সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
উপমহাদেশের ইতিহাসে মোগলদের রসনাবিলাস বা রেসিপি আলোচিত স্থান দখল করে আছে। মোগল সম্রাটরা মহাধুমধাম করে খাওয়া-দাওয়া করতে পছন্দ করতেন।
‘আইন-ই-আকবরিতে উল্লেখ রয়েছে, মোগল সম্রাটদের রসুইঘর সামলাতে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিল। বাগদাদ থেকে প্রকাশিত অনেক প্রাচীন মুসলিম রান্নার বইতে লেখা আছে, ‘খাওয়া হল ছয়টি আনন্দের মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বমহান (অন্য পাঁচ আনন্দ হল- পান, কাপড়, রতি, আতর, আর বাদ্যবাজনা)।

সূক্ষ্ম রুচির পারসিক পোলাওর সঙ্গে দেখা হল ঝাঁজালো মসলাদার ভারতীয় ভাতের রেসিপি, দুয়ে মিলে তৈরি হল এক অভূতপূর্ব মাস্টারপিস বিরিয়ানি’ (মোগল বিরিয়ানি ও খাবার রাজনীতি, রাইসা তাসনুভা, দৈনিক ইত্তেফাক ২১-৯-২০১৮)। যে বিরিয়ানির রসনা এখন প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
আরবের দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ। আমাদের দেশের লাখ লাখ দক্ষ-অদক্ষ জনশক্তি সেসব দেশে শ্রম বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। অতিথিপরায়ণ জাতি হিসেবে আরবদের দীর্ঘ ঐতিহ্য ও সুনাম রয়েছে। বাংলাদেশের যারা আরবদের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছে তাদের কাছে শুনেছি, আরব দেশের নাগরিকরা বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অঢেল খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করে।
কিন্তু সেসব থেকে তারা সামান্য গ্রহণ করে। বাকি খাদ্য ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। রমজান সংযমের মাস। সে সময়ও তারা সেহরি ও ইফতারে একইভাবে আয়োজন করে এবং একই সঙ্গে অপচয়ও করে। আরবিরা যখন কোনো হোটেল-রেস্টুরেন্টে খেতে যান, সেখানেও তারা একগাদা খাবারের অর্ডার দেন।
কিন্তু খাদ্যগ্রহণ করেন দু-একটি আইটেম থেকে। এ ধারাতেই তারা চলছেন। খাবার নষ্টের তালিকায় বিশ্বে সৌদি আরব এগিয়ে আছে। সৌদি গেজেটে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গেছে, উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়। একজন সৌদি নাগরিক প্রতিবছর গড়ে ২৫০ কেজি খাবার নষ্ট করেন।
বিভিন্ন প্রথা, সংস্কৃতি ও ধর্মে খাদ্য অপচয়ের প্রবণতা রয়েছে। খাদ্য অপচয়ের অপবাদ শুধু আরব, উন্নত বিশ্ব বা ইংল্যান্ডের রাজপরিবারকে দিয়ে লাভ নেই। এ অপরাধে আমরাও কম-বেশি অপরাধী। ছোটবেলায় দেখেছি, বিশেষ করে বিয়ের অনুষ্ঠানে খাদ্য অপচয় করতে।
সে সময় এটা যেন আমাদের একটি সংস্কৃতি হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের অনুষ্ঠানে বর পক্ষরা অহেতুক খাদ্য অপচয় করত। এটা করা হতো যাতে কনেপক্ষের খাদ্য কম পড়ে। তারা যেন নাজেহাল হয় আগত অতিথিদের সামনে।
বরযাত্রায় অতিরিক্ত অতিথি আনা হতো। বিয়ের অনুষ্ঠানে দেখেছি খাবার কম পড়ায় দ্বিতীয়বার বা তৃতীয়বার রান্না করতে। অনেক অতিথিকে না খেয়ে চলে যেতে। এ সংস্কৃতি থেকে বের হলেও আমাদের এখানে এখন শুরু হয়েছে নতুন এক ফ্যাশন।
ইদানীং দেখা যায়, সামাজিক অনুষ্ঠানে আমরা অনেকেই চোখের ক্ষুধা মেটাতে অনেক অনেক খাবার পাতে নেই। কিন্তু খেতে পারি না। পাশে বসা দু-তিন বছর বয়সের ছোট বাচ্চার প্লেটেও স্তূপ করে খাবার তুলে দেই। বুফে হলে প্লেটে খাবার নিতে নিতে পিরামিড বানিয়ে ফেলি। খাবারের প্লেট নিয়ে হাঁটতে পারি না।
ভাবটা এমন গিফট দিয়েছি না! খাবার নষ্ট করা অনেকের স্বভাব। আমরা অনেকেই মেতে উঠি খাবার নষ্ট করার উদ্ভট প্রতিযোগিতায়। এমনকি কারও বাড়িতে দাওয়াত বা বেড়াতে গেলেও খাবার অপচয় করা এখন কারও কারও কাছে আধুনিকতা।
সামাজিক অনুষ্ঠানে একাধিক আইটেম থাকায় খাবার অপচয় হয়। একাধিক মেন্যু রাখা সামাজিক প্রতিযোগিতাও বটে। টেবিলে অতিরিক্ত আইটেম থাকায় কোনোটাই ভালোমতো খাওয়া হয় না। অতিথিরা সব একটু একটু টাচ করেন। আর এতেই অপচয়ের মাত্রা বাড়ে।
ভারতীয় চলচ্চিত্র উপমহাদেশে খুবই জনপ্রিয়। নায়ক আর ভিলেনের মারামারি হয় কাঁচাবাজারের ফুটপাতের দোকানে বা কোনো অভিজাত শপিং মলের সামনে বা ভেতরে। সেসব দৃশ্যে দেখানো হয় বিপুল পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য অপচয় বা ধ্বংস করতে। হিন্দি বা বাংলা সিরিয়ালেও দেখানো হয় তথাকথিত গৃহিণীরা খাদ্য অপচয় করছেন।
প্লেটভর্তি খাবার থালায় হাত ধুতে। খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ বা মরিচ মিশিয়ে দিচ্ছেন একজন আরেকজনকে অপদস্ত করতে। আমাদের দেশেও ইদানীং দেখানো হচ্ছে। নায়ক বা নায়িকা পাতে খাবার রেখে উঠে যাচ্ছেন। এর প্রভাব কি মন্ত্রমুগ্ধ দর্শকের ওপর পড়ছে না?
ভারতের কোটি কোটি মানুষ দু’বেলা পেট পুরে খেতে পারে না। একবেলা খায়। তারা কীভাবে খাদ্য অপচয় করতে উদ্বুদ্ধ করছে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে? আমরা তাদের চ্যানেল দেখে উৎসাহিত হচ্ছি না তো?
প্রবাদ আছে ‘বাঁচার জন্য খাওয়া, খাওয়ার জন্য বাঁচা নয়’। আমরা যেন এর উল্টোটাই দেখছি এবং অনুষ্ঠানে খাবার অপচয় করার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠছি। পেটের ক্ষুধার বদলে মিটে চোখের ক্ষুধা। যেখানে দেশের হাজার হাজার মানুষ খেতে পান না, সেখানে এত এত খাবার নষ্ট করার সুযোগ নেই।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুসারে, আমরা (সারা পৃথিবী) প্রতি বছর যে পরিমাণ খাদ্য অপচয় করছি বা ময়লার ঝুঁড়িতে ছুড়ে ফেলছি, তার তিন ভাগের এক ভাগ খাবার দিয়ে ৮৭০ মিলিয়ন ক্ষুধার্তের খুব ভালোভাবেই পেট ভরানো সম্ভব।
আমাদের জানামতে, সমাজ, রাষ্ট্র ও ধর্ম অপচয়কে প্রশ্রয় দেয় না। ইসলাম ধর্মে অপচয় না করতে কঠোরভাবে হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। ‘তোমরা খাও এবং পান কর; অপচয় কর না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না’ (সূরা আরাফ; আয়াত : ৩১)। ইসলাম খাবারের সামান্যতম অংশ নষ্ট করতে নিষেধ করেছে।
খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলে না দিয়ে পশু-পাখিকে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আমরা ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ নির্মাণ করতে চাই। কিন্তু খাদ্য অপচয় রোধ করতে চাই না। অপচয় করাটা আমাদের একটা ব্যাধিতে পরিণত হতে চলেছে। তাই এখন সময় এসেছে আমাদের এ চোখের ক্ষুধাকে দমন করা এবং এর বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা।
খাবার নষ্ট করা কোনো বিবেচনাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। অপচয়ের ক্ষতি শুধু আর্থিক না, সামাজিকভাবেও এর প্রভাব পড়ছে। গরিব খুঁজে খাদ্য আর ধনী খুঁজে ক্ষুধা (হিন্দি প্রবাদ)। আমাদের অবস্থা হয়েছে অনেকটা এ প্রবাদের মতো।
দিনে-রাতে বিশ্বের অন্তত ৮৭ কোটি মানুষ খেতে পায় না। এ তথ্য জানিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (এফএও)। পৃথিবীতে যত মানুষ যুদ্ধবিগ্রহে মারা যায় তার চেয়ে বেশি মারা যায় অনাহারে।
বড় বড় হোটেল রেস্তোরাঁয় বটেই, আমার আপনার রান্নাঘরেও প্রতিদিন প্রচুর খাদ্যের অপচয় কমিয়ে আনলে কাউকে আর না খেয়ে থাকতে হবে না। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি ২০১৩ সালে প্রতিপাদ্য ঠিক করেছিল ‘ভেবেচিন্তে খাই, অপচয় কমাই’। আসলে সচেতনতা বাড়ালেই খাদ্য অপচয় কমবে। ‘খাদ্যকে ভালোবাসুন, অপচয়কে নয়’।
খাদ্য অপচয় রোধে বিল পাস করেছে ফ্রান্স। নতুন আইন অনুযায়ী সুপার মার্কেটগুলোতে খাওয়ার যোগ্য অবিক্রীত খাদ্যপণ্য দাতব্য সংস্থাকে দিতে হবে। এসব পণ্য পশুখাদ্য অথবা খামারে জৈব সার হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এটি বাস্তবায়ন করতে বড় সুপার মার্কেটগুলোকে অবশ্যই কোনো না কোনো দাতব্য সংস্থার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকতে হবে।
বর্তমানে ফ্রান্সের মুদি দোকানগুলোতে অবিক্রীত খাদ্যপণ্য ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া হয়। ফলে ভালো থাকা সত্ত্বেও তা আর খাওয়ার যোগ্য থাকে না। এক হিসাবে বলা হয়েছে, ফরাসিরা প্রতিবছর ২০-৩০ কিলোগ্রাম খাবার ফেলে দেয়।
বছরে এর সর্বমোট মূল্য দাঁড়ায় আনুমানিক ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ২ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার। ফ্রান্স বহু বছর ধরে ঐতিহ্যগতভাবে খাবার অপচয় করে আসছে। এ অপচয় ব্যক্তিগত পর্যায়েও গর্বের সঙ্গেই করা হয়।
ডেনমার্কভিত্তিক খাবার অপচয় বন্ধ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সেলিনা জুন বলেন, ‘আমরা যত বেশি খাবার নষ্ট করছি, বিশ্বে খাবারের দাম বৃদ্ধির জন্য আমরা ততটাই প্রভাবক হিসেবে কাজ করছি’। খাবার অপচয় রোধে পৃথিবী সোচ্চার হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া খাবার অপচয় রোধে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে।
সৌদির শূরা কাউন্সিল খাবার নষ্ট বন্ধের একটি আইন পর্যালোচনা করবে। ওই প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান খাবার নষ্ট করবে তাদের জরিমানা করা হবে। যেমন- কোনো ব্যক্তি যদি রেস্টুরেন্টে খাবার শেষ না করে উঠে যায়, তাহলে তাকে জরিমানা করা হবে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও তার মন কি বাত অনুষ্ঠানে খাবার অপচয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে খাবার অপচয় বন্ধ করতে চিন্তা-ভাবনাও শুরু করেছে সরকার। উন্নত বিশ্বের কোনো কোনো দেশে খাবার অপচয় করলে জরিমানা দিতে হয়।
কেউ অভিযোগ করলে সোশ্যাল সার্ভিসের কর্মীরা চলে আসেন জরিমানা করতে। খাবার অপচয় রোধে বিশ্ব সোচ্চার হয়েছে। এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশও। আমরা আর কতদিন পিছিয়ে থাকব?









