রাজশাহী

‘নারী ডোম প্রয়োজন’ বলছেন সবাই, তবু নারীর ময়নাতদন্ত কেন পুরুষের হাতে

নিউজ ডেস্ক৩০ আগস্ট ২০২৬৭ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:


মর্গের দরজার বাইরে মরদেহের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে স্বজনেরা। ভেতরে পড়ে থাকা নিথর দেহটি কারো মা, কারো বোন অথবা কারো স্ত্রী। অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ময়নাতদন্ত করা হবে এটা তারা জানেন। তবুও আপনজন হারানোর শোক ছাপিয়ে স্বজনদের মনে দেখা দেয় অস্বস্তি আর শঙ্কা। কেননা, ভেতরে পড়ে থাকা নিথর নারী শরীরের ব্যবচ্ছেদে সহায়তা করছেন একজন পুরুষ ডোম।

স্বজন, ডোম, উন্নয়নকর্মী থেকে শুরু করে হাসপাতালসংশ্লিষ্টরাও বলছেন, নারী মরদেহের ময়নাতদন্তে নারী ডোম থাকা প্রয়োজন। তবু বছরের পর বছর ধরে সেই চাহিদা বাস্তবায়ন হয়নি। প্রশ্ন উঠছে, সবাই যখন প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করছেন, তাহলে নারী ডোম নিয়োগে বাধা কোথায়?

ময়নাতদন্তের সময় শোক, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে নারী মরদেহের ময়নাতদন্তে পুরুষ কর্মীদের উপস্থিতি নিয়ে পরিবারের মধ্যে তৈরি হয় অস্বস্তি ও শঙ্কা। কেউ প্রকাশ্যে আপত্তি জানান। কেউ সামাজিক বা ধর্মীয় কারণে প্রশ্ন তোলেন। আবার অনেকেই আইনি প্রক্রিয়ার কারণে নীরব থাকেন।

লালন শেখ বলেন, হত্যা মামলা হয়েছে। আসামি ধরা পড়েছে। কিন্তু ময়নাতদন্তের বিষয়টা নারী ডোম দিয়ে সম্পন্ন করলে ভালো হতো। রাজশাহী হাসপাতালে সব পুরুষ ডোম। নারীর শেষ যাত্রায় পুরুষের স্পর্শ বিষয়টা মোটেও ঠিক দেখায় না। মা-বোন সবারই রয়েছে। আমার চাওয়া সরকার যেন নারীদের ময়নাতদন্তের জন্য অন্তত একজন নারী ডোম নিয়োগ করেন। যাতে করে তারা নারীদের ময়নাতদন্তগুলো সম্পন্ন করতে পারে। এর ফলে ময়নাতদন্ত হওয়া নারীদের স্বজনদের মনে সংশয় থাকবে না।

মর্গের সামনে আশরাফ আলী নামের একজন নিহতের স্বজন বলেন, ময়নাতদন্ত দরকার জানি। আমরা বাধা দিচ্ছি না। কিন্তু অন্য নারীদের ক্ষেত্রে একজন নারী থাকলে অন্তত মনে হয় কাজটি আরও সম্মানের সঙ্গে হতো।

একজন ডোম বলেন, মর্গে নারী ডোম নেই। আমরাই চিকিৎসকের উপস্থিতিতে ময়নাতদন্তে সাহায্য করে থাকি। আমাদের সম্প্রদায়ের অনেক নারী আছেন, যারা এই কাজ করতে ইচ্ছুক। তবে আসলে তারা আদৌ এই কাজ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে নারীদের ময়নাতদন্তের জন্য নারী ডোম প্রয়োজন। এখানে পুরুষ ডোমদের নিয়োগেরই নিয়ম-কানুন ঠিক নেই। সেখানে নারী ডোম নিয়োগ, তাদের প্রশিক্ষণ এগুলো তো অনেক পরের কথা।

আট মাস আগে চাকরি থেকে অবসরে যান তপন কুমার। রামেক হাসপাতালের মর্গের সাবেক ডোম তপন কুমার বলেন, এখানে নিয়োগপ্রাপ্ত ডোম নেই। আউটসোর্সিং থেকে দেওয়া হয়। নারী ডোমও নেই। আমার চাকরি থাকা অবস্থায় আমি নারীদেরও ময়নাতদন্ত করেছি। তার মতে নারী ডোম থাকা উচিত।

মর্গের সাবেক ডোম তপন কুমারের মতে, তাদের সম্প্রদায়ের নারীরা এই কাজ করতে পারবেন। তবে তাদের আগে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অনেকেই এই পেশায় আসতে চান। কিন্তু নিয়োগ নেই। তাই তারা এই পেশায় আসতে পারেন না।

রাজশাহীর উন্নয়নকর্মী রাশেদ রিপন বলেন, ময়নাতদন্ত একটা আইনি প্রক্রিয়া। ময়নাতদন্ত কে করল, বিষয়টা বড় নয়। তবে মরদেহের সম্মান ও নিহতের পরিবারের আপত্তি থাকে। সেই জায়গা থেকে নারীদের ময়নাতদন্তের ক্ষেত্রে নারী কর্মী (ডোম) হলে ভালো হয়। কিন্তু বাস্তবচিত্র আলাদা। হাসপাতালে নারী ডোম নেই। এছাড়া এই পেশায় যারা আছেন তাদের বেতন সামান্য। তাদের বেতন কাঠামো ঠিক করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এনামুল হক বলেন, অবশ্যই নারীদের ময়নাতদন্তের ক্ষেত্রে নারী কর্মী থাকা উচিত। যদি পর্যাপ্তসংখ্যক নারী কর্মী পাওয়া না যায়, তাহলে অন্তত পুরুষ কর্মীদের পাশাপাশি নারী কর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ এ ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব জড়িত।

তিনি আরও বলেন, আমরা এর আগে এমন কিছু ঘটনার কথা জেনেছি, যেখানে নারী মরদেহের সঙ্গে যৌন আচরণের অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আমি মনে করি, নারীদের ময়নাতদন্তের ক্ষেত্রে অবশ্যই নারী ডোম বা সংশ্লিষ্ট নারী কর্মী থাকা প্রয়োজন। এতে মরদেহের প্রতি সম্মান বজায় রাখার পাশাপাশি স্বজনদের মধ্যেও আস্থা তৈরি হবে।

নারী ডোম নিয়োগে জট কোথায়

দেশের কয়েকটি হাসপাতাল ছাড়া সব হাসপাতালে ময়নাতদন্তের ক্ষেত্রে নারী ডোম নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, চাইলেই তাৎক্ষণিকভাবে নারী ডোম নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়। জনবল কাঠামো, নিয়োগবিধি এবং অনুমোদিত পদের বিষয় রয়েছে। তবে দ্রুতই নারী ডোম নিয়োগের কথা ভাবছেন তারা।

কলেজ কর্মকর্তার ভাষ্য, মর্গে নারী কর্মী নেই। মর্গ ব্যবস্থাপনায় নারী কর্মীর সংকট দীর্ঘদিনের। নতুন করে পদ সৃষ্টি ও নিয়োগের বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিবেচনা করা দরকার।

এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খন্দকার মো. ফয়সল আলম বলেন, হাসপাতালে পুরুষ ডোম দিয়ে ময়নাতদন্তের কাজ করানো হয়। ডোম নিয়োগ আউটসোর্সিং থেকে হয়। এবার আউটসোর্সিং থেকে দুইটা ডোম নেব। এর মধ্যে মহিলা ডোম নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, কোনো নারী মারা গেলেও তার তো সম্মান আছে, সে লাশ হোক। আমার বাড়ির এক কর্মচারী একবার আত্মহত্যা করেছিল। আমি ডোমদের জিজ্ঞাসা করলাম নারী ডোমের বিষয়ে। কিন্তু তারা জানালো নারী ডোম নেই। সোজা কথা আমরা সবাই চাই। এটা তো একটা স্বাভাবিক চাওয়া আমাদের। লাশেরও একটা সম্মান আছে।

এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, নারী ডোম নেই। তবে নারী ডোম নেওয়ার বিষয়টি আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।

নারী ময়নাতদন্তে নারী কর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হলে স্বজনদের মানসিক অস্বস্তি কমবে। একই সঙ্গে মর্গ ব্যবস্থাপনায় নারীদের কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ময়নাতদন্তের মতো সংবেদনশীল কাজে দক্ষতা ও পেশাদারত্বের পাশাপাশি মরদেহের প্রতি সম্মান, পরিবারের অনুভূতিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সাবেক একজন চিকিৎসক বলেন, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বলেন, আর সামাজিকভাবেই বলেন নারী ডোম দরকার। বর্তমানে ধর্ষণ ছাড়াও নারীদের বিভিন্ন বিষয়ের পরীক্ষাগুলো নারীদের দিয়ে করানো হয়। ময়নাতদন্তের বিষয়গুলো ভীতিকর। তাই এই কাজে নারী আসতে চায় না।

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ময়নাতদন্ত রাজশাহী জেলাতে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ করে। মেয়েরা ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে যেতে চায় না। মেয়ে ডক্টর একটা বড় ফ্যাক্টর। আর নারী ডোম পাওয়াও কঠিন। তবে কোনো নারী থাকলে আমাকে জানাবেন। কোন জেলায় সুযোগ থাকলে আমি ব্যবস্থা নেব।

তিনি আরও বলেন, ময়নাতদন্তে অবশ্যই নারী ডোম প্রয়োজন। একচুয়ালি ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টে আমাদের লোক আগ্রহী না। ফরেনসিকে ডক্টররা সাধারণত আগ্রহী থাকে না। নারীদের ময়নাতদন্তে নারী ডোম পেলে ভালো হয়।

বগুড়া জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম তুহিন বলেন, ময়নাতদন্ত ও ডোম পেশাটিকে কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে আধুনিক ও যুগোপযোগী হিসেবে পুনর্গঠন করা জরুরি। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অথচ এই সংবেদনশীল কাজটির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে দায়িত্ব পালন করে থাকেন, যা ন্যায়বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

তিনি আরও বলেন, পূর্বে আমাদের দেশে নারী পুলিশ বা নারী ডাক্তারদের অংশগ্রহণ সীমিত থাকলেও সময়ের প্রয়োজনে তা আজ প্রতিষ্ঠিত। একইভাবে ময়নাতদন্তের ক্ষেত্রে বিশেষ করে নারী মৃতদেহের সুরক্ষায় নারী নার্স ও নারী কর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। পেশাটিকে পেশাদার রূপ দেওয়া সময়ের দাবি। সরকারের উচিত উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, মর্যাদা ও উচ্চ বেতন কাঠামোর মাধ্যমে এই খাতে স্বচ্ছতা আনা। হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রুলকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, এই পেশায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকারকে অবিলম্বে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।