো উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করেন, অমূলক আশঙ্কার কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এড়িয়ে না যান।’
সূত্র : দ্য স্ট্রেইট টাইমস









