অর্থ ও বাণিজ্য

জনতা ব্যাংক এমডির অপসারণ প্রক্রিয়া শুরু

নিউজ ডেস্ক২৩ জানুয়ারি ২০২০৬ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির নামে অভিনব জালিয়াতি করেছে এনন টেক্স গ্রুপ। জার্মানি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া কোম্পানি খুলে জনতা ব্যাংক থেকে এলসির (ঋণপত্র) টাকা হাতিয়ে নিয়েছে গ্রুপটি। বাস্তবে এই গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউনূস বাদল নিজেই ওই কোম্পানিরও মালিক। এর সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা জার্মানির কোনো সম্পর্ক নেই। এই জালিয়াতিতে সরাসরি সহায়তা করেছেন জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবদুছ ছালাম আজাদ।

ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতার স্বার্থে এ ধরনের অপরাধীদের গ্রেফতারের জন্য সরকারের কাছে দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে এ সংক্রান্ত পরিদর্শন রিপোর্টের সুপারিশের পর জনতা ব্যাংকের এমডিকে অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুসন্ধানে মাঠে নামছে। এছাড়াও এই প্রক্রিয়ায় নতুন প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জড়িত রয়েছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

জানতে চাইলে দুদকের কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান বলেন, এই ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাথমিক তদন্তের কাজটি শেষ করেছে। সেই রিপোর্টটি আমরা পেয়েছি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এরপর অনুসন্ধান শুরু হবে। তদন্তের পর দেয়া হবে মামলা। তিনি বলেন, ঘুষ এবং দুর্নীতির মাধ্যমে মানিলন্ডারিং হয়ে থাকলে দুর্নীতি দমন কমিশনের আওতায় পড়ে। আইনে এ বিষয়ে দুদককে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, তার যথাযথ ব্যবহার করব আমরা।

এ বিষয়ে ইউনূস বাদলের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি সাড়া দেননি। এরপর প্রতিবেদনের বিষয় তাকে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে জানানো হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফের টেলিফেনের পরও তিনি তা রিসিভ করেননি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরিদর্শক দল জনতা ব্যাংকের এমডিকে অপসারণের সুপারিশ করেছে। ওই সুপারিশ অনুসারে কাজ শুরু করা হয়েছে। সূত্র বলছে, ব্যাংকের এমডিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি স্থায়ী কমিটি আছে। ওই কমিটি খুব শিগগিরই তাকে জালিয়াতি সংক্রান্ত বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেবে।

ওই নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হলে, কেন তাকে অপসারণ করা হবে না তা জানতে আব্দুছ ছালামকে আরেকটি নোটিশ দেয়া হবে। সেই নোটিশের পর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তাকে অপসারণের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম।

এদিকে এমডির জালিয়াতির তথ্য নিয়ে  রিপোর্ট প্রকাশিত হলে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। বিভিন্ন মহল থেকে এমডিকে গ্রেফতারের দাবি ওঠে। তারা বলেন, শুধু অপসারণ নয়, এ ধরনের অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আশ্রয় নিয়ে এসে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের জন্য একটি বার্তা দেবে হবে। না হলে এ ধরনের অপরাধ বাড়তে থাকবে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানসহ পুরো অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

অভিনব জালিয়াতি : এনন গ্রুপের চেয়ারম্যান ইউনূস বাদল। ২২টি প্রতিষ্ঠানের নামে অ্যাকাউন্ট খুলে জনতা ব্যাংকে ৫ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের কর্পোরেট শাখায় এ ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে নিজের স্ত্রী ও কোম্পানির নামে তিনটি ভুয়া হিসাব খুলে এলসির অর্থ তুলে নেন ইউনূছ বাদল। এ প্রক্রিয়ায় তিনি ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৪শ’ কোটি টাকা নেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে এনন টেক্স গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান সিমি নিট টেক্স লিমিটেড।

এই প্রতিষ্ঠানের নামে পে-অর্ডারের মাধ্যমে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ২৫৩ কোটি টাকা দিয়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকের ১৭১তম বোর্ড সভায় প্রকল্প স্থাপনের জন্য এই প্রতিষ্ঠানের নামে ৬০:৪০ অনুপাতে ৯৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্যে বৈদেশিক যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ১ কোটি ৪৮ লাখ মার্কিন ডলারের ঋণপত্র খোলার অনুমোদন দেন তৎকালীন শাখা ম্যানেজার মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ।

এক্ষেত্রে মেশিনারিজ সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির তিনটি প্রতিষ্ঠান। এগুলো হল- ওয়াইসুক ওভারসীস, ইউনিভার্সেল টেকনোলজিকেল লিমিটেড এবং ইউনি এশিয়া এসোসিয়েটস। কিন্তু প্রাইম ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে ইউনূস বাদল নিজেই ইউনিভার্সেল টেকনোলজিকেল লিমিটেডের মালিক। প্রাইম ব্যাংকে এই প্রতিষ্ঠানের একটি হিসাব রয়েছে। যার নম্বর ১৫৯১১০৮০০০৬৩৭২।

অর্থাৎ নিজেই পণ্যের আমদানিকারক আবার রফতানিকারকও। অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ায় বিদেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রাইম ব্যাংকের তথ্য অনুসারে ওয়াইসুক ওভারসীস মালিক ইউনূস বাদল। আবার ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের তথ্য অনুসারে একই কোম্পানির মালিক এনন টেক্সের বিভিন্ন কোম্পানির পরিচালক মো. কবির হোসেন। এই কোম্পানির নামে ১ হাজার ৭২ কোটি ৭২ লাখ টাকা বের করে দেয়া হয়েছে।

এছাড়াও প্রাইম ব্যাংকের তথ্য অনুসারে ইউনি এশিয়া অ্যাসোসিয়েটসের মালিক ইউনূস বাদলের স্ত্রী জামিলা আক্তার সীমা এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়ালের তথ্য অনুসারে ওই কোম্পানির মালিক কবির হোসেন। পে-অর্ডারের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠাকে ১৫১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে ও জার্মানির সঙ্গে এই কোম্পানির কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ নিজেরাই আমদানিকারক তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিক।

অন্যদিকে পণ্য বাংলাদেশে আসার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে এসব কাজ বড় ধরনের অপরাধ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণ বিতরণের কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ঋণ শৃঙ্খলা পরিপন্থী তথা আমানতকারীদের স্বার্থবিরোধী কাজে জড়িত ছিলেন আব্দুছ ছালাম আজাদ। এ কারণে এই ঘটনায় তাকে দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারা অনুয়ায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

উল্লেখ্য, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারায় বলা আছে, “বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, কোনো ব্যাংক কোম্পানির চেয়ারম্যান বা কোনো পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী, কোনো ব্যাংক বা আমানতকারীদের জন্য ক্ষতিকর কার্যকলাপ রোধকল্পে বা জনস্বার্থে চেয়ারম্যান, পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীকে যেই নামে ডাকা হোক না কেন, অপসারণ করা প্রয়োজন হইলে কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া তাহার পদ হইতে অপসারণ করিতে পারিবে।

তবে সরকার কর্তৃক মনোনীত বা নিযুক্ত কোনো চেয়ারম্যান বা পরিচালক, যে নামেই অভিহিত হউক না কেন, এর ক্ষেত্রে এই ধারা প্রযোজ্য হইবে না : তবে শর্ত থাকে যে, উক্তরূপ চেয়ারম্যান বা পরিচালকের আচরণ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের নিকট কোনো প্রতিবেদন পেশ করিলে সরকার উহা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করিবে।

এনন টেক্স নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, জনতা ব্যাংকের বহুল সমালোচিত এনন টেক্স গ্রুপের ৫ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় বর্তমান এমডি মো. আব্দুছ ছালাম আজাদের সম্পৃক্ততা পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আইন, কানুন ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গ্রুপটির ঋণের অনুমোদন, বিতরণ এবং পরিবীক্ষণে সহায়তা করেছেন তিনি।

পরিদর্শন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ব্যাংকের লোকাল অফিসের ২টি ও কর্পোরেট অফিসের ২০টিসহ মোট ২২টি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণের জামানত ৫৬ একর জমি। ব্যাংকের নির্ধারিত মূল্য ৬৭৭ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে স্থাপিত যন্ত্রপাতিসহ মোট সহায়ক জামানতের মূল্য দেখানো হয়েছে ৪ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা।

কিন্তু জমির স্পষ্ট সীমানা না থাকায় এর দাম জানা সম্ভব হয়নি। ভৌত অবকাঠামোতে ওভারল্যাপিং থাকায় জামানত বিক্রি করে টাকা আদায় সম্ভব নয়। এছাড়া এই ২২টি প্রতিষ্ঠানের বাইরেও ইউনূস বাদল ও তার সহযোগীর অনেক প্রতিষ্ঠান পাওয়া গেছে। এতে অনিয়মের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।