সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
মিরসরাই। চট্টগ্রাম জেলার শেষ সীমান্ত এখানটায়। এরপর ফেনী জেলার শুরু। বাংলাদেশের ম্যাপে এই অংশটুকু সন্ত্রাস ও জঙ্গি তৎপরতার ঘাঁটি হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে।

একদিকে দুর্গম পাহাড়, ঝিরি ঝরনা আর অন্যপাশে বিশাল চরাঞ্চল, পরে ভারত সীমান্ত। এই মিরসরাইয়ের বুক চিরে ছুটে গেছে দেশের প্রধানতম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক।
তবে ভৌগলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়েছে অপরাধী চক্র। একদিকে পাহাড়ের দূর্গম পরিবেশ, অন্যপাশে মহাসড়ক। ইচ্ছে করলেই অপরাধ করে সন্ত্রাসীরা লুকিয়ে পড়তে পারে। আইন-শৃংখলাবাহিনীর চোখ এড়াতে পারে। চাইলে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতও চলে যাওয়া যায়। আর ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গেও যোগাযোগ সহজ।
দেশের স্বাধীনতাবিরোধী প্রধানশক্তি জামায়াত-শিবির ও বিভিন্ন সময়ে ধর্মের নামে জঙ্গি তৎপরতায় সম্পৃক্ত নিষিদ্ধঘোষিত দলগুলো এই মিরসরাইকেই বেছে নেয় তাদের যে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানোর ঘাঁটি তৈরির স্থান হিসেবে।
এখানের নিরিবিলি পাহাড়ি পরিবেশে খুব সহজেই তারা আস্তানা তৈরি করতে পারছে।
গত বুধবার (০৮ মার্চ) মিরসরাই পৌর শহরের কলেজ রোড় স্টেডিয়ামের পাশে এমন একটি জঙ্গি আবাসের সন্ধান ও তাতে অভিযানের পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, মিরসরাই ও কুমিল্লার চান্দিনা থানার পুলিশ মিলে অভিযান চালিয়ে এখান থেকে বিপুল পরিমানণ গ্রেনেড ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে।
এর আগে কুমিল্লার চান্দিনায় একটি পুলিশ চেক পয়েন্টে হামলার চালিয়ে এক পুলিশ সদস্যকে আহত করে জঙ্গিরা। এ সময় গ্রেফতার হওয়া দুই জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদের পরেই ফের উঠে আসে মিরসরাইয়ের নাম। আটককৃতদের বক্তব্যের সূত্র ধরেই চালানো হয় অভিযান।
এর আগেও মিরসরাইয়ের একাধিক স্থানে জঙ্গি ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আস্তানার সন্ধান পায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। অতীত রেকর্ড ঘেঁটে সে তথ্যই মেলে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেও মিলেছে তার সত্যতা। তারা জানিয়েছেন, এ উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলে দুই দশক ধরে চলছে বিভিন্ন জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠনের অপতৎপরতা।
বিভিন্ন সূত্রের সাথে কথা বলে জানা যায়, জঙ্গি তৎপরতার শুরু ৯০ এর দশক থেকেই।
সে দশকের গোড়া থেকে উপজেলার মধ্যম সোনাপাহাড় গ্রামে জঙ্গি তৎপরতা শুরু করে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) এবং জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। এ দুই শীর্ষ জঙ্গি সংগঠন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জঙ্গি তৈরিতে এ অঞ্চলের পাহাড়ি জনপদকেই বেছে নেয়।
১৯৯২ সালে ‘যুবকমান্ড’ নামে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ উপজেলার সদর ইউনিয়নের মধ্যম তালবাড়িয়ার একটি পাহাড়ে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দিত। খবর পেয়ে মিরসরাই থানার তখনকার ওসি মাহফুজুল হকের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে ‘যুবকমান্ডের’ সেই আস্তানা গুঁড়িয়ে দেয়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তারা কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে আরো বেশি মাত্রার শক্তি নিয়ে সমগ্র উপজেলায় সংগঠনটি ব্যাপক সন্ত্রাস চালায়। ওই সময় সংগঠনটির সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মিরসরাই থানা, ফেনীর সোনাগাজী থানা এবং চট্টগ্রামের ফটকছড়ি থানায় অন্তত ৩৩টি মামলা দায়ের হয়।
২০০১ সালের দিকে উপজেলার নিজামপুরের পাহাড়ি অঞ্চলে আস্তানা গাড়ে ‘আল-খিদমত’ নামের একটি সংগঠনের অস্ত্রধারীরা। সংগঠনটির প্রধান ছিলেন ওই সময়ের শিবির ক্যাডার কায়সার। রাতের বেলায় পাহাড়ের ঢালে অস্ত্র প্রশিক্ষণ চলতো এমন তথ্য গোয়েন্দাদের কাছে রয়েছে। সেবছর ১১ ডিসেম্বর রাতে ওই পাহাড়ে অভিযান চালালে প্রশিক্ষণের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা গেলেও কোন অস্ত্রধারীকে ধরতে পারেনি পুলিশ।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মিরসরাইয়ে ভারত সীমান্তবর্তী কয়রা এলাকায় ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফা’র অস্ত্রভান্ডার ও ক্যাম্পের সন্ধান মেলে। ওইসময় চট্টগ্রাম র্যাব ৭ এর অভিযানে ওই ক্যাম্প গুড়িয়ে দিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
২০১১ সালের অক্টোবর মাসে উপজেলার সদর ইউনিয়নের তালবাড়ীয় এলাকার মন্দিরা পাহাড়ে ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যরে একটি বাংকার এবং পরে পাশের বদরখাঁ পাহাড়ে আরো দুইটি বাংকারের সন্ধান পাওয়া যায়।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম লেক মহামায়ার গহীন পাহাড়ে ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে সন্ধান মেলে আরো একটি বাংকারের। সেসময়ও র্যাব ৭ এর অভিযান চলে এই বাংকারে। রহস্যজনক বাংকারগুলো জঙ্গি তৎপরতার অংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
এসব ব্যাপারে কথা হয় মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইরুল ইসলামের সাথে। তিনি জানান, মিরসরাই এবং জোরারঞ্জ থানা জঙ্গি তৎপরতা বিষয়ে মনোযোগী রয়েছে। পাহাড়ি এবং নির্জন এলাকাগুলোও নজরে রেখেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।
আগের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এসবের ঘটনাকে বিবেচনায় রেখেই আরো জোরদার করা হবে নজরদারী।’
আগেকার সকল সন্ত্রাসী তৎপরতা মাথায় রেখে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
এছাড়া গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও কাজ করছে বলে জানান তিনি।
এখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ নজরদারি রাখা হচ্ছে। যেখানেই জঙ্গীরা আস্তানা করার চেষ্টা করবে, পুলিশ খবর নিয়ে তা ধ্বংস করবে এমনই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন ওসি সাইরুল ইসলাম।
সূত্র: বাংলা নিউজ









