জাতীয়

নদীর স্রোতের মতো মান্তাদের ভোটাধিকারও

নিউজ ডেস্ক৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

আড়িয়াল খাঁর জলে তখন ভাটার টান। বরিশালের মুলাদীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদে নৌকাগুলো গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, যেন এর বুকে ভেসে ওঠা এক পাড়া। দূর থেকে ছবিটি শান্ত। তবে কাছে গেলে ভাঙে সেই ভ্রম।

শোনা যায় শিশুর কাশি, কোথাও কান্না, কোথাও হাঁকডাক। কাঠের এই নৌকাগুলোই মান্তা সম্প্রদায়ের ঘর। এখানেই জন্ম, এখানেই বড় হওয়া, এখানেই মৃত্যু তাদের।
‘পোলাপান পানিতে পড়তে না পারে, তার জন্য কোমরে রশি বেঁধে রাখি’ বলছিলেন এক মান্তা মা।

কথা বলতে বলতে তাঁর চোখ চলে যায় নদীর দিকে। একটু অসাবধান হলেই সন্তান হারানোর ভয়। সারা দিন নৌকায় বন্দি থাকা এই জীবনে নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই। না রাষ্ট্রের কাছ থেকে, না সমাজের।

ভোট এলেই আশ্বাস আসে- ঘর দেওয়া হবে, জায়গা দেওয়া হবে, ভোটার আইডি কার্ড হলে সুবিধা মিলবে। ভোট শেষ হলে আর কেউ ফেরে না। মান্তাদের অভিযোগ, ভোটার হয়েও তাঁরা অদৃশ্য। বাসস্ট্যান্ডের পাশে যদি একটু জায়গা মিলত, একটা স্থায়ী ঠাঁই, তাহলে হয়তো সন্তানদের স্কুলে পাঠানো যেত। কিন্তু ঠিকানাহীন জীবনে স্কুলের ফরমই হয়ে দাঁড়ায় সবচেয়ে বড় বাধা।

জলে ঘেরা এই জীবনে শিশুরা জন্মায় নৌকায়, বড় হয় রোদ-বৃষ্টিতে। অপুষ্ট শরীর, চোখে স্থায়ী আতঙ্ক। দুর্যোগ এলে আশ্রয় মেলে না কোথাও। ডাঙা যেন অন্যদের জন্য, মান্তাদের জন্য নয়।

বরিশাল সদরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা কীর্তনখোলা নদীতীরে সারি করে বাঁধা নৌকার একটিতে তানজুয়ার দেখা মিলল। বললেন, ‘আমরা সব সময়ই সুরক্ষার বাইরে। সন্তানের স্কুলে ভর্তি হতে লাগে ঠিকানা, লাগে মাটির ওপর মাথা গোঁজার একটা ঘর। সেই ঘর না থাকায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম আটকে যাচ্ছে নৌকাতেই।

ইলিয়াস মান্তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। তিন বছর বয়সী ছেলেটাকে হারিয়েছেন পানিতে। সেই বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘রাতে ঘুমাইছি। সকালে উঠি দেখি ছেলে নাই। পানিতে পড়ে গেছে। তিন দিন পর লাশ পাইছি।’ চোখ মুছতে গিয়ে বলেন, সরকার একবার একটা ঘর দিতে এসেছিল। কিন্তু আমার জীবন তো ঘরে ধরা পড়ে না।

মান্তা সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করা চন্দ্রদ্বীপ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ আলী জীবন জানান, বরিশাল সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে তিন শতাধিক মান্তা পরিবার রয়েছে। এক হাজার দুই শতাধিক মানুষের মধ্যে ভোটার হয়েছেন মাত্র ৩৫০ জন। এ বছর নতুন করে যুক্ত হয়েছেন আরো ২৮ জন।

মেহেন্দীগঞ্জ, বাবুগঞ্জ, দপদপিয়া ফেরিঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় থাকা আরো চার শতাধিক মান্তা পরিবারের অবস্থাও একই। সব মিলিয়ে বরিশাল জেলায় তিন হাজারের বেশি মান্তা মানুষের মধ্যে ভোটাধিকার পেয়েছেন প্রায় অর্ধেক। তবু এই ভোটাররা কোনো প্রার্থীর নির্বাচনী হিসাবের ভেতর ঢুকতে পারেননি।

সমাজসেবা দপ্তর বলছে, এই প্রথমবার মান্তা সম্প্রদায়ের পরিবারের ৫০ জন সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার আওতায় এসেছেন। তবে তাঁদের মোট সংখ্যা বা ভোটারের সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো নির্ধারিত হয়নি।

জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক আকতারুজ্জামান তালুকদারের কথায়, তাঁদের সঠিক সংখ্যা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

বরিশাল জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে ভোটার ২২ লাখের বেশি। সেই বিশাল সংখ্যার ভেতর মান্তা ভোটাররা শুধু কয়েকটি নাম। আলাদা কোনো পরিচয় নেই, আলাদা কোনো গুরুত্বও নেই।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সম্পাদক রফিকুল আলম মনে করেন, নদীর স্রোতের মতোই মান্তাদের ভোটাধিকারও ভাসমান। তালিকায় নাম উঠেছে, কিন্তু নাগরিক স্বীকৃতির জায়গায় তারা এখনও পৌঁছাতে পারেননি। ভোটাধিকার তাদের জীবনের চক্র ভাঙার সুযোগ এনে দিতে পারত।

২০০৮ সালে ভোটাধিকার পেয়েছে মান্তা সম্প্রদায়। নাগরিক সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল। বাস্তবে তা মেলেনি। রাশিদা বলছিলেন, ‘কোনো নাম নাই, ছবি নাই; কিছুই দেয় না।’ শীত পেরিয়ে গেছে, একটা কম্বলও জোটেনি। অসুখ হলে নদীর পানিই ভরসা।

আড়িয়াল খাঁর স্রোত বয়ে চলে। নৌকাগুলোও ভাসে, এক জায়গায় থামে না। মান্তাদের জীবনও তেমনই। কাগজে তারা নাগরিক, বাস্তবে এখনো নদীর মানুষ। যেখানে ভোটাধিকার আছে, কিন্তু আশ্রয় নেই। যেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি শোনা যায় শুধু নির্বাচনের মাইকে, নদীর পাড়ে নয়।