ধর্ম

টাকায় ভোট কেনাবেচা—ইসলাম কী বলে?

নিউজ ডেস্ক১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬৩ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

ইসলামে ইবাদত শুধু মসজিদে সীমাবদ্ধ নয়; জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তই ইমান ও আমলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ব্যক্তি জীবনে নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদতে যত্নশীল হয়েও যদি কেউ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে, তবে তা দ্বীনের পূর্ণতা নির্দেশ করে না। ভোট তেমনই একটি দায়িত্ব—যেখানে সামান্য অসততা ভয়াবহ গুনাহে পরিণত হতে পারে।

অনেক মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা ব্যক্তিগত জীবনে নামাজ, রোজা, তাসবিহ-তাহলিলে যত্নবান হলেও ক্রয়-বিক্রয়, হালাল-হারাম, বিয়ে-তালাকসহ শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধানের ক্ষেত্রে উদাসীন থাকে। এই শ্রেণির মানুষের কাছে ভোট নিছক একটি জাগতিক বিষয়। ভোট দেওয়া বা নির্বাচনে অসততা—বিশেষ করে টাকার বিনিময়ে ভোট দেওয়াকে তারা গুনাহ মনে করে না।

ফলে ভোটের ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতার বদলে জাগতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। অযোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া হয়, আর যোগ্য ব্যক্তি তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। ব্যক্তিস্বার্থ, বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা, আঞ্চলিকতা ও দলাদলিকে পরকালীন জবাবদিহির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ তারা ভেবে দেখেন না—ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তারা কত বড় অন্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন।

ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে ভোট সাক্ষ্যস্বরূপ। আপনি যাকে ভোট দেন, তার পক্ষে আপনি এই সাক্ষ্য দেন যে—এই ব্যক্তি রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্য। আপনার বিবেচনায় তার চেয়ে যোগ্য আর কেউ নেই। সুতরাং সাক্ষ্যসংক্রান্ত শরিয়তের সব বিধিবিধান ভোটের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

অনেকে দ্বীনকে শুধু নামাজ-রোজায় সীমাবদ্ধ মনে করে। অথচ একজন ভোটার রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একজন সাক্ষ্যদাতা। আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ

“হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়ের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর জন্য সাক্ষীরূপে।”

— (সুরা নিসা : ১৩৫)

ভোট যখন সাক্ষ্যতুল্য, তখন সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রে কুরআনের নির্দেশনা অবশ্যই মানতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَىٰ وَبِعَهْدِ اللَّهِ أَوْفُوا

“আর যখন তোমরা কথা বলবে, তখন ইনসাফ করবে—যদিও সে আত্মীয় হয়। আর আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ কর।”

— (সুরা আল-আনআম : ১৫২)

একাধিক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যা সাক্ষ্যকে কবিরা গুনাহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং মিথ্যা সাক্ষ্যদাতার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। এই সতর্কতা ভোটের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য—বিশেষ করে যখন ভোট ব্যক্তিগত স্বার্থে বা অর্থের বিনিময়ে দেওয়া হয়।

অর্থের বিনিময়ে ভোট দিলে একসঙ্গে দুটি কবিরা গুনাহে লিপ্ত হতে হয়—

১. মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান

২. ঘুস গ্রহণ

কোনো মুমিনের জন্য ভোটকে নিছক জাগতিক বিষয় হিসেবে দেখা বৈধ নয়। একজন মুসলমান বিশ্বাস করে—পরকালে আল্লাহর সামনে সব মানুষকে দাঁড়াতে হবে এবং ভোটের ব্যাপারেও জবাবদিহি করতে হবে। সেদিন প্রশ্ন করা হবে—তোমার সাক্ষ্য প্রদানে তুমি কতটা দ্বীনদারি ও নৈতিকতা রক্ষা করেছ?

অনেকে যুক্তি দেখান—লাখ লাখ ভোটের ভিড়ে আমার এক ভোটের আর কী মূল্য? একটি ভোট ভুল দিলে দেশ বা জাতির কীই-বা ক্ষতি হবে? এই চিন্তা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। বাস্তবে একটি ভোটও কখনো কখনো নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে দেয়। আর একটি ভোটে নির্বাচিত একজন ভুল ব্যক্তি পুরো জাতির ভবিষ্যৎকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

একইভাবে, একটি ভোটে যদি একজন অযোগ্য ব্যক্তি নির্বাচিত হয়, তবে সেটিই পুরো জাতির দুর্ভাগ্যের কারণ হতে পারে। অন্যদিকে, যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিয়ে তিনি হেরে গেলেও ভোটদাতা আল্লাহর বিচারে দায়মুক্ত থাকবে—কারণ সে তার আমানতের হক আদায় করেছে।

ভোট কেবল একটি নাগরিক অধিকার নয়—এটি একটি ইমানি দায়িত্ব, একটি সাক্ষ্য ও একটি পবিত্র আমানত। টাকার বিনিময়ে ভোট দেওয়া শুধু রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা নয়, বরং আল্লাহর সামনে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার শামিল। তাই একজন সচেতন মুমিনের কর্তব্য হলো— কোনো প্রকার লোভ, চাপ বা পক্ষপাত ছাড়াই ন্যায়, যোগ্যতা ও আল্লাহভীতিকে সামনে রেখে ভোট দেওয়া। কারণ এক দিনের ভোটের সিদ্ধান্তের জবাব দিতে হবে চিরকালের আদালতে।

 

সূত্র: যুগান্তর