সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে খেলাপি ঋণ আদায় বাড়ানোসহ চারটি নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। অন্য নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে অবলোপনকৃত ঋণ আদায় বাড়াতে এবং অডিট আপত্তি নিষ্পত্তিতে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ।
এছাড়া আগামী অর্থবছর থেকে খেলাপি ঋণের কত টাকা আদায় করা হবে, এ লক্ষ্যমাত্রা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। বিশেষায়িত ব্যাংকের নির্বাহীদের সঙ্গে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এসব নির্দেশনা দেয়। বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

সূত্র আরও জানায়, বিশেষায়িত আট ব্যাংকের ৬২১ কোটি টাকা অবলোপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। এ ব্যাংকের অবলোপনকৃত ঋণ হচ্ছে ২২১ কোটি টাকা। পাশাপাশি ৮টি ব্যাংকের অডিট আপত্তি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা। ৩৯ হাজার ৬২৯টি আপত্তির বিপরীতে রয়েছে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ।
জানতে চাইলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, বড় ধরনের অবলোপন যে কোনো ব্যাংকের সংকট সৃষ্টি করে। কারণ অবলোপনের অর্থ ব্যাংকের মুনাফা থেকে দিতে হয়। সেটি না হলে শেষ পর্যন্ত সরকারকে বাজেট থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে এই অবলোপনের অর্থ মূলধন হিসেবে সহায়তা দিতে হয়। ফলে সব দিক বিবেচনায় অবলোপন সরকার বা ব্যাংকের দুর্বল অবস্থা সৃষ্টি করে। আর এটি হয়ে থাকে মূলত ব্যাংকের অব্যবস্থাপনার কারণে।
তিনি আরও বলেন, অডিট আপত্তি একধরনের অনিয়ম। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোয় এত বিপুলসংখ্যক আপত্তি এটিই প্রমাণ করে যে, অনেক অনিয়ম হয়েছে। এ অনিয়মও হয়েছে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা নীতি ঠিক না থাকার কারণেই।
সূত্রমতে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি ব্যাংক (রাকাব), কর্মসংস্থান ব্যাংক, আনসার ভিডিপি ব্যাংক, বাংলাদেশ হাউজবিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (বিএইচবিএফসি), প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, আইসিবি ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে বৈঠকে নিজ নিজ ব্যাংকের অবস্থান তুলে ধরেন নির্বাহীপ্রধানরা।
সূত্র আরও জানায়, বৈঠকে শ্রেণীকৃত ও অশ্রেণীকৃত ঋণ থেকে ব্যাংকগুলো কী পরিমাণ অর্থ আদায় করবে, এর একটি হিসাব তুলে ধরা হয়। ওই হিসাবে বলা হয়েছে খেলাপি ও সাধারণ ঋণ থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বিকেবির ১ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ৪৫৭ কোটি টাকা, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ১২৫ কোটি টাকা, আনসার ভিডিপি ব্যাংকের ৯৯ কোটি টাকা, বিএইচবিএফসির ২২০ কোটি টাকা ও আইসিবির ৭৬১ কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে।
তবে ওই বৈঠকে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো কী পরিমাণ খেলাপি ঋণ ও খেলাপি থেকে ঋণ আদায়ের লক্ষ্য কতটুকু নির্ধারণ করেছে, তা উপস্থাপন করা হয়নি। এতে বৈঠকে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে আগামী অর্থবছরে খেলাপি ঋণ থেকে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো কত টাকা আদায় করবে, এর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণ থেকে আদায় বাড়াতেও ব্যাংকগুলোকে কার্যকরী উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ দেয়া হয় বৈঠকে।
কার্যবিবরণী সূত্রমতে, অবলোপনকৃত ঋণের মধ্যে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) করেছে ২৬৩ কোটি টাকা। এছাড়া বিকেবি ঋণ অবলোপন করেছে প্রায় ২২২ কোটি টাকা, রাকাব ১২৭ কোটি টাকা। ছোট অঙ্কের মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান ব্যাংকের ৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা এবং আনসার ভিডিপি ব্যাংকের ৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, আইসিবির সার্বিক অবস্থা নিয়ে একটি পৃথক বৈঠক করা হবে। ঈদের পর এটি হওয়ার কথা। যে কোনো সময়ে বৈঠকটি করে দিকনির্দেশনা দেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ঋণ বিতরণ, পুরনো ঋণগ্রহীতার পাশাপাশি নতুন ঋণগ্রহীতা খুঁজে বের করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব বিশেষায়িত ব্যাংককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সূত্রমতে, ওই বৈঠকে বিশেষায়িত আটটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ও বাণিজ্যিক অডিট আপত্তি তুলে ধরা হয়। বাণিজ্যিক অডিট আপত্তির মধ্যে বিকেবির পরিমাণ ৬ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা। এ ব্যাংকের অডিট আপত্তি ৬ হাজার ৬৬৮টি।
এছাড়া রাকাবের অডিট আপত্তির আর্থিক পরিমাণ হচ্ছে ১ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। এই ব্যাংকের আপত্তির সংখ্যা ৪ হাজার ২২টি। ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের অডিট আপত্তির পরিমাণ ১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। এ ব্যাংকের আপত্তি ১০৫টি।
এছাড়া বাংলাদেশ হাউজবিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের অডিট আপত্তি ৩১৫ কোটি টাকা, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে ১৮৮ কোটি টাকা, আনসার ভিডিবি ব্যাংকে ৮৩ কোটি টাকা এবং কর্মসংস্থান ব্যাংকে ৪০ কোটি টাকার আপত্তি রয়েছে। ওই বৈঠকে বাণিজ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অডিট আপত্তিগুলো নিষ্পত্তিতে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেয়া হয়।









