সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
মানুষের স্বাভাবিক বিকাশ প্রক্রিয়া অনুযায়ী, একটি শিশু জন্মের পর কথা বলতে দীর্ঘ সময় নেয়। কান্না আর অস্পষ্ট ধ্বনি ছাড়া তাদের ভাব প্রকাশের কোনো মাধ্যম থাকে না। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু বিস্ময়কর ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে সদ্যোজাত বা দুগ্ধপোষ্য শিশু মায়ের কোলে কিংবা দোলনায় শুয়ে বড়দের মতো স্পষ্ট ভাষায় কথা বলেছে। এই ঘটনাগুলো শুধু অলৌকিকতাই নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে সত্যের সাক্ষ্য, নির্দোষের মুক্তি এবং আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা।
এই প্রবন্ধে আমরা সেই অলৌকিক শিশুদের ঘটনা আলোচনা করব।
১. ঈসা (আ.)-এর বিস্ময়কর সাক্ষ্য

দোলনায় কথা বলা শিশুদের মধ্যে সর্বপ্রধান এবং সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাটি হলো আল্লাহর নবী ঈসা (আ.)-এর। পবিত্র কোরআনে এই ঘটনা অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণিত হয়েছে। মারইয়াম (আ.) যখন আল্লাহর হুকুমে পিতা ছাড়াই ঈসা (আ.)-কে গর্ভে ধারণ করেন এবং প্রসবের পর সন্তান নিয়ে লোকালয়ে ফিরে আসেন, তখন তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁকে ঘিরে ধরে।
তারা মারইয়াম (আ.)-এর সতীত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং কঠোর ভাষায় তিরস্কার করতে থাকে। তারা বলতে থাকে, ‘হে হারুন-ভগ্নি! তোমার পিতা তো অসৎ ব্যক্তি ছিলেন না এবং তোমার মাতাও তো ব্যভিচারিণী ছিলেন না।’
লজ্জা, অপমান ও আল্লাহর নির্দেশে মারইয়াম (আ.) তখন কোনো কথা না বলে শুধু কোলের শিশুটির দিকে ইশারা করলেন। লোকেরা অবাক হয়ে বলল, ‘আমরা কেমন করে এমন শিশুর সঙ্গে কথা বলব, যে দোলনায় আছে?’
ঠিক সেই মুহূর্তে, আল্লাহর অসীম কুদরতে সদ্যোজাত শিশু ঈসা (আ.) মায়ের সতীত্বের প্রমাণ দিয়ে এবং নিজের নবুয়তের ঘোষণা দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলে উঠলেন, ‘আমি তো আল্লাহর বান্দা! তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন।
আমি যেখানেই থাকি না কেন, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যত দিন জীবিত থাকি, তত দিন যেন নামাজ ও জাকাত আদায় করি এবং আমাকে আমার মায়ের প্রতি অনুগত করেছেন; তিনি আমাকে উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি। আমার প্রতি শান্তি, যেদিন আমি জন্ম লাভ করেছি, যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন আমি জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হবো।’
(সুরা : মারয়াম, আয়াত : ২৭-৩৩)
২. জুরাইজ ও অপবাদ খণ্ডনকারী শিশু
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত বনি ইসরাঈলের এক বিখ্যাত সাধক ছিলেন জুরাইজ। তিনি তাঁর ইবাদতখানায় সব সময় ইবাদতে মগ্ন থাকতেন।
একবার এক দুশ্চরিত্রা নারী জুরাইজকে পাপে লিপ্ত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে সে এক রাখালের সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হয় এবং গর্ভবতী হয়। সন্তান প্রসবের পর সে দাবি করে যে এই সন্তান জুরাইজের। এ কথা শুনে এলাকার লোকেরা ক্ষিপ্ত হয়ে জুরাইজের ইবাদতখানা ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয় এবং তাঁকে অপমান করতে থাকে। জুরাইজ শান্তভাবে অজু করে নামাজ আদায় করলেন এবং শিশুটির কাছে গিয়ে তার পেটে মৃদু খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে শিশু! বলো তো তোমার পিতা কে?’ আল্লাহর কুদরতে সেই দুগ্ধপোষ্য শিশুটি শত শত মানুষের সামনে স্পষ্ট ভাষায় জবাব দিল, ‘আমার পিতা হলো অমুক রাখাল।’ এ কথা শুনে উপস্থিত জনতা হতভম্ব হয়ে গেল। তারা তাদের ভুলের জন্য লজ্জিত হলো এবং জুরাইজের কাছে ক্ষমা চাইল। তারা তাঁর ইবাদতখানা সোনা দিয়ে পুনর্নির্মাণ করে দিতে চাইল, কিন্তু জুরাইজ তা মাটিতেই ফিরিয়ে দিতে বললেন। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের সম্মান রক্ষায় অবুঝ শিশুকেও বাক্শক্তি দান করতে পারেন।
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৪৩৬)
৩. মায়ের দোয়ার সংশোধনী দেওয়া শিশু
সহিহ হাদিসে বর্ণিত আরেকটি ঘটনা হলো এক ইসরায়েলি মা ও তাঁর শিশুর। একদিন মা তাঁর কোলের শিশুকে দুধ পান করাচ্ছিলেন। এমন সময় তাদের পাশ দিয়ে এক সুঠামদেহী, জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিহিত অশ্বারোহী ব্যক্তি যাচ্ছিল। তাকে দেখে মা মুগ্ধ হয়ে দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! আমার এই সন্তানকেও এই অশ্বারোহীর মতো বানিও।’ মায়ের এই কথা শোনামাত্রই শিশুটি দুধ পান করা ছেড়ে দিল এবং অশ্বারোহীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হে আল্লাহ! আমাকে এর মতো বানিয়ো না।’ এরপর সে আবার দুধ পান করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর, সেই পথ দিয়ে কিছু লোক এক দাসীকে মারধর করতে করতে নিয়ে যাচ্ছিল। লোকেরা বলছিল, এই নারী চুরি করেছে এবং ব্যভিচার করেছে। সেই দাসীটি বলছিল, ‘আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট।’ এই দৃশ্য দেখে মা দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে এই দাসীর মতো বানিও না।’ তখন শিশুটি আবার দুধ পান ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘হে আল্লাহ! আমাকে এর মতোই বানিও।’ মা অবাক হয়ে এর কারণ জানতে চাইলেন। তখন আল্লাহ শিশুটিকে পূর্ণ বাক্শক্তি ও জ্ঞান দান করলেন। শিশুটি ব্যাখ্যা করে বলল, ‘মা, ওই অশ্বারোহী ব্যক্তিটি ছিল একজন অত্যাচারী ও অহংকারী পাপিষ্ঠ, তাই আমি তার মতো হতে চাইনি। আর এই দাসীটি, যাকে চোর ও ব্যভিচারিণী বলা হচ্ছে, সে আসলে কিছুই করেনি; সে নির্দোষ ও সতীসাধ্বী। তাই আমি আল্লাহর কাছে তার মতোই পবিত্র হতে চেয়েছি।’ এ ঘটনা আমাদের শেখায় যে বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে মানুষের মর্যাদা বিচার করা উচিত নয়। আল্লাহর কাছে তাকওয়াই হলো শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৫০)
৪. আসহাবে উখদুদ বা গর্তের আগুনের ঘটনা
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত ‘আসহাবে উখদুদ’ বা গর্তওয়ালাদের কাহিনিতেও এক অলৌকিক শিশুর কথা পাওয়া যায়। এক জালিম বাদশাহ ঈমানদারদের আগুনের গর্তে ফেলে হত্যা করছিল। ঈমানদাররা হাসিমুখে শাহাদাত বরণ করছিলেন, কিন্তু ঈমান ত্যাগ করছিলেন না। এক পর্যায়ে এক মহিলা তাঁর কোলের শিশুসন্তানকে নিয়ে গর্তের কিনারে এসে দাঁড়ালেন। আগুনের ভয়াবহতা দেখে এবং কোলের সন্তানের মায়ায় তিনি আগুনের গর্তে ঝাঁপ দিতে ইতস্তত করছিলেন। তিনি পিছিয়ে আসছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর কোলের দুগ্ধপোষ্য শিশুটি বলে উঠল, ‘হে মা! ধৈর্য ধারণ করো। কেননা তুমি সত্যের ওপর আছো।’ শিশুর মুখে এই অভয়বাণী শুনে মায়ের দ্বিধা কেটে গেল এবং তিনি সন্তানের সঙ্গে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে শাহাদাত বরণ করলেন। এই শিশুটি আল্লাহর দ্বিনের ওপর অবিচল থাকার এক মহান বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩০০৫)
৫. ইউসুফ (আ.)-এর নির্দোষিতার সাক্ষী
যদিও এ বিষয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে মতভেদ আছে, তবু অনেক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে ইউসুফ (আ.) যখন জুলাইখার ষড়যন্ত্রের শিকার হন এবং আজিজ মিসর তাদের দরজায় দেখে ফেলেন, তখন ইউসুফ (আ.)-এর নির্দোষিতা প্রমাণের জন্য পরিবারের এক সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নারীর পরিবারের একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিল…।’
(সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ২৬-২৭)
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে যে এই সাক্ষী ছিল দোলনায় থাকা এক শিশু। সে বলেছিল, যদি ইউসুফের জামা সামনের দিক থেকে ছেঁড়া হয়, তবে নারী সত্য বলছে, আর যদি পেছন থেকে ছেঁড়া হয়, তবে ইউসুফ সত্যবাদী।
উপরোক্ত ঘটনাগুলো নিছক কোনো গল্প বা উপকথা নয়। এগুলো কোরআন ও হাদিসের দলিলে প্রমাণিত সত্য ইতিহাস। এই ঘটনাগুলো আমাদের সামনে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা বা কুদরতের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দিন। আমিন।









