ধর্ম

পবিত্র কোরআনে বদরযুদ্ধ প্রসঙ্গ

নিউজ ডেস্ক৭ মার্চ ২০২৬৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

হিজরতের অনধিক ১৯ মাস পর দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান শুক্রবার সকালে (৬২৪ খ্রি. ১১ মার্চ) ঐতিহাসিক বদরযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে মুসলিমদের পক্ষে ছয়জন মুহাজির, আটজন আনসারসহ মোট ১৪ জন শহীদ হন। কাফিরদের পক্ষে ৭০ জন নিহত ও ৭০ জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বন্দি হয়। (আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা-২২৪)

বদরযুদ্ধ ছিল ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে মহিমান্বিত যুদ্ধ।

মহান আল্লাহ এই যুদ্ধকে ‘ইয়াওমুল ফোরকান’ (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী) নাম দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে বদর যুদ্ধের বিজয় ইসলামের দাওয়াত, ইসলামের অগ্রযাত্রা ও মুসলিম উম্মাহকে প্রাথমিক স্তর থেকে পরিণত স্তরে উন্নীত করেছিল। এর ফলে ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক বাধাগুলো দূর হয়েছিল। বদরযুদ্ধের ফলাফল সংশ্লিষ্ট নানা শ্রেণিকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছিল।

ঐতিহাসিকরা মনে করেন, ‘ইয়াওমুল ফোরকান’ হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের প্রভাব অব্যাহত থাকবে।
বদরযুদ্ধ অসত্যের বিরুদ্ধে আজন্ম সংগ্রামের অনন্ত অনুপ্রেরণা, যা শুধু ইসলামের ইতিহাসে নয়, বরং মানবজাতির ইতিহাসে অনন্য এক ঘটনা। মহান আল্লাহও পবিত্র কোরআনে এই দিনের স্বীকৃতি দিয়েছেন নানাভাবে। তিনি কোরআনে উভয় পক্ষের শক্তির পার্থক্য, মুসলিম উম্মাহর প্রতি তার অনুগ্রহ এবং কম্পমান একটি অবস্থা থেকে মুসলিম বাহিনীর ঘুরে দাঁড়ানোর চিত্র তুলে ধরেছেন।

সাহসিকতা এই সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী দিন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনের সুরা আলে ইমরান ও সুরা আনফালে বদরযুদ্ধের সবিস্তার বর্ণনা এসেছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, সুরা আনফাল বদর যুদ্ধ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। এ সুরায় যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, যুদ্ধবন্দি, ফেরেশতাদের অংশগ্রহণসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর আলোচনা রয়েছে। আর সুরা আলে ইমরানে মুসলমানদের অবস্থা, আল্লাহর সাহায্য ও তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

এ সুরায় আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে ভবিষ্যতেও সাহায্যের ধারা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
বদরযুদ্ধের অবস্থা তুলে ধরে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের বদরে সাহায্য করেছেন। অথচ তোমরা ক্ষীণশক্তি।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১২৩)

এই সাহায্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘আর আল্লাহ এটা করেছেন, তোমাদের সুসংবাদ দেওয়ার জন্য এবং যাতে এর দ্বারা তোমাদের অন্তর প্রশান্ত হয়। সাহায্য শুধু মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর পক্ষ থেকে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১২৬)

শুধু বদর নয়, বরং ভবিষ্যতেও আল্লাহ আসমানি এই সাহায্যের ধারা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘বরং তোমরা যদি ধৈর্যধারণ করো, আল্লাহকে ভয় করো এবং তারা দ্রুতগতিতে তোমাদের ওপর আক্রমণ করে, তবে আল্লাহ তাআলা তোমাদের পাঁচ হাজার ফেরেশতার সুবিন্যস্ত বাহিনী দ্বারা সাহায্য করবেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১২৫)

সুরা আনফালের ৬৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের অনুরূপ সাহায্যের অঙ্গীকার করেছেন।

সুরা আনফালে আল্লাহ তাআলা বদর প্রান্তে মুসলিম বাহিনীর অবস্থানের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে নিকট প্রান্তে এবং তারা ছিল দূর প্রান্তে। উষ্ট্রারোহী দল ছিল তোমাদের চেয়ে নিম্নভূমিতে।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ৪২)

এর পরের আয়াতেই আল্লাহ মুমিনদের সাহস জোগানের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘স্মরণ করো! যখন আল্লাহ আপনাকে স্বপ্নে দেখিয়েছিলেন, তারা সংখ্যায় অল্প। যদি তিনি তাদের সংখ্যায় বেশি দেখাইতেন, তবে তোমরা সাহস হারাতে এবং যুদ্ধের ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি করতে। কিন্তু আল্লাহ রক্ষা করেছেন। নিশ্চয়ই তিনি অন্তরের খবর জানেন।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ৪৩)

সুরা আনফালের ৫০ আয়াতে আল্লাহ ফেরেশতাদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে বলেছেন, ‘যদি তুমি দেখতে ফেরেশতারা অবিশ্বাসীদের মুখে ও পিঠে আঘাত করে জীবন কেড়ে নিচ্ছে এবং বলছে, তোমরা দহনযন্ত্রণা ভোগ করো।’

একই সুরার ৬৭ থেকে ৭১ নম্বর আয়াত পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা যুদ্ধবন্দিদের সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এই আয়াতে অর্থের বিনিময়ে বন্দিদের ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হয়। তবে পরের আয়াতে এই সিদ্ধান্তের বৈধতাও দেওয়া হয়। যুদ্ধবন্দিদের ব্যাপারে বলা হয়, যদি তাদের উদ্দেশ্য ভালো হয়, তবে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দেবেন। আর যদি তাদের উদ্দেশ্য মন্দ হয়, তবে আল্লাহ মুমিনদের মাধ্যমে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দেবেন।

বদরযুদ্ধের পরই প্রকৃতপক্ষে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রকৃত অভ্যুদয় ঘটেছিল। বদরযুদ্ধ সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর ঈমান, আল্লাহর ওপর আস্থা ও সাহসিকতা অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। কেননা তাঁরা বদরযুদ্ধে আল্লাহর প্রত্যক্ষ সাহায্য অবলোকন করেছিলেন। আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস তাঁদের কখনো পিছপা হতে দেয়নি, বরং পরিস্থিতি যতই অনুকূল হোক তাঁরা অসীম সাহসের সঙ্গে নিজেকে আল্লাহর রাস্তায় সঁপে দিয়েছেন।

বদরযুদ্ধের পর আরব উপদ্বীপে ইসলামের পরিচিতি, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রভাব-প্রতিপত্তি ছড়িয়ে পড়ে। বদরযুদ্ধের আগে ইসলামকে তাঁরা মক্কার অভ্যন্তরীণ সমস্যা মনে করত। কিন্তু মদিনায় হিজরত এবং বদরযুদ্ধে মক্কার কোরাইশদের শোচনীয় পরাজয় তাঁদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এ সময় তাঁদের অনেকের হৃদয় ইসলামের জন্য প্রশস্ত হয় এবং জ্ঞানীদের সামনে ইসলামী রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ স্পষ্ট হয়ে যায়।