সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
সব ধর্মের মধ্যে বিভেদের একটা বড় কারণ হচ্ছে : আমরা ধর্মগ্রন্থগুলো পড়ছি না। (কিছু মানুষ পড়লেও বুঝেশুনে পড়ছে না) মুসলমান হয়ে কেবল কোরআন পড়ছি।
ইঞ্জিল পড়ছি না বা বেদ-গীতা কখনও পড়ছি না। হিন্দুরা বেদ-গীতা পড়ছেন কিন্তু কোরআন পড়ছেন না কখনও। অর্থাৎ সত্য (হক) অনুসন্ধানে আমরা রাজি নই। বরং স্থানবিশেষে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা করছি। কেবল অর্থবিত্তের দিকে ছুটছি।

নবী মোহাম্মদের (সা.) আদর্শ কী এবং কেন পৃথিবীতে ছিলেন আমরা অনুসন্ধান না করে তাকে ভালোবাসছি ঠোঁটে ঠোঁটে। সমালোচনা করছি কেউ কেউ। আমার বিশ্বাস নবী (সা.)কে জেনেশুনে বুঝে ভালোবাসলে অন্য ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করার কথা নয়।
অন্য ধর্মের মানুষও প্রিয়তম নবীর আদর্শকে ভালো লাগার কথা। কোরআনও সেই রকম। বুঝে, জেনে পড়লে আদর্শ মানুষ হতে বাধ্য। অন্য ধর্মের মানুষকে ঘৃণা বা হিংসা করার কথা নয়।
ইমাম গাজ্জালী (র.) এহইয়াউলউলুমুদ্দিন গ্রন্থে বলেছেন, কোরআন কেবল মুখে উচ্চারণ করে আর না বুঝে পড়ার জন্য নয়। কোরআন পাঠ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে : অর্থ বুঝা এবং চিন্তাভাবনা করা। এ কারণেই কোরআন থেমে থেমে পড়া সুন্নত। (২য় খণ্ড, অনুবাদ মাও. মহিউদ্দিন খান)।
সুফি সাধক গাজ্জালী (র.) আরও বলেছেন, হাদিসে এসেছে : যে পর্যন্ত কোরআন তোমাকে মন্দ কাজ করতে বারণ না করে, সে পর্যন্ত কোরআন পড়তে থাক। কোরআনের তেলাওয়াত মন্দ কাজে বাধা না দিলে তুমি কোরআন তেলাওয়াত কর না।
অর্থাৎ এ রকম পড়া না পড়া সমান। (এহইয়াউলউলুমুদ্দিন, ২য় খণ্ড, অনুবাদ মহিউদ্দিন খান)।
সত্যি বলতে কি আমরা সবাই এক ধর্মের, এক পিতার, এক মাতার সন্তান ছিলাম। একশ্রেণীর মৌলভী যাজক, ব্রাহ্মণ, শাসক ব্যক্তিগত লোভ এবং লাভের জন্য তারা ধর্মে ধর্মে বিরোধ এবং মতভেদ সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, হিন্দুধর্ম ও ইসলাম ধর্মে কোনো পার্থক্য ছিল না। তাদের চিন্তাচেতনা এক ও অদ্বিতীয় ছিল। আল্লাহতায়ালার দিকে প্রসারিত ছিল সবাই। আজকের বিভেদগুলো পরবর্তীকালের স্বার্থ হাসিলের সংযোজন মাত্র। খ্রিস্টান, ইহুদি ধর্মেও তাই।
ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ আরও বলেছেন, দশম শতকের বিখ্যাত পণ্ডিৎ অভিনব গুপ্ত তার সম্পাদিত শ্রীমতভগবৎ গীতায় হিন্দু অবতারবাদকে সমর্থন করে একটি শ্লোক ছিল : যদাযদাহি ধর্মস্য গ্লানির্ভরতে ভারত/অভ্যুত্থানম ধর্মস্য ‘তদাত্মংশ’ সৃজম্যতম। (গীতা চতুর্থ অধ্যায়, ৭ম শ্লোক) পরবর্তীকালে ওই শ্লোকটি পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়ায় : যদাযদাহি ধর্মস্য গ্লানির্ভবর্তে ভারত/অভ্যুত্থানম ধর্মস্য ‘তদাত্মাং’ সৃজম্যহম। শ্লোকটির অর্থ যখনি ধর্মে গ্লানি উপস্থিত হয় সংস্থাপন অর্থে শ্রী ভাবনা আত্মার অংশে (সৃষ্ট) অবতার প্রেরণ করেন।
পরবর্তী অর্থে সেখানে হয়েছে- ‘যখনি ধর্মে গ্লানি উপস্থিত হয় ধর্ম সংস্থাপনার্থে শ্রীভগবান স্বয়ং অবতাররূপে অবতীর্ণ হন। ফলে সৃষ্টিকর্তার স্থান থেকে নেমে এসে সৃষ্টবস্তুর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান।’ (ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ : শতবর্ষপূর্তি স্মারকগ্রন্থ পৃ. ৫৬)।
ধর্মের বিখ্যাত দার্শনিক ও ফকির বলে খ্যাত লালন বলেন, যেহি মুরশিদ সেই তো রাসূল ইহাতে কোন ভুল/খোদাওসে হয়। লালন কয় না এমন কথা কোরআনে কয়।
আরও বলেন, আপনি খোদা/আপনি নবী/আপনি হন আদম সফি/অনন্তরূপ ধারণ করে কে বুঝে তার লীলার কারণ/নিরাকার শাহ নিরঞ্জন মুর্শিদ রূপ হয় ভজন পথে/ (লালন দর্শন, লেখক, আবদেল মান্নান পৃ. ২৪ পৃ. ২৩৯)। এরকম বহু উদাহরণ দেয়া যায়।
আমরা সুস্থ সুন্দর পৃথিবী গড়ার প্রত্যয় নিয়ে থাকব। এবং কোরআন বুঝে পড়ব ও সব ধর্মের মানুষকে ভালোবাসব। মন্দ কাজ থেকে ফিরে থাকব বলে আল্লাহতায়ালার কাছে তৌফিক প্রার্থনা করব।
লেখক : প্রাবন্ধিক
যুগান্তর









