সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
সময়কে গল্পের অংশ বানিয়ে সিনেমা নির্মাণে এক নতুন ভাষা তৈরি করেছেন ক্রিস্টোফার নোলান। ‘মেমেন্টো’, ‘দ্য ডার্ক নাইট’, ‘ইনসেপশন’, ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘টেনেট’, ‘ওপেনহাইমার’ থেকে সর্বশেষ ‘দ্য অডিসি’—প্রতিটি চলচ্চিত্রেই তিনি দর্শকদের দিয়েছেন ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) অস্কারজয়ী এই ব্রিটিশ নির্মাতার জন্মদিন। এ উপলক্ষে ফিরে দেখা যাক তার সাফল্যের পথচলা।

১৯৭০ সালের ৩০ জুলাই লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারে জন্ম নোলানের। মাত্র সাত বছর বয়সে বাবার দেওয়া একটি সুপার–৮ ক্যামেরা হাতে পান তিনি।
সেই ক্যামেরায় খেলনা দিয়ে ছোট ছোট চলচ্চিত্র বানানোর মধ্য দিয়েই শুরু হয় তার সিনেমার প্রতি ভালোবাসা। পরে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন।
চলচ্চিত্র নিয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম সোসাইটিতে কাজ করতে গিয়েই নির্মাণশৈলী রপ্ত করেন। এমনকি একসময় ফিল্ম স্কুলে আবেদন করেও সুযোগ পাননি।
তবে ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে নিজের পথ নিজেই তৈরি করেন তিনি।
খুবই স্বল্প বাজেটে নির্মিত তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ফলোয়িং’ সমালোচকদের নজর কেড়েছিল। তবে বিশ্বজুড়ে তাঁকে পরিচিতি এনে দেয় ‘মেমেন্টো’। স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত এক ব্যক্তির গল্প উল্টো সময়রেখায় তুলে ধরে চলচ্চিত্রটি দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায় এবং অস্কারের মনোনয়নও পায়।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
‘ব্যাটম্যান বিগিনস’ এবং ‘দ্য ডার্ক নাইট’ দিয়ে সুপারহিরো চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেন তিনি। ‘ইনসেপশন’-এ স্বপ্নের ভেতর স্বপ্ন, ‘ইন্টারস্টেলার’-এ মহাকাশ ও সময়ের আপেক্ষিকতা, ‘টেনেট’-এ সময়ের বিপরীত প্রবাহ—প্রতিটি সিনেমাতেই নোলান প্রমাণ করেছেন, জটিল গল্পও দর্শকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা সম্ভব।
২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ওপেনহাইমার’ তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় সাফল্য। ছবিটি সাতটি অস্কার জেতে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এই সিনেমার জন্যই প্রথমবারের মতো সেরা পরিচালক এবং সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার জেতেন নোলান। বক্স অফিসেও ছবিটি রেকর্ড গড়ে।
এ বছরের সবচেয়ে আলোচিত সিনেমাগুলোর একটি ‘দ্য অডিসি’। হোমারের মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্র মুক্তির পর অল্প সময়েই বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করেছে। বিশাল বাজেট, আইম্যাক্স ক্যামেরায় চিত্রায়ণ এবং বাস্তব লোকেশনে শুটিংয়ের কারণে ছবিটি শুরু থেকেই আলোচনায় রয়েছে। অনেকের ধারণা, এটি নোলানের আগের বক্স অফিস রেকর্ডও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
নোলানের নির্মাণশৈলীর বড় বৈশিষ্ট্য হলো বাস্তবতার প্রতি তাঁর আস্থা। কম্পিউটারনির্ভর দৃশ্যের বদলে তিনি বাস্তব লোকেশন, ব্যাবহারিক ভিজুয়াল ইফেক্টস এবং ৭০ মিলিমিটার আইম্যাক্স ক্যামেরায় কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তি গল্প বলার সহায়ক হতে পারে, কিন্তু গল্পের বিকল্প নয়।
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি বেশ ব্যতিক্রমী। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে নোলান জানিয়েছেন, তিনি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না এবং ব্যক্তিগতভাবে ই-মেইলও ব্যবহার করেন না। দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ দিয়ে কাজ করার জন্য তিনি নিজেকে নোটিফিকেশন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যস্ততা থেকে দূরে রাখেন।
বিশ্বখ্যাত এই নির্মাতার দীর্ঘদিনের সহযাত্রী তাঁর স্ত্রী এমা থমাস। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের পরিচয় থেকে শুরু হওয়া এই সম্পর্ক এখন হলিউডের অন্যতম সফল পরিচালক-প্রযোজক জুটিতে পরিণত হয়েছে। নোলানের অধিকাংশ চলচ্চিত্রের প্রযোজকও এমা।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আর্থিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্রিস্টোফার নোলানের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে ৩০ থেকে ৪০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার সমান। চলচ্চিত্র পরিচালনা, চিত্রনাট্য লেখা, প্রযোজনা এবং সিনেমার লাভের অংশ থেকেই এসেছে তাঁর এই সাফল্য।
জন্মদিনে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে এমন এক নির্মাতার নাম, যিনি প্রতিটি চলচ্চিত্রে দর্শকদের শুধু বিনোদনই দেন না, বরং নতুনভাবে ভাবতেও শেখান। ‘ওপেনহাইমার’-এর ঐতিহাসিক সাফল্যের পর ‘দ্য অডিসি’ দিয়েও তিনি প্রমাণ করেছেন, বিশ্ব সিনেমায় তাঁর অবস্থান এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী।









