সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে দেয়া বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেডের আমদানি করা সেই পণ্য চালানের ইনভেন্ট্রি (গণনা) শেষ হয়েছে।
রোববার সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বন্দর ইয়ার্ডে এই আমদানি পণ্যের ইনভেন্ট্রি করে কাস্টমসের গঠিত বিশেষ কমিটি। আমদানি করা ৬৬৯ প্যাকেজ খুলে সব কটি পণ্য গণনা করে দেখা হয়। এতে ৬৬৯টি প্যাকেজের মধ্যে ২৯টিতে পাওয়া গেছে ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য।

ইনভেন্ট্রি কমিটির সদস্য ও কাস্টমসের সহকারী কমিশনার মিজানুর রহমান প্রাপ্ত পণ্যের বিবরণ দিয়ে সোমবার বিকালে বলেন, ঘোষণাবহির্ভূত পণ্যের মধ্যে রয়েছে- ২টি প্যাকেজে ১৪ হাজার ক্যান বিয়ার, ৩টি প্যাকেজে (আংশিক) ১ হাজার বোতল বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ, অন্যান্য প্যাকেজে ১০ টন খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে সস, বাউন সুগার, নুডলস, জেম, জেলি, ভিনেগারসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য, ১০০ কার্টন সিগারেট, ২ কনটেইনারে ৩৬ টন টাইলস। এসব পণ্যের শুল্ক কী পরিমাণ আসবে তা অ্যাসেসমেন্ট করার আগে বলা যাবে না বলে জানান এই সহকারী কমিশনার।
তিনি বলেন, প্রাপ্ত পণ্যের তালিকা কাস্টমসের অ্যাসেসমেন্ট শাখায় পাঠানো হয়েছে। ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানির জন্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও আমদানি করা পণ্যের বিপরীতে শুল্ক প্রদান করতে হবে।
এদিকে একই প্রতিষ্ঠান এর আগেও বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতির ঘোষণায় অনেক চালান নিয়ে আসে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই সব চালানেও এ ধরনের ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য ছিল। চট্টগ্রাম কাস্টমসকে ‘ম্যানেজড’ করেই এসব চালান বন্দর থেকে বের করে নিয়ে গেছে তারা।
এই সন্দেহের বিষয়টি উড়িয়ে দেননি কাস্টমস কমিশনার মো. ফখরুল আলমও। তিনি বলেছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) তিনি এ বিষয়টি খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানাবেন।
অন্যদিকে এই আমদানি পণ্য ছাড়ের দায়িত্বে থাকা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বিপাশা এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. শফিকুল আলম জুয়েল বলেন, আমার দায়িত্ব ছিল ডকুমেন্ট অনুযায়ী পণ্য ছাড়ের। সে অনুযায়ী ডকুমেন্ট জমা দিয়েছি।
কিন্তু ওই চালানে কনটেইনারের ভেতর যে ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য ছিল, তা আমার জানার কথা নয়। তাছাড়া আমদানিকারকের পক্ষ থেকে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে।
এরপরও একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমার প্রতিষ্ঠানকে জড়িয়ে আমার ৩০ বছরের ব্যবসায়িক ক্যারিয়ার ধ্বংস করার পাঁয়তারা করে। শেষ পর্যন্ত তারা সফল হয়নি।
এর আগেও একই প্রতিষ্ঠানের নামে আমদানি করা ক্যাপিটাল মেশিনারিজের একাধিক চালান ছাড় করা হয়েছে বলে জানান এই সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মালিক। তবে ওইসব চালানে এ ধরনের ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য ছিল কি না, তা তিনি জানেন না।
২৩ জুলাই রাতে চট্টগ্রাম বন্দরের তিন নম্বর জেটিতে পানামার পতাকাবাহী জাহাজ এমভি কিউজি শান থেকে খালাসের সময় বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেডের একটি আমদানি চালান আটকে দেয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
৮টি বিল অব অ্যান্ট্রির (বিএল) বিপরীতে ৬৬৯ প্যাকেজে ১ হাজার ৪০৬ টন ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানির ঘোষণা দেয়া হয়েছিল ওই চালানে। কিন্তু গোপনে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানতে পারে এ চালানে ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য বিশেষ করে আমদানি নিষিদ্ধ মদ-বিয়ার রয়েছে।
পায়রা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য আমদানি করা ক্যাপিটাল মেশিনারিজ বা মূলধনি যন্ত্রপাতির এ চালান খালাসের পর দুটি বার্জ পণ্য নিয়ে পায়রা বন্দরের উদ্দেশে রওনা দেয়। তৃতীয় বার্জটিতে জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের সময় অভিযান পরিচালনা করে কাস্টমস।
প্রথম দিনের অভিযানে ১৭ প্যাকেজে মদ, বিয়ার ও খাদ্যপণ্য পাওয়ার কারণে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পুরো চালানটি আটকে দেয়। জব্দ করে জাহাজ ও বার্জ।
পায়রায় চলে যাওয়া বার্জ ফিরিয়ে আনার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি লেখে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে আসা এসব পণ্য ইনভেন্ট্রির জন্য গঠন করা হয় বিশেষ কমিটি।
তবে পণ্য আটক হওয়ার পরপরই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কাস্টমসে দুঃখ প্রকাশ করে চিঠি দেয়। চিঠিতে বলা হয়- পাওয়ার প্ল্যান্টে কর্মরত ৩ হাজার চীনা কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকের জন্য এসব পণ্য আনা হয়েছিল।
পরবর্তী জাহাজে এসব পণ্য ঘোষণা দিয়েই আনার কথা থাকলেও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভুল করে তা আগের জাহাজেই তুলে দিয়েছে। যে কারণে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তারা ঘোষণাবহির্ভূত এসব পণ্যের শুল্ক বা ডিউটি দিয়েই ছাড় করতে চায়।
একই সঙ্গে এ ঘটনার জন্য তারা দুঃখ প্রকাশ করে পরবর্তী সময়ে এ ধরনের ভুল আর হবে না বলেও অঙ্গীকার করে। বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেডের প্রধান প্রকৌশলী ও পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক শাহ আবদুল মাওলার স্বাক্ষরে ৩১ জুলাই এ চিঠি দেয়া হয়।
চিঠিতে এই চালান আমদানির সঙ্গে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বিপাশা এন্টারপ্রাইজের কোনো সংশ্লিষ্টতা বা তাদের কোনো দোষ নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিতে কোনো ব্যবসায়িক উদ্দেশে এসব পণ্য আনা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
যদিও ব্যবসায়ী সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ চিঠি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের চালাকি বা কৌশলের একটি অংশ। তারা বলছেন, সজ্ঞানেই শুল্ক ফাঁকি দিয়ে লাভবান হওয়ার জন্যই মূলধনি যন্ত্রপাতির সঙ্গে মদ-বিয়ারসহ অন্য পণ্য নিয়ে আসা হয়েছে। ধরা পড়ার পর তারা ভুল হয়েছে দাবি করে ধোয়া তুলসি পাতা সাজার চেষ্টা করছে।









