ধর্ম

দারিদ্র্য ও ধর্মের লড়াই

নিউজ ডেস্ক২৮ নভেম্বর ২০১৯৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

পশ্চিম আফ্রিকার খ্রিস্টানশাসিত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বুরকিনা ফাসো। ১৯৬০ সালে ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা পাওয়া দেশটির আগের নাম ছিল আপার ভোল্টা। ১৯৮৫ সালে সেই নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বুরকিনা ফাসো বা ‘নৈতিক জাতির দেশ’। দেশটির রাজধানী উয়াগাদুগু একটি আধুনিক শহর। দুই কোটি জনসংখ্যার দেশটি আফ্রিকার অন্যতম দরিদ্র রাষ্ট্র। খরা ও দুুর্ভিক্ষের কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার লোক প্রতিবেশী ঘানা, আইভরি কোস্টসহ অন্যান্য দেশে পাড়ি জমায়। নয়-দশমাংশ লোকই এখানে কৃষিকাজ ও গবাদি পশু পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে।

দেশটির লোকজন ‘বুরকিনাবে’ নামেই সমধিক পরিচিত। দাপ্তরিক ভাষা ফরাসি হলেও দেশটির বেশির ভাগ লোকই মোরে ভাষায় কথা বলে। এ অঞ্চলের গোড়াপত্তনকারী মোসি জাতির নিজস্ব ভাষা এটি। সংখ্যায় এরা মোট জনসংখ্যার অর্ধেক হলেও আরো বিভিন্ন গোষ্ঠী-ভাষা এখানে বিদ্যমান। অর্ধেকের বেশি লোক মুসলমান। এক-পঞ্চমাংশ ক্যাথলিক খ্রিস্টান এবং এক-ষষ্ঠাংশ প্রথাগত ধর্মের অনুসারী হলেও বাকি লোকজন প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টান তথা অধার্মিক।

স্বাধীনতা লাভের পর থেকে একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে বুরকিনা ফাসো রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে গেছে। ১৯৯১ সালে সংবিধান প্রণয়ন করে এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তবে গত ১৯ জানুয়ারি দেশটির প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে আবার অস্থিরতা তৈরি হয়।

 

ইসলামের আগমন

ইসলামের প্রথম যুগেই বুরকিনা ফাসোতে ইসলামের আগমন ঘটে। তখন অবশ্য এটি আলাদা ভূখণ্ড ছিল না। বরং ঘানার অন্তর্ভুক্ত ছিল। নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে এ অঞ্চলের ইসলামের ইতিহাস। তাই বুরকিনা ফাসোতে ইসলামের আগমনে তিনটি পর্যায়ের কথা ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন।

প্রথম পর্যায় : ৬৪০ থেকে ১০৫০ খ্রিস্টাব্দ। মিসরসহ উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো জয় করার পর মুসলিম সেনাবাহিনী পশ্চিম আফ্রিকার দিকে অগ্রসর হয়। রোমান সৈন্যদের পরাজিত করে তারা এ অঞ্চলে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করেন। রোম সাম্রাজ্যের সহযোগী স্থানীয় জাতিগোষ্ঠী বিশেষত বার্বার জাতির পরাজয়ও নিশ্চিত হয় এ যুদ্ধে। তবে বার্বার জাতির ইসলাম গ্রহণের আশায় মুসলমানরা তাদের সঙ্গে সন্ধি করে নেয়।

দ্বিতীয় পর্যায় : দশম শতাব্দীর শেষের দিকে বার্বার জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান, রোমান সৈন্যদের আক্রমণ এবং মরক্কোর শাসকদের ষড়যন্ত্রের কারণে এ অঞ্চলে ইসলামের অগ্রযাত্রা থেমে যায়। তবে একাদশ শতকে মুরাবিতিন তথা আফ্রিকান মুসলিমদের সম্মিলিত প্রয়াসে বার্বার জাতির একটি বড় অংশ ইসলাম গ্রহণ করে। ফলে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত তাদের হাতেই এ অঞ্চলে ইসলামের ব্যাপক প্রচার-প্রসার ঘটে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বার্বার জাতি ১০৭৬ খ্রিস্টাব্দে ঘানার শাসকদের পরাজিত করে ক্ষমতা হাতে নেয়। ফলে তাদের মাধ্যমে অনেক মানুষই ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেয়।

তৃতীয় পর্যায় : অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে ইসলামী ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে এ অঞ্চলে ইসলামের পুনরুত্থান ঘটে। আফ্রিকার অনেক মুসলিম শাইখ ও দাঈ এখানে ইসলামের পুনর্জাগরণে মনোযোগী হন। তাঁদের মধ্যে শাইখ উসমান ডানফোডিয়ো, মুহাম্মদ আমিন কানিমি, হাজি উমর ইবনে ইদরিস, মুহাম্মদ আল-মাহদির নাম বুরকিনা ফাসোসহ পশ্চিম আফ্রিকার ইসলামের ইতিহাসে সোনালি হরফে লেখা থাকবে।

 

মুসলমানদের হালচাল

১৯১৯ সালে বুরকিনা ফাসো ফ্রান্সের উপনিবেশে পরিণত হলে মুসলমানদের পতন হয়। রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে পিছিয়ে পড়ে তারা। ষাটের দশকে ফ্রান্স দেশ ছাড়লেও এ দেশের মুসলমানদের ভাগ্যোন্নয়ন হয়নি। মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও তারা সংখ্যালঘু খ্রিস্টান শাসকগোষ্ঠীর করতলে শাসিত ও নির্যাতিত হয়ে আসছে। উপনিবেশকাল থেকে সরকারি স্কুলগুলোতে ফরাসি কৃষ্টি-কালচার পাঠ্য হওয়ায় মুসলমানরা তা থেকে দূরে থাকে। ফলে খ্রিস্টানরা দখল করে নেয় প্রশাসন, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ময়দান।

প্রাচীনকাল থেকে বুরকিনা ফাসোতে গ্রাম্য মক্তবভিত্তিক ধর্মশিক্ষা চালু ছিল। উপনিবেশকালে সরকারি স্কুলের বিকল্প হিসেবে মুসলমানরা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে এ দুটি শিক্ষাব্যবস্থাই চালু আছে। তবে মক্তবভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় স্থানীয় ভাষায় কোরআন-হাদিস ও ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা দেন প্রথাগত ধর্মশিক্ষকরা। পক্ষান্তরে মাদরাসাগুলোতে আরবি ভাষা শেখানোর মাধ্যমে ইসলামের উৎস-জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত করানো হয়। তবে দারিদ্র্যের কারণে এ দেশের মানুষ লেখাপড়ার তেমন সুযোগ পায় না। সাম্প্রতিককালে অল্পসংখ্যক মুসলিম তরুণ মাদরাসাগুলো থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর শেষ করে আরববিশ্বে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমাচ্ছেন। ফলে মুসলমানদের ধর্ম শিক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। এ ছাড়া স্থানীয় মিডিয়াগুলোতেও ইসলামী শিক্ষা গুরুত্ব পাচ্ছে।

আকিদা-বিশ্বাসে বুরকিনা ফাসোর মুসলমানরা শতভাগ সুন্নি। অবশ্য সঠিক জ্ঞানের অভাবে ধর্মীয় কুসংস্কারও আছে অনেকের মধ্যে। মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো বহুধা বিভক্ত। প্রত্যেক দলই অবশ্য মুসলিম সরকার ক্ষমতায় আনার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

 

মিশনারির দৌরাত্ম্য

দারিদ্র্য-মন্দার দেশ বুরকিনা ফাসোর মুসলমানরা সামাজিকভাবে অনেকটাই কোণঠাসা। মসজিদ নির্মাণ করতে চাইলেও মিশনারিগুলো বাধা সৃষ্টি করে। খ্রিস্টান সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় দেশজুড়ে তারা খুবই শক্তিশালী অবস্থানে আছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের যেন কোনো অধিকারই নেই! মুসলমানদের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে তাদের ঈমান-আমল ধ্বংস করার কাজে মিশনারিগুলো বেশ তৎপর। দেশের রাজনীতি থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যেও তাদের একচেটিয়া আধিপত্য। মুসলমানদের খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ১৯৮৪ সালে দেশটির নাম আপার ভোল্টা থেকে বুরকিনা ফাসো করা হয়। এর অর্থ হলো নৈতিক জাতি তথা খ্রিস্টানদের দেশ।

মিশনারি স্কুলগুলোতে ছাত্রদের খাবার, পোশাকসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিনা মূল্যে সরবরাহ করা হয়। ফলে দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিষ্ট মুসলিম সন্তানরাও সেখানে ভর্তি হতে বাধ্য হয়। স্কুলগুলোতে ভর্তির পূর্বশর্তই হলো মুসলিম নাম বাদ দিয়ে খ্রিস্টান নাম গ্রহণ করা। সেসব স্কুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার ফলে মুসলমানদের মধ্যে খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি সখ্য বাড়ছে।

কেউ খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করলে তার জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি—সবই মিশনারির পক্ষ থেকে দেওয়া হয়। তা ছাড়া ইসলাম সম্পর্কে তাদের নানাভাবে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। ইসলামের বদনাম করে খ্রিস্টধর্মের মহত্ত্ব তাদের সামনে তুলে ধরা হয়।

আরো ভয়ংকর তথ্য হলো, বিশ শতকের শেষের দিকে বুরকিনা ফাসোতে সেবাপ্রতিষ্ঠানের ব্যানারে কাদিয়ানিরা পদার্পণ করে। ইসলামের কথা বলে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তারাও মিশনারির মতো অসহায় মুসলমানদের কথিত ‘আহমদিয়া মুসলিম জামাতে’ নাম লেখাচ্ছে।

দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মুসলিম দাতব্য প্রতিষ্ঠান বুরকিনা ফাসোতে কাজ করছে। তবে তা নিতান্তই নগণ্য। মুসলমানদের ঈমান-আকিদা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন নিশ্চিত করতে এখানে মুসলিম দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক অবদান রাখতে হবে।